বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত হোক জীবনের স্বার্থে

আমিনুল ইসলাম শান্ত

নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনের বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানিতে দেশের মানুষ শোকাহত। দুর্ঘটনায় হতাহত আরোহী ও তাদের পরিবার, বিধ্বস্ত বিমানের কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষ ও সরকার ক্ষতিগ্রস্ত। এর বেদনা, কষ্ট ও ক্ষতি সবই আমাদের। বিমান দুর্ঘটনা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু, কথাটি দৃশ্যমান সত্য বটে; আবার অনেক বড় সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়ানো এবং যাত্রীদের বেঁচে যাওয়ার ঘটনাও বিশ্বে কম নয়। একটি বিমান দুর্ঘটনার কারণ আপাতদৃষ্টিতে জনসাধারণের কাছে এক রকম, এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছে আরেক রকম আর পাইলট ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট যেমনÑ নির্মাণকারী সংস্থার কাছে ভিন্ন রকম। বিষয়গুলো বাস্তবতার নিরিখে আপেক্ষিক।
সোমবার দুপুরে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলার যাত্রীবাহী বিমান অবতরণের আগে যে দুর্ঘটনায় পতিত হয় তা মর্মান্তিক এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি দুর্বিষহ নতুন অধ্যয়। ঘটনা নিয়ে ইতোমধ্যেই বিমান কর্তৃপক্ষ ও কাঠমান্ডু এয়ার ট্রাফিক রুম পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দেয়া শুরু করেছে। পাইলট ও কন্ট্রোল রুমের পারস্পরিক কথাবার্তার অডিও চলে এসেছে গণমাধ্যমে। এ কথাবার্তায় পাইলটের সাথে এয়ার কন্ট্রোল রুমের বিভ্রান্তি স্পষ্ট। আমরা চাই, একটি প্রভাবমুক্ত নিরপেক্ষ তদন্ত। তদন্তের স্বার্থে ইতিবাচক দিক হলোÑ দুর্ঘটনার স্থল রানওয়ের এলাকা হওয়ায় বিধ্বস্ত বিমানটির ব্ল্যাক বক্স সহজে সংগ্রহ, সিসি ক্যামেরাসহ অন্যান্য লাইভ ফুটেজ ও আনুষঙ্গিক মূল্যায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটে যেখানে ব্ল্যাক বক্স খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, এ দুর্ঘটনায় তেমনটি হবে না। কারণ রানওয়ের খুব কাছেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। দ্রুত সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেই আমাদের ধারণা। এটি একটি দুর্ঘটনা নিঃসন্দেহে। তবুও দুর্ঘটনাকে কারণের জালে বিশ্লেষণ করলে অনেক ভুলভ্রান্তি বেরিয়ে আসে, যা থেকে আরো উচ্চতর গবেষণালব্ধ চলাচল নির্দেশনা সৃষ্টি করা যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে সর্বাধিক ব্যয়বহুল ও তথ্যবহুল প্রামাণ্যচিত্র সাধারণ দর্শকদের কাছে তুলে ধরে ডিসকভারি টিভি চ্যানেল ও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল। ত্রিভুবন বিমানবন্দর নিয়েও তাদের নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র আছে। আমরা জানি, বিমান দুর্ঘটনার সাধারণ কারণগুলো হলোÑ ক. পাইলটের ভুল খ. মেকানিক্যাল ফেইলর বা যান্ত্রিক ত্রুটি (ইকুইপমেন্ট ত্রুটির কারণে ২০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। যাতে ডিজাইন ও নির্মাণের মান প্রসঙ্গ জড়িত।) গ. বৈরী আবহাওয়াজনিত কারণে ১০ শতাংশ ঘ. অন্য পক্ষ কর্তৃক ধ্বংস করা ( হাইজ্যাকিং, বোম্বিং) ঙ. অন্যান্য মনুষ্য সৃষ্ট ত্রুটি (যেমন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুমের ভুল করা বা ভুল নির্দেশনা, ডেসপাচার, লোডার, ফুয়েলার, মেইনটেন্যান্স প্রকৌশলী) প্রমুখের ভুলে।
সোমবারের দুর্ঘটনায় আমাদের দেখার বিষয়Ñ বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না? আবহাওয়া কেমন ছিল, ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিল কি না এবং ভুল নির্দেশনা ছিল কি না ইত্যাদি। তথ্য মোতাবেক, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনের আন্তর্জাতিক ও ডোমেস্টিক রুটে মোট ৯টি ফ্লাইট চলাচল করে। ডোমেস্টিক রুটে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, সৈয়দপুর, বরিশাল ও সিলেটে চলাচল করে আর আন্তর্জাতিক রুটের মধ্যে গন্তব্য হলো সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ব্যাংকক, মাস্কট, কলকাতা ও নেপাল। বাংলাদেশে খুব অল্প সময়ে এয়ারলাইনটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়Ñ টেক অফ জার্কিং, স্মুথনেস, অবতরণকালীন সহজবধ্যতা ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পাইলটের দক্ষতায় আমাদের দেশীয় এই এয়ার লাইনটি পরিচালনায় ভালো ও গ্রহণযোগ্য।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব বড় বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনের এমএইচ ৩৭০ ফ্লাইট রহস্যজনক হারিয়ে যাওয়া। ২০১৪ সালে কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিং যাওয়ার পথে যাত্রী নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার রহস্য আজো অনুদঘাটিত। ওই ফ্লাইট খোঁজার জন্য সমুদ্রের অতল থেকে পাহাড়ের গহিন জঙ্গলে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা যে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেছে তা বিরল।
সোমবারের দুর্ঘটনায় এ লেখার সময় পর্যন্ত (মঙ্গলবার সকাল) প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তে প্রতীয়মান যে, এয়ার ট্রাফিকের সাথে পাইলটের কথার ভুল বোঝাবুঝি ছিল। সেটার সূত্রপাত ও ধারাবাহিকতা, টাইম ফ্রেম (এখানে সেকেন্ডের পালসও গুরুত্বপূর্ণ) কেমন ছিল সেগুলো তদন্ত সাপেক্ষে বেরিয়ে আসবে এটা পাইলটের ভুল ছিল নাকি ট্রাফিক কন্ট্রোলারের ভুল ছিল? এই ভুল বোঝাবুঝির সময় কতক্ষণ ছিল, এ ধরনের পরিস্থিতিতে পাইলটের কী কী বিকল্প থাকতে পারে, আর তিনি বিকল্পগুলো প্রয়োগ করেছেন কি না সেটা তদন্ত করে বের হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এভিয়েশন নিরাপদ করার লক্ষ্যে প্রয়োজন একটি চুলচেরা তদন্ত। যেখানে বহুপক্ষের অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।
এমন তথ্য গণমাধ্যমে এসেছে যে, ইউএস-বাংলার বোম্বাইডার ড্যাস কিউ ৪০০ ফ্লাইটটি ছিল ১৭ বছরের পুরনো এবং দুর্ঘটনাকবলিত এ ফ্লাইটটি ইতঃপূর্বে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ে ২০১৫ সালে রানওয়েতে ইউ-টার্ন করে পার্কিং বে-তে যখন আসছিল তখন একটি চাকা আটকে যায়। সোমবারের দুর্ঘটনায় আপাত দৃষ্টিতে সেটা কারণ নয় বলে মনে হচ্ছে।
আলজাজিরা বলছে, পাইলটকে দোষ দেয়া হচ্ছে, আবার ভুল ডাইরেকশনের কথাও আসছে।
ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ম্যানেজার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেছে, ঘটনা ঘটেছে পাইলটের ভুলে, কন্ট্রোল রুমের বিরুদ্ধে গিয়ে। তিনি বলেন, The aircraft skidded off the runaway after attempting to land in the Ôwrong direction against the order of the control roomÕ. ÔThe control room had given permission to land from the southern end. But it landed from the northern side after making few rounds in the sky, ’
সেটারও একটা ডকুমেন্ট আছে নিশ্চয়ই? বলা হচ্ছে, অপ্রচলিত ল্যান্ডিং করতে চেয়েছিলেন পাইলট। তিনি অপ্রচলিত ল্যান্ডিং কেন করবেন? কারণটি তদন্ত হওয়া জরুরি।
এই দুর্ঘটনায় নিঃসন্দেহে নেপাল এবং বাংলাদেশ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত।
এটা প্রতিষ্ঠিত এবং আগে প্রমাণিত সত্য যে, নেপালের এয়ার সেফটি রেকর্ড দুর্বল। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো যে কারণে এই এয়ারপোর্টকে গন্তব্য হিসেবে নিষেধ করেছে। প্রায় প্রতি বছরেই এই এয়ারপোর্টে দুর্ঘটনা ঘটে। বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি রয়েছে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের; কিন্তু হিমালয় পর্বত ও ট্যুরিস্ট গন্তব্য হওয়ায় ফ্লাইট কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিয়ে মুনাফার আশায় ফ্লাইট পরিচালনা করে থাকে। সঠিক তদন্ত হোক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে এবং এটা সময়ের দাবি। হ
লেখক : গণমাধ্যম ও সমাজকর্মী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.