প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ অর্কিড উদ্বোধন করেন : এফএনএস
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ অর্কিড উদ্বোধন করেন : এফএনএস

উন্নয়নে অংশীদার হতে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শরিক হতে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নিজস্ব শিল্পপার্ক গড়ে তোলার জন্য সরকার তাদের ৫০০ একর বা তারও বেশি জমি বরাদ্দে প্রস্তুত রয়েছে।
সারা দেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করছে। এই সুবিধা গ্রহণ করে সেখানে শিল্প স্থাপনের জন্য সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসতে পারেন।’
তিনি হোটেল সাং গ্রিলাতে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ব্যবসায়ী ফোরামের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে গতকাল এ কথা বলেন।
ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুর, সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন, বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর যৌথভাবে ‘নতুন অধ্যায়ের পথে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী লিম হং কিয়াং অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। এ ছাড়া ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত সিইও ক্যাথি লাই এবং সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশনের চেয়ারম্যান এস এস তেও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্র্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, জাপান ও নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশী পণ্যের কোটামুক্ত এবং শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জাতিকে আমাদের ডিজিটাইজেশনের অংশ হিসেবে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১-এর মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছি। যেখানে ২০২১ নাগাদ দেশকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
তিনি বলেন, আমাদের জিডিপির চার-পঞ্চমাংশ আসে উৎপাদনশীল খাত থেকে, ২০১৭ সালে প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস এক তথ্যানুযায়ী, আগামী তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বের তৃতীয় ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি হিসেবে উঠে আসবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শহরের ভোক্তা শ্রেণী হবে, যা একটি বিশাল বাজারের সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গেল অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, রিজার্ভের পরিমাণ বর্তমানে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। যেখানে ২০০৫ সালে এই রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, দারিদ্র্যের হার যেখানে ২০০৫ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, তা বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর ৬ মাস হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে জনগণের মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলার। ক্রয় সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বীকৃতি হিসেবে শিগগিরই বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন লাভ করতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের খ্যাতি বিশ্বজোড়া উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালে তৈরী পোশাক খাতে আমাদের রফতানির পরিমাণ ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে ক্ষেত্রে পোশাক রফতানির শীর্ষ দেশ চীনের পরের অবস্থানটিই বাংলাদেশের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ তৈরী পোশাক খাতে রফতানির পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
একই সাথে ওষুধ শিল্পের সমৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশ মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আমাদের তৈরী ওষুধ বিশ্বের ১২০টি দেশে রফতানি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাত এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের হালকা ও মাঝারি ধরনের সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরি হচ্ছে। একই সাথে বিদেশী বিনিয়োগে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক আইটি পার্ক। ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশের আইটি খাত।
ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষে দুই দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য জোরদারের অংশ হিসেবে দুই দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার সংক্রান্ত চারটি চুক্তি সই
বাংলাদেশের আইসিটি বিভাগ ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সিস্টেম সায়েন্স (এনইউএস-আইএসএস)-এর মধ্যে ডিজিটাল লিডারশিপ, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল গভর্নমেন্ট ট্রান্সফারমেশন সংক্রান্ত দ্বিতীয় চুক্তিটি সম্পন্ন হয়।
ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন ২০২১ কার্যক্রম এবং এ সংক্রান্ত জাতীয় প্রকল্পগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির সহায়তায় বেসরকারি পরামর্শ প্রদানের লক্ষ্যে আইসিটি বিভাগের সচিব সুবির কিশোর চৌধুরী এবং এনইউএস-আইএসএস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজ নিজ পক্ষে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
তৃতীয় চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার এবং বাংলাদেশের শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) ও সিঙ্গাপুর মেনুফ্যাকচারিং ফেডারেশন (এসএমএফ)-এর মধ্যে সম্পাদিত হয়। এফবিসিসিআই-এর পক্ষে সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ সাইফুল ও এসএমএফ-এর পক্ষে প্রেসিডেন্ট ডগলাস ফু স্বাক্ষর করেন।
শেষ চুক্তিটি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্র্রিজ (এমসিসিআই) এবং এসএমএফ-এর মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এমসিসিআই-এর সভাপতি নিহাদ কবির এবং এসএমএফ-এর পক্ষে ডগলাস ফু নিজ নিজ অবস্থানে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী লিম হ্যাং কিয়াং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এন্টারপ্রাইজ, সিংঙ্গাপুর-এর ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথি রেই ও সিংঙ্গাপুর ব্যবসায়ী ফেডারেশন (এসএস)-এর চেয়ারম্যান টিও উপস্থিত ছিলেন।
সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনে নিজের নামে অর্কিড উন্মোচন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল ইউনেস্কো বিশ্ব হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনের ন্যাশনাল অর্কিড গার্ডেনে তার নামে একটি অর্কিড উন্মোচন করেছেন।
সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সফরটি স্মরণীয় করে রাখতে অর্কিডটির নাম ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী গত রোববার সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের আমন্ত্রণে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে তার প্রথম সরকারি সফরে আসেন।
সিঙ্গাপুরের জাতীয় ফুল অর্কিডের যে প্রজাতির নাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ নামকরণ করা হয়েছে, বোটানিক বাগানের কর্মকর্তারা ‘সানপ্লাজা পার্ক’ ও ‘সেলেটার চকোলেট’ প্রজাতির শংকরায়নের মাধ্যমে সেটি উদ্ভাবন করেছেন।
সিঙ্গাপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক ড. নাইজেল টেইলর সি হর্ট সকালে এখানে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা নামকরণ করা অর্কিডটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, তার স্ত্রী পেপী সিদ্দিক ও তাদের দুই সন্তান এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সিঙ্গাপুরের রীতি অনুসারে ১৯৫৭ সাল থেকে দেশটিতে সফরকারী বিভিন্ন দেশের প্রায় আড়াই শ’ রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের নামে স্থানীয় অর্কিডের নামকরণ করা হয়েছে বলে বাগানের ব্যবস্থাপক ডেভিড লিম জানান। তাদের সফরকে স্মরণীয় করে রাখতেই এটা করা হয়।
‘ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা’ অর্কিডটি এখন থেকে গার্ডেনের ভিআইপি গ্যালারির শোকেসে শোভা পাবে।
প্রধানমন্ত্রী পুরো অর্কিড বাগানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বাগানটিতে এক হাজার প্রজাতি ও দুই হাজার শংকরায়নকৃত উদ্ভিদ রয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.