রাতের ঢাকা এখন অভিশপ্ত হয়ে উঠছে
রাতের ঢাকা এখন অভিশপ্ত হয়ে উঠছে

অরক্ষিত রাতের ঢাকা

মাহমুদুল হাসান

রাতে রাজধানীতে চলাফেরা বা কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ঢাকাবাসীর মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক কাজ করে। দিনের বেলায় গাড়ি আর মানুষের জন্য পুরো ঢাকা শহরজুড়ে দম ফেলা দুষ্কর। একের পর এক গাড়ি যাচ্ছে আর আসছে। নিয়ম ভেঙে মানুষও যত্রতত্রভাবে রাস্তা পার হচ্ছে। গাড়ি হর্ন আর মানুষের চেঁচামেচিতে দিনের ঢাকা এক কথায় চিৎকারের নগরী। কিন্তু রাতে দিনের মতো এত গাড়ি আর মানুষ থাকে না। রাতের ঢাকা যেন অন্য এক রূপকথার ছবি আঁকে নগরীজুড়ে।
রাতের ঢাকা নীরব, রাতের ঢাকা কোলাহলমুক্ত। রাতের ঢাকায় দিনের ব্যস্ততম সড়কের মাঝখানে হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন। রাতে যখন বের হবেন, দেখবেন আর কেউ নেই আশপাশে। তখন পুরো পরিবেশটা একান্তই নিজের মনে হবে। যারা রাতের ঢাকা দেখে অভ্যস্ত নন, তাদের কাছে এর সৌন্দর্য অনবদ্য। তবে কিছু মানুষের অপকর্মের ফলস্বরূপ রাতের ঢাকা এখন অভিশপ্ত হয়ে উঠছে। বিদেশী সংস্কৃতির অনুকরণ, ড্রাগ, টাকার নেশায় অশ্লীল দৌড়ঝাঁপের কাছে মানবিকতার কোনো ঠাঁই নেই।
চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি রাতে শেরেবাংলানগর এলাকায় এসকান হাওলাদার নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালককে হত্যা করে তার ওই গাড়িটি নিয়ে যায় ছিনতাইকারীচক্র। এর আগে ডিসেম্বরে দয়াগঞ্জে এক রিকশা আরোহী নারীর ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাইকারীরা টান দিয়ে ছিনিয়ে নেয়ার সময় কোল থেকে তার পাঁচ মাসের ছেলে পড়ে গিয়ে মারা যায়। এর আগে নভেম্বরে মতিঝিলে হাতব্যাগ ছিনিয়ে নেয়ার সময় রিকশা থেকে পড়ে আহত হন এফবিসিসিআইয়ের এক নারী কর্মকর্তা। গত বছরের ২৯ নভেম্বর মিরপুর সড়কের কলেজ রোড সিগন্যাল থেকে রিকশা নিয়ে মোহাম্মদপুর যাওয়ার সময় আক্রান্ত হন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট (এনআইসিভিডি) ও হাসপাতালের চিকিৎসক ফরহাদ আলম। কাছেই শাহজাহান রোডে মোটরসাইকেলে আসা দুই ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে তার ব্যাগ নিয়ে যায়। এতে রাস্তায় ছিটকে পড়ে নিহত হন চিকিৎসক ফরহাদ। সর্বশেষ রাজধানীর ধানমন্ডির সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় শনিবার রাত ১টার দিকে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় আলমগীর হোসেন (৪০) নামে এক রিকশার যাত্রী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ওই রিকশাচালক আহত হয়েছেন। ধানমন্ডি থানার উপ-পরিদর্শক জসিমউদ্দিন বলেন, সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার রিকশাটিকে ধাক্কা দেয়। এতে রিকশায় থাকা যাত্রী আলমগীর হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনায় আহত হন রিকশাচালক।
রাতে উন্মাদ নেশাখোরদের দখলে থাকে ঢাকা। তাদের নেশার টাকার জোগান না দিতে পারলেই অসহায় নগরবাসীর ওপর নেশাখোরদের চোখ পড়ে। গত ২৬ জানুয়ারি শুক্রবার ভোরে এক ঘণ্টার ব্যবধানে রাজধানীর ধানমন্ডি ও সায়েদাবাদ এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন হেলেনা আক্তার ও ইব্রাহিম হোসেন নামে দুই পথচারী। জানা যায়, ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কের মুখে প্রাইভেট কারে আসা ছিনতাইকারী দল হাত থেকে ব্যাগ টেনে ছিনিয়ে নেয়ার সময় গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন হেলেনা। অন্য দিকে, একই সময় সায়েদাবাদের স্বামীবাগ রেললাইনের পাশের গলিতে ছুরি মেরে ইব্রাহিমকে হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা। ইব্রাহিম যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন তার কাছাকাছি দয়াগঞ্জে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ভোরে এক রিকশা আরোহী দম্পতির ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আরাফাত নামে তাদের ছয় মাস বয়সের শিশু ছিটকে রাস্তায় পড়ে মারা যায়। গত ৮ অক্টোবর ওয়ারীতে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র খন্দকার আবু তালহা ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন।
ছিনতাইকারী ও নেশাখোরদের দখলে রাজধানী ঢাকা। এ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে, পুলিশ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। ছিনতাই নির্মূলে পুলিশের সদিচ্ছাই যথেষ্ট। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ বাহিনীকে সেবার মানসিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে। জনসাধারণের নিরাপত্তা বিধানই হোক পুলিশের প্রথম ও প্রধান কাজ।
পেশায় চিকিৎসক নাইমা বেগমের চেম্বার উত্তরায়, আর বাসা আজিমপুরে। রোজ রাত ৯টার পর তাকে বাসে করে আজিমপুরে ফিরতে হয়। তিনি বলেন, প্রায় প্রতি রাতেই তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। অনেক সময় যে বাসে ফিরি, সেই বাসের কন্ডাক্টর টিজ করার চেষ্টা করে। আর রাস্তাঘাটের মানুষ তো আছেই। প্রতিবাদ করলে দেখা যায়, ইট মেরে পাটকেল খাওয়ার মতো অবস্থা হয়।
ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত সড়ক ফার্মগেটের রাস্তায় রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে অল্প হাতেগোনা কয়েকজন নারীর মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কাশফিয়া তানজিম। মায়ের সাথে দাঁড়িয়ে উত্তরাগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, রাতে কোথাও কোনো কাজ থাকলে সাথে মা-বাবা বা বন্ধুদের কেউ না কেউ থাকে। সবসময় ভয়ে থাকি বাসে পাশে সিটটায় কে এসে বসল। দেখা যায়, অন্য সিট খালি থাকলেও মেয়েদের পাশে এসে বসতে চায় অনেক লোক। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তার অভিভাবকেরা সন্ধ্যার পর তাকে অনেক অনুষ্ঠানে যেতে দেন না। ঢাকা শহরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নিউমার্কেট এবং গুলশানসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় শিক্ষার্থী এবং পেশাজীবী নারীরা বললেন, রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে তারা প্রতিনিয়তই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও প্রাথমিকপর্যায় থেকে নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বলেন, আমরা এখন যে সমাজ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেখানে রক্ষণশীল চিন্তা-ভাবনা যেমন আছে, আবার খুব আধুনিক চিন্তা-ভাবনাও কাজ করছে। আর এই দুটি বিপরীতমুখী চিন্তা-ভাবনার জন্য সমাজে এক ধরনের নৈতিক অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় আমাদের নৈতিক অবক্ষয়, মূল্যবোধ, ভয়, লজ্জা এ বিষয়গুলো চরমভাবে ধ্বংস হচ্ছে। ধনী পরিবারগুলো ভুল ধারণা দিয়ে সন্তানদের বড় করছে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকেরা সন্তানদের সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও শ্রদ্ধাবোধ এ বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষা দিচ্ছেন না। আর নৈতিকতাহীন শিক্ষাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় সন্তানরাও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, বর্তমানে ছেলেমেয়েরা নৈতিকতা থেকে সরে এসেছে। অভিভাবকরা যদি সন্তানকে মূল্যবোধের শিক্ষা দেন, তারা কোথায়, কখন যেতে পারবে এ বিষয়গুলো ছোটবেলা থেকে শিক্ষা দেন তবে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়ানো সম্ভব। জাপানের স্কুলগুলোর মতো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়ও প্রাথমিকপর্যায় থেকে নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে। সম্প্র্রতি রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে অপহরণ, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণের ঘটনা। বিশেষ করে অপরাধীরা রাতকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যে অভিযান চালাচ্ছেনÑ অপরাধপ্রবণ স্থানগুলো ধরে সেগুলো যদি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হতো তাহলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক থাকত বলে মনে করেন তিনি। সবকিছু মিলিয়ে রাস্তায় যথেষ্ট আলো, পর্যাপ্ত পুলিশ এবং যথেষ্ট যানবাহন নেই। এগুলোই কারণ। এর সাথে আছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.