এই ঘর থেকেই উদ্ধার করা হয় আলাল হোসেনের লাশ
এই ঘর থেকেই উদ্ধার করা হয় আলাল হোসেনের লাশ
স্ত্রী, কন্যা ও শাশুড়ি আটক

রংপুরে পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় স্বামীকে হত্যার অভিযোগ স্ত্রীর বিরুদ্ধে

চালাঘরে রশি ঝুলিয়ে ফাঁসি হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা
সরকার মাজহারুল মান্নান, রংপুর অফিস

রংপুর মহানগরীর উপকণ্ঠ দেওডোবা কুড়ারপারে পরকীয়ার প্রতিবাদ করায় স্বামীকে অন্ডকোষ চেপে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে। এই কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন নিজ কন্যাসহ পরকীয়া প্রেমিক।

আজ বুধবার সকালে লিজ নেয়া খামার বাড়ির টিনের চালার খাদ্যগুদাম থেকে তার লাশ উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, আলালকে অন্যত্র হত্যা করে ওই চালা ঘরে রশিতে ঝোলানোর নাটকও করেছে হত্যাকারীরা। এ ঘটনায় স্ত্রী, কন্যা ও শাশুড়িকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

রংপুর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুর রহমান সাইফ নয়া দিগন্তকে জানান, রংপুর মহানগরীর টার্মিনাল দেওডোবা ডাঙ্গিরপাড় এলাকার মৃত আব্দুল খালেকের পুত্র অগ্রণী ব্যাংক সেন্ট্রাল রোড শাখার কেয়ারটেকার আলাল হোসেনের (৪৩) লাশ পার্শ্ববতী দেওডোবা কুড়ারপার এলাকায় লিজ নেয়া প্রজেক্টের টিনের চালার খাদ্যগুদামের চৌকিতে শোয়া অবস্থায় উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। সাত ফুট উচ্চতার ওই চালা ঘরে ফাঁসিতে ঝোলানোর মতো একটি রশিও উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, তাকে হত্যা করে ফাঁসিতে ঝোলানোর নাটক করা হয়েছে। পুলিশ যাওয়ার আগেই হত্যাকারীরা আইওয়াশ হিসেবে ওই ফাঁসির রশি সেখানে ঝুলিয়ে রাখে।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তার স্ত্রী আজেদা পারভীন, কন্যা আশিকি আখতার এবং শাশুড়ি ফাতেমা বেগমকে আটক করা হয়েছে। এছাড়াও স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক পার্শ্ববতী এলাকার কবিরাজ আজহারুল ইসলাম এবং মেয়ের প্রেমিককেও খোঁজা হচ্ছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছেও বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রাথমিক তদন্তরত পুলিশের বিভিন্ন সূত্র জানায়, গত সোমবার আলাল হোসেন ব্যাংক থেকে বাড়িতে এসে স্ত্রী আজেদাকে দেওডোবা পাঠানপাড়া এলাকার আজহারুল ইসলাম কবিরাজের সাথে ঘরে অসামাজিক কাজে লিপ্ত অবস্থায় দেখে। অন্যদিকে একই সময়ে রংপুর রোকেয়া কলেজে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত কন্যা আশিকি পারভীনকে অন্য ঘরে আরেক ছেলের সাথে লুডু খেলা অবস্থায় দেখতে পায়। বিষয়টি নিয়ে স্ত্রী ও কন্যার সাথে ব্যপক কথাকাটাকাটি হয় আলাল হোসেনের। এরই মধ্যে স্ত্রী ও কন্যার পক্ষ নিয়ে পার্শ্ববতী গোলাগঞ্জ পশ্চিম মনোহরপুর থেকে বাড়িতে আসেন শাশুড়ী ফাতেমা বেগম। এনিয়ে দুইদিন থেকে তাদের মধ্যে চরম অশান্তি চলছিল।

এরই মধ্যে স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমিক এবং কন্যার প্রেমিক মিলে মঙ্গলবার রাতের যে কোন সময় স্ত্রী আজেদা ও কন্যা আশিকি আলাল হোসেনকে শ্বাসরোধ এবং অন্ডকোষ চেপে হত্যা করে। কিন্তু লাশ গায়েব করতে না পেরে প্রজেক্টের চালাঘরের বিছানায় লাশ শুইয়ে রাখে। আর একটি রশি নিয়ে এসে তা চালার সাথে ঝুলিয়ে কেটে রাখে। পরে বিষয়টি আলালের পিতার পরিবারকে জানায়।

পুলিশের সূত্রগুলো জানায়, পরিকল্পনাকারীরা বুঝতে পারেনি, মাত্র ৭ ফুট উচুতে রশিতে ঝুলিয়ে সোয়া ৬ ফুট উচ্চতার একজন মানুষের মারা যাওয়া সম্ভব নয়।

পুলিশ সূত্র জানায়, স্ত্রী আজেদা খাতুন, কন্যা আশিকী এবং শাশুড়িকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের কাছে থেকে এই হত্যাকান্ডের আদ্যেপান্ত উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এদিকে পুলিশ স্ত্রী ও কন্যার মোবাইল নম্বর ট্রাকিং করেও এই হত্যাকান্ডের ক্লু উদ্ধারে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রজেক্টের দেখাশুনার দায়িত্বে থাকা ভাগগে কবির হোসেন জানান, ‘কবিরাজ আজহারুল ইসলামের সাথে মামির অসামাজিক কার্যকলাপ দেখে ফেলানোর পর মঙ্গলবার সকালে মামিকে মারপিট করে মামা। এনিয়ে প্রচণ্ড ঝগড়াঝাটি হয়। রাতে মামাকে ঘরে হত্যার করার পর খাবারের ঘরে গিয়ে নিয়ে লাশ রাখে। বুধবার সকালে আমি প্রজেক্টের খাবার ঘরে গিয়ে দেখতে পাই বিছানায় শোয়ানো লাশ। পাশে রুয়ার সাথে একটি রশি কাটা অবস্থায় ঝুলানো আছে।’

মৃত আলাল হোসেনের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন জানান, ‘নিজ বাড়ির অদূরে দেওডোবা কুড়ারপাড়ে বাবু খাঁ এলাকার এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে ১৫ বছরের জন্য ৫ একর জমি লিজ নিয়ে গত তিন বছর থেকে সেখানে মাছ ও গাভি পালন করতো আমার ভাই। প্রজেক্টটি দেখাশুনা করতো ভাগনে কবির হোসেন। গত কোরবানীর ঈদের পর থেকে ওই প্রজেক্টের ভিতরে টিনের বাড়িঘর করে সেখানে স্ত্রী আজেদা খাতুন, কন্যা রোকেয়া কলেজের এইচএসসির শিক্ষার্থী আশিকি পারভীন ও নার্সারী পড়ুয়া ঐশিকে নিয়ে বসবাস করতেন আমার ভাই। বুধবার সকালে কবির হোসেন আমাদের দেওডোবা ডাঙ্গিরপাড় এলাকার বাড়িতে গিয়ে জানায়, ভাই ফাঁসিতে ঝুলে মারা গেছে। আমি এসে দেখি চালাঘরের বিছানায় ভাইয়ের লাশ শোয়ানো। পাশে ১০ গজ দুরে চালার রুয়ার সাথে একটি রশি ঝোলানো কিন্তু সেটা কাটা।’

তিনি জানান, কবির হোসেন তাকে জানিয়েছেন, ভাই ব্যাংকে থাকার সময় বাড়িতে আমার ভাবী বিভিন্ন ধরনের ছেলেদের নিয়ে এসে আনন্দ ফুর্তি করতো। মায়ের এই অবস্থা থেকে ভাতিজিও একই পথে পা বাড়ায়। বিষয়টি নিয়ে ভাই তাদের প্রতিবাদ জানালে এই নিয়ে খুব পারিবারীক অশান্তি হচ্ছিল। এরই মধ্যে ভাইয়ের শাশুড়ি ফাতেমা বেগমও ওই অশান্তিতে যোগ দেয়।

নিহতের খালাতো ভাই আসলাম মিয়া জানান, ‘বিয়ের পর থেকে আনোয়ারের স্ত্রী আজেদা খাতুন ছিলেন বেপরোয়া। এরই মধ্যে ৪ থেকে ৫ বার বিভিন্ন ছেলের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সর্বোচ্চ একবছর ১ ছেলের সাথে পালিয়ে বাইরেও থাকেন। কিন্তু সন্তানের জন্য সব কিছু মেনে নিয়ে সংসার করছিলেন ভাই। এরই মধ্যে প্রজেক্টে বসবাস শুরু করলেও সেখানেও ভাবী একাধিক পুরুষের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে অশান্তি চলছিল তাদের। ’

নিহতের ভাবী পারভীন আখতার জানান, ‘বিয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পুরুষের সাথে বাড়ি ছেড়েছিল আজেদা। কিন্তু পরিবারের সম্মানের ভয়ে এবং মেয়ে বড় হওয়ার কারণে দেবর তাকে ঘরে রেখেছিলেন। কিন্তু তারপরেও সে শোধরাতে পারেনি। প্রজেক্টে বাড়ি করে বসবাস করার পর সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।’

নিহতের বড় ভাই আতোয়ার হোসেন জানান, ‘আমরা যখন একই বাড়িতে থাকতাম। তখনও তার স্ত্রী বিভিন্ন পুরুষের সাথে মিশতো। এ নিয়ে বেশ অশান্তি চলছিল। পরবর্তীতে পরিকল্পনা করে কৌশলে ভাইয়ের স্ত্রী প্রজেক্টের মধ্যে বসবাস করতে ভাইকে বাধ্য করায়। সেখানে বসবাস শুরুর মাত্র ৪ মাসের মাথায় পরিকল্পনা করে আমার ভাইকে হত্যা করলো তার স্ত্রী। এই হত্যাকান্ডের জড়িতদের ফাঁসি চাই। ’

খবর পেয়ে সকালেই প্রজেক্টে ছুটে যান অগ্রণী ব্যাংক রংপুর সেন্টাল রোড শাখার এজিএমসহ কর্মকর্তাবৃন্দ। তারা জানান, একজন সৎ ও দক্ষ কর্মচারী ছিলেন আলাল হোসেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তেন কাজের ফাঁকে ফাঁকে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.