আড়ালের নায়ক ওজনিয়াক
আড়ালের নায়ক ওজনিয়াক

আড়ালের নায়ক ওজনিয়াক

নয়া দিগন্ত অনলাইন

প্রযুক্তি জগতে অ্যাপল-এর কথা শুনলেই আমাদের মনে যে নামটি ভেসে আসে তা হল স্টিভ জোবস। একদম শূন্য থেকে অ্যাপলকে পৃথিবীর প্রথম সারির একটি প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানোর জন্য জোবস দুনিয়াজুড়ে প্রশংসিত সবসময়ই। কিন্তু অ্যাপলের উত্থানের গল্পে জোবসের সঙ্গে আরো একজন ছিলেন। যার নামটি অনুচ্চারিত রয়ে গেছে। অবশ্য তিনি নিজেই ভালোবাসতেন আড়ালে থাকতে আর ভালোবাসতেন তার কাজকে। স্টিভ ওজনিয়াক। যাঁর হাত ধরে জন্ম নিয়েছিল অ্যাপল-১, অ্যাপল-২ এর মতো কম্পিউটারগুলি। এই প্রোডাক্টগুলোর তৈরি করা ভিতের উপরই দাঁড়িয়ে আছে আজকের কোটি কোটি ডলারের প্রতিষ্ঠান অ্যাপল।

ওজনিয়াক ছোটবেলা থেকেই ইলেক্ট্রনিক্স সার্কিটে বুঁদ হয়ে থাকতেন। ইলেক্ট্রনিক্সে হাতেখড়ি তার বাবার কাছ থেকেই। বাবা ফ্রান্সিস ওজনিয়াক ছিলেন ক্যালটেক থেকে পাশ করা ইঞ্জিনিয়ার। ছোটবেলায় বাবার অফিসে গিয়ে তার ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতিগুলোকে খেলনা বানিয়ে ফেলতেন ওজনিয়াক।

আর একের পর এক প্রশ্ন করে যেতেন বাবাকে। ‘এটা কী? এটা কীভাবে কাজ করে?’ কৌতুহলী ছেলেকে পেয়ে বাবাও বুঝিয়ে দিতেন যত্ন নিয়ে। বাবার সঙ্গে সেই সময়গুলির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ওজনিয়াক বলেন, ‘আমি যখন ক্লাস টু-তে, তখন বাবার কাছ থেকে প্রথম রেজিস্টর (একটি ইলেক্ট্রনিক কম্পোনেন্ট যা তড়িৎ প্রবাহে বাধা দেয়) সম্পর্কে জানি। ছবি এঁকে বাবা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এটি কীভাবে কাজ করে, এর গঠন কীরকম।’ বলা যায় সেসময় থেকেই ওজনিয়াকের ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু।

ওজনিয়াক পরবর্তীতে বলেছেন, ‘আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে চেয়েছিলাম, কারণ প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করে তোলে। আগামীকাল হয়তো ইঞ্জিনিয়াররা এমন কোনো প্রোডাক্ট নিয়ে আসবে, যার ফলে এখন যে কাজ করতে আমাদের পাঁচ দিন লেগে যায় তা চার দিনেই হয়ে যাবে।’ সেই অল্প বয়স থেকেই ওজের জগতের দুটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায় ইলেক্ট্রনিক্স জার্নাল আর সার্কিট বোর্ড।

ইলেক্ট্রনিক্স-এর দক্ষতার দিক থেকে স্টিভ জোবস আর ওজনিয়াকের মধ্যে ছিল বিস্তর ফারাক। যে বয়সে জোবস প্রথম কার্বন মাইক্রোফোন দেখে অভিভূত হয়েছেন, সেই বয়সে ওজ বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ইন্টারকম সিষ্টেম তৈরি করে ফেলেছেন। সেই ইন্টারকমে এমপ্লিফায়ার, বাজার, রিলে, লাইটসহ অনেকগুলি ফিচার ছিল। ক্লাস এইটে পড়াকালীন ওজ একটি জটিল ক্যালকুলেটর তৈরি করেন। দশটি সার্কিট বোর্ডের উপরে এটি সাজিয়েছিলেন তিনি। এ ক্যালকুলেটরটির জন্য এয়ারফোর্স আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় জিতেছিলেন পুরস্কারও। দ্বাদশ শ্রেণীর অনেক প্রতিযোগীদের হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিল অষ্টম শ্রেণীর পড়ুয়া ওজনিয়াক। দ্বাদশ বর্ষে পড়ার সময় তিনি সিলভানিয়াতে একটি পার্ট টাইম চাকরি পান এবং প্রথম কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। এরপর তাকে আর পায় কে!

কম্পিউটার সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশুনা শুরু করেন তিনি। একসময় তার মনে হলো, আরো কম সংখ্যক পার্টস ব্যবহার করে একটা কম্পিউটার ডিজাইন করলে কেমন হয়? নতুন আবিষ্কৃত হওয়া মাইক্রোচিপগুলি দিয়ে কম্পিউটার ডিজাইন করায় লেগে পড়েন ওজ। প্রতি রাতে তিনি নিজের ডিজাইনকে আগের থেকে সরল করার চেষ্টা করতেন। এভাবে স্কুল গ্র্যাজুয়েট হওয়ার আগেই কম্পিউটার ডিজাইনিং এ তিনি পুরোদস্তুর মাষ্টার হয়ে উঠেন। সেসময় বাজারের কম্পিউটারগুলোর চেয়ে অর্ধেক সংখ্যক চিপ ব্যবহার করে কম্পিউটার ডিজাইন করেন তিনি। অবশ্য পুরোটাই ছিল কাগজে কলমে। তার কোনো বন্ধুকেও এই বিষয়ে বলেননি। সে বয়সে ক’জনই বা আগ্রহী হতো এসব নিয়ে।

জোবস ও ওজনিয়াকের পরিচয় প্রযুক্তি জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতগুলোর একটি। ওজনিয়াক জোবসের চেয়ে বছর পাঁচেকের বড় ছিলেন, ইলেক্ট্রনিক্সের দক্ষতার দিক থেকেও অনেক অনেক এগিয়ে। প্রথম সাক্ষাতেই দুজনকে দুজনের ভালো লেগে যায়। মুগ্ধ হয়েছিলেন স্টিভ জোবসও। পরে তিনি বলেন, আমি প্রথম এমন কাউকে পেলাম যে ইলেক্ট্রনিকসে আমার চেয়েও বেশি দক্ষ।’
১৯৭৫ সালের দিকে ওজনিয়াক ‘হোমব্রু কম্পিউটার ক্লাব’ নামে একটি ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হন। যেখানে ইলেক্ট্রনিক্সে আগ্রহী জিনিয়াসরা নিজেদের কাজ সবার সঙ্গে শেয়ার করার জন্য নিয়ে আসত। পরে জোবসও এই ক্লাবে যোগ দেন। এই ক্লাব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ওজনিয়াকের মাথায় মিনি কম্পিউটার সম্পর্কে একটি নতুন আইডিয়া আসে। নিজের নিয়মিত চাকরির ফাঁকে দিন রাতে পরিশ্রম করে তিনি একটি কম্পিউটার তৈরি করেন, যা পরে অ্যাপল-১ নামে পরিচিত হয়। এটি পার্সোনাল কম্পিউটারের ইতিহাসে অন্যতম একটি সংযোজন।

জোবস ও ওজ এটি হোমব্রু কম্পিউটার ক্লাবের সামনে উপস্থাপন করেন। সেখানে সদস্যদের আগ্রহ দেখে জোবস এর সার্কিট বোর্ডটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেন। ব্লু বক্স বা কম্পিউটার, এসব আবিষ্কারগুলো নিয়ে ব্যবসা করার চিন্তা ওজের মাথায় আসেনি। তিনি এগুলির সার্কিট ডিজাইনগুলি কাগজে এঁকে সবাইকে ফ্রিতে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জোবস তাকে রাজি করালেন যে সবার তো আর এ ডিজাইন অনুসারে সার্কিট বানিয়ে কাজ করার মতো সুযোগ নেই। তাই আমরাই সার্কিট তৈরি করে বিক্রি করি। জোবস অন্য একটি প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের ডিজাইন অনুসারে ৫০টি সার্কিট তৈরি করেন। এতে খরচের অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় ১০০০ ডলারের মতো।

জোবস ওজকে বললেন, ‘আচ্ছা আমাদের লাভ হোক বা না হোক, এই উদ্যোগটা নিলে আমাদের তো একটা কোম্পানি হয়ে যাবে, তাই না?’ মূলধন যোগাতে ওজ তার এইচপি ক্যালকুলেটর আর জোবস তার ভক্সওয়াগনটি বিক্রি করে দিলেন। সব মিলিয়ে তাদের মূলধন গিয়ে দাঁড়াল ১৩০০ ডলারে। জন্ম নিলো অ্যাপল। আর তাদের প্রথম প্রোডাক্ট অ্যাপল-১।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.