ফেনীর একরাম হত্যায় ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড

শাহাদাত হোসাইন ফেনী

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ফেনীর আদালতে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যা মামলায় ৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। এরা সবাই আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। অন্য ১৬ আসামিকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে। জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হক এ রায় দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গতকাল বেলা ৩টা ১৫ মিনিটে একরাম হত্যা মামলার বহু প্রতীক্ষিত রায় পড়া শুরু হয়। রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ৩টার আগেই গ্রেফতারকৃত ৩৬ আসামিকে জেলা কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে কঠোর নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। ৩টা ৩০ মিনিটে বিচারক এ হত্যাকাণ্ডে ৩৯ জনের ফাঁসি ও প্রত্যেকের ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেনÑ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল, ফুলগাজী উপজেলা যুগ্ম সম্পাদক জাহিদ চৌধুরী, ফেনী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি আবদুল্লাহিল মাহমুদ শিবলু, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন বড় মনির ছেলে আবিদ, এমরান হোসেন রাসেল প্রকাশ ইঞ্জিনিয়ার রাসেল, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, আজমীর হোসেন রায়হান, শাহজালাল উদ্দিন শিপন, নুর উদ্দিন মিয়া, আবদুল কাইয়ুম, সাজেদুল ইসলাম পাটোয়ারি সিফাত, জাহিদুল হাসেম সৈকত, আবু বক্কর ছিদ্দিক, আরমান হোসেন কাউছার, চৌধুরী মোহাম্মদ নাফিজ উদ্দিন অনিক, জাহিদুল ইসলাম, ফেরদৌস মাহমুদ খান হিরা, মোহাম্মদ সজিব, ইসমাইল হোসেন ছুট্টু, পাংকু আরিফ ওরফে হুমায়ুন, জসিম উদ্দিন নয়ন, মামুন, মোহাম্মদ সোহান চৌধুরী, মানিক, কপিল উদ্দিন মাহমুদ, টিটু, নিজাম উদ্দিন আবু, রাহাত মোহাম্মদ এরফান, টিপু, আরিফ ওরফে নাতি আরিফ, রাশেদুল ইসলাম রাজু, রুবেল, বাবলু, সফিকুর রহমান মায়া, ফারুক, একরাম হোসেন আকরাম, মহিউদ্দিন আনিস। এ ছাড়া প্রধান আসামি মাহতাব উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মিনারসহ ১৬ জন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। বিএনপি নেতা মিনার চৌধুরী ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে একরামের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। অপর খালাসপ্রাপ্তরা হলেন পৌর যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জিয়াউল আলম মিষ্টার, কাজী শানান মাহমুদ, আলমগীর ওরফে আলাউদ্দিন, সাইদুল করিম পাপন, জাহিদ হোসেন ভূঞা, মো: বেলায়েত হোসেন পাটোয়ারী, মো: মাসুদ, আবদুর রহমান রউফ, ইকবাল, শাখাওয়াত হোসেন, সফিকুল জামিল পিয়াস, কাদের, কালা মিয়া, মো: ইউনুছ ভূঞা শামীম ও রিপন।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: মনির উদ্দিন জানান, এ ধরনের রায় ফেনীর ইতিহাসে প্রথম। একরাম হত্যা মামলায় দেড় শ’ পৃষ্ঠার রায় লিখা হয়েছে। এর আগে জয়নাল হাজারীর অস্ত্র মামলায় ১০৮ পৃষ্ঠার রায় দেয়া হয় বলে তিনি জানান।
পিপি হাফেজ আহম্মদ জানান, ফেনীর ইতিহাসে এই প্রথম একসাথে ৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। এর আগে ফেনীর আদালতে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। এ রায় ঐতিহাসিক, নজিরবিহীন। ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করতে কেউ সাহস করবে না বলে আদালত মনে করেছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তুষ্ট।
মামলার রায়কে ঘিরে আদালত অঙ্গনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। দুপুর থেকে আদালত অঙ্গন জনশূন্য রাখা হয়। তবে আদালত সম্মুখস্থ সড়কে অন্য দিনের চেয়ে জনসমাগম ছিল বেশি। সেখানে মামলায় গ্রেফতারকৃতদের স্বজন ও শুভাকাক্সী ছাড়াও উৎসুক জনসাধারণের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। রায়কে ঘিরে সকাল ১০টা থেকে আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় জমাতে থাকেন প্রিন্ট ও ইলেকট্র্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকেরা।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ১৭ জন অধরা : আলোচিত ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি একরামুল হক একরাম হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের ১৭ জন ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। চার্জশিটভুক্ত ১০ আসামিকে প্রায় চার বছরেও ধরতে পারেনি পুলিশ। এদের মধ্যে একজন এ মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। গ্রেফতার হওয়ার পর জামিন নিয়ে পালিয়ে যাওয়া ৯ জনের মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে।
২০১৪ সালের ২০ মে শহরের একাডেমি সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান একরামুল হক একরামকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার পর তার গাড়িও পুড়িয়ে ফেলা হয়। বীভৎস্য এ হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ আগস্ট ৫৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দেয়া হয়। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে ইসমাইল হোসেন ছুট্টু, কপিল উদ্দিন মাহমুদ আবির, টিটু, রাহাত মো: এরফান আজাদ, বাবলু, শফিকুর রহমান ময়না, একরাম হোসেন আকরাম, মোসেলহ উদ্দিন আসিফ ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় জামিন নিয়ে পালিয়ে গেছেন আরো ৯ আসামি। এরা হলেন এমরান হোসেন রাসেল ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রাসেল, জাহিদুল হাসেম সৈকত, চৌধুরী মো: নাফিস উদ্দিন অনিক, আবিদুল ইসলাম আবিদ, জিয়াউর রহমান বাপ্পি, নুরুল আবসার ওরফে জাহিদ চৌধুরী, আরমান হোসেন কাউসার ও জসিম উদ্দিন নয়ন। মামলায় জামিনে থাকা মো: সোহেল ওরফে রুটি সোহেল নামে একজন আসামি এরই মধ্যে র‌্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জামিনপ্রাপ্তদের মধ্যে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহিদ চৌধুরী ও জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন বড় মনির ছেলে আবিদুল ইসলাম আবিদ প্রবাসে আত্মগোপন করেছে।
রায়ের দিন আসামিদের মুক্তি দাবিতে মানববন্ধন : এ দিকে রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ-ছাত্রলীগের ব্যানারে শত শত দলীয় লোকজন সকাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে জড়ো হয়। তারা ওই মামলায় গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করে আদালত সম্মুখস্থ সড়কে মানববন্ধন করে। একপর্যায়ে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।
একরামের স্বজনেরা কেউ আসেনি আদালতে : আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক একরাম হত্যা মামলার রায়ের দিন আদালতে তার স্বজনদের কাউকে দেখা যায়নি। রায় ঘোষণার আগে আদালত বাদিসহ স্বজনদের ডাকাডাকি করেও কাউকে পায়নি।
তাদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, মামলার বাদি একরামের বড় ভাই রেজাউল হক জসিম মামলার শুরু থেকে আদালতে আসেননি। নিরাপত্তাজনিত কারণেই তারা অনুপস্থিত বলে ওই সূত্র জানায়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত উল্লেখ করেছে, সাক্ষী ও তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তাজনিত কারণে আদালতে আসেনি। মামলায় ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৯ জন আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য প্রদান করলেও অনেকে প্রাণভয়ে সঠিক তথ্য দেয়নি। ১৬ জন আসামির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দীর ভিত্তিতে ও মামলা তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবুল কালাম আজাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় ৩৯ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৬ জনকে খালাস দেয়া হয় বলে বিচারক উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে এ খুন : একরাম হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব বলে উল্লেখ করেছেন আদালত। রায় ঘোষণার সময় জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হক বলেন, আদেল সাহেবসহ (জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির আদেল) প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, প্রভাব বিস্তার, ক্ষমতা ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। আসামিদের উপস্থিতিতে ঘটনাস্থলে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.