পরিস্থিতি উত্তরণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ভূমিকা চান সংশ্লিষ্টরা

৩ দিনে ২০৪ পয়েন্ট সূচক হারিয়েছে ডিএসই
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পতন থামছে না পুঁজিবাজারের। ক্রমান্বয়ে তা বড় বিপর্যয়ের দিকে এগোচ্ছে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিনিয়োগকারীরা। গতকাল পর্যন্ত টানা তিন দিন বড় ধরনের সূচক হারিয়েছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। এ তিন দিনে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) হারিয়েছে প্রধান সূচকটির ২০৪ পয়েন্টের বেশি। পুঁজিবাজারের চলমান পরিস্থিতির জন্য গতকাল ডিএসইতে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট পাঁচটি সংগঠনের এক বৈঠকে তারল্য সঙ্কটকেই চিহ্নিত করা হয়।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৮১ দশমিক ৯২ পয়েন্ট হারায়। ৫ হাজার ৭০৫ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৬২৩ দশমিক ৬৪ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ সূচক হারায় যথাক্রমে ২১ দশমিক ৯১ ও ১৭ দশমিক ৫৬ পয়েন্ট। এর আগে রবি ও সোমবার প্রধান সূচকটি যথাক্রমে ৬৭ দশমিক ৭৯ ও ৫৪ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট হারায় ডিএসই।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ও সিএসইসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২৬১ দশমিক ৪৭ ও ১৫৬ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট। এখানে সিএসই ৫০ ও সিএসই শরিয়াহ সূচক হারায় যথাক্রমে ১৯ দশমিক ১৩ ও ১৭ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট। গত তিন দিনে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচকের অবনতি ঘটে ৬১৪ পয়েন্টের বেশি।
আগের দুই দিনের মতো গতকাল সকালেও লেনদেনের শুরুতে বিক্রয়চাপ তৈরি হয়। লেনদেন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল ততই বাড়ছিল বিক্রয়চাপের মাত্রা। একই সাথে ব্যাপকভাবে দরপতন ঘটছিল লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর। এভাবে বেলা ২টা পর্যন্ত একটানা দরপতনে দরপতন ঘটে উভয় বাজারে লেনদেন হওয়া প্রায় ৮৭ শতাংশ কোম্পানি।
সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেরও কমবেশি অবনতি ঘটে দুই পুঁজিবাজারে। ঢাকা শেয়ারবাজারে গতকাল ২৮২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ৭ কোটি টাকা কম। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ২৮৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ৪৫ কোটি টাকা থেকে ২৬ কোটিতে নামে লেনদেন।
পুঁজিবাজারের সব খাতেই ব্যাপক দরপতন ঘটে গতকাল। কমপক্ষে পাঁচটি খাতে দর হারায় শতভাগ কোম্পানি। তবে দিনের সূচকের অবনতিতে বরাবরের মতো বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোর ভূমিকাই ছিল বেশি। এদের মধ্যে ব্যাংক, ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ডিবমা ও মিউচুয়াল ফান্ড উল্লেখ করার মতো। এ চারটি খাতে ৯০ শতাংশের বেশি কোম্পানি দর হারায়। আবার ব্যাংক খাতে এ হার ছিল শতভাগ। শতভাগ দর হারানো কোম্পানির অন্য খাতগুলো ছিল সিরামিকস, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকমিউনিকেশন, কাগজ ও বিবিধ খাত। ঢাকায় গতকাল লেনদেন হওয়া ৩৩৬টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৮টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২৯১টি। অপরিবর্তিত ছিল ২৭টির দর। অপর দিকে চট্টগ্রামে লেনদেন হওয়া ২৩০টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ১৮টির দাম বাড়ে, ১৯৬টির কমে এবং ১৬টি সিকিউরিটিজের দাম অপরিবর্তিত থাকে।
এ দিকে পুঁজিবাজারের চলমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে তারল্য সঙ্কটকেই চিহ্নিত করেছেন পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এ সঙ্কট উত্তরণে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসার প্রয়োজন মনে করেন তারা। গতকাল ডিএসইতে অনুষ্ঠিত পাঁচটি সংগঠনের বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিমত ব্যক্ত করেন বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নাসির উদ্দন চৌধুরী। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন ডিএসই ব্র্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক।
বিএমবিএ সভাপতি বলেন, পুঁজিবাজারে এখন সবচেয়ে বড় সঙ্কট তারল্যের। এ সমস্যা শুধু বেসরকারি ব্যাংকগুলোর রয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত সমন্বয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়ায় এ সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এ সমস্যা নেই। এখনো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত ৫০ এর ঘরে। এ ব্যাংকগুলোর সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোও পুঁজিবাজারে কমবেশি সক্রিয়। অথচ তাদের সক্ষমতা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। চলমান সঙ্কটে তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোরই এগিয়ে আসা উচিত। এতে বাজারে তারল্যপ্রবাহ বাড়বে।
তিনি আরো বলেন, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর দ্বিতীয় যে সমস্যা তা হলো একক গ্রাহক ঋণসীমা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কস্ট প্রাইস হিসাবের পরিবর্তে মার্কেট প্রাইস হিসাব করে আসছে, যা পৃথিবীর কোনো দেশেই কার্যকর নেই। বারবার এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তারা এ ব্যাপারে ছাড় দিতে নারাজ। তা ছাড়া বিভিন্ন বন্ড ও নন লিস্টেড কোম্পানিতে বিনিয়োগকেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজারের এক্সপোজার হিসেবে ধরে নিচ্ছে। এটা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ডিবিএস সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক বলেন, পুঁজিবাজারের সঙ্কট উত্তরণে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। এর মধ্যে ছিল কস্ট প্রাইসে ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাব করা, ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অনুপাত ৬ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং আইসিবিকে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ মুক্ত রাখা। উল্লিখিত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিলে চলমান তারল্য সঙ্কট অনেকাংশে কেটে যাবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.