শি এখন চীনের সর্বেসর্বা
শি এখন চীনের সর্বেসর্বা

ধরা-ছোঁয়ার বাইরে শি

মাও সে তুং ছিলেন মহা কাণ্ডারি। দেং জিয়াও পিং ছিলেন শীর্ষ নেতা। এখন দেখুন শি জিনপিংকে। তার ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক নীতির কারণে অনেকেই তাকে ডাকতে শুরু করেছেন সব কিছুর চেয়ারম্যান বা সর্বেসর্বা নামে।
চীনের পার্লামেন্ট গত রোববার প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদ সংক্রান্ত বিধান বিলুপ্ত করেছে, যার ফলে শি জিনপিংয়ের আজীবন ক্ষমতায় থাকার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। প্রায় তিন হাজার সদস্যের চীনা পার্লামেন্ট সংবিধানের একটি সংশোধনী অনুমোদন করেছে। যার ফলে চীনে শি জিনপিংয়ের প্রভাব আরও বহুগুণ বাড়তে চলেছে। যদিও সিদ্ধান্তটি দেশে-বিদেশে সমালোচনা কুড়িয়েছে।


কমিউনিস্ট পার্টির এই পদক্ষেপ চীনের ‘সমন্বিত নেতৃত্ব’ ও নিয়মতান্ত্রিক উত্তরাধিকার পদ্ধতির বিপরীত। চীনে কমিউনিস্ট শাসনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুংয়ের ‘এক ব্যক্তির শাসন’ যুগের পর বিশৃঙ্খলা এড়াতে এই পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা দেং জিয়াওপিং। ২০১২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর শি ক্রমেই দলে তার প্রভাব বৃদ্ধি করেছেন। তার আগের দুই প্রেসিডেন্ট ও পার্টি নেতা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে দুই মেয়াদের পর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেও শি’র ক্ষেত্রে উঠে যাচ্ছে এই নিয়ম। ফলে ৬৪ বছর বয়সী এই নেতা মূলত লাইসেন্স পেলেন আজীবন ক্ষমতায় থাকার।


স্বাভাবিক নিয়মে আগামী ২০২৩ সালে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা শি জিনপিংয়ের; কিন্তু সেই বাধ্যবাধকতা উঠে যাওয়ার কারণে নিজের ‘পুনরোজ্জীবিত চীন’ ভিশন বাস্তবায়নে তিনি সুযোগ পাচ্ছেন আজীবন ক্ষমতায় থাকার, যার হাতে থাকবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী। তার উত্থানের সাথে সাথে চীনে সুশীলসমাজ ও মুক্ত তথ্যপ্রবাহের ওপর সীমাবদ্ধতা আরও বেড়েছে। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের অনেককেই জেলে নেয়া হয়েছে এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপরেও আরওপ করা হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ। তবে একই সাথে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে চীনাদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অনেক গুণ বেড়েছে। ওই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে শাস্তি পেয়েছে এক মিলিয়নের বেশি কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মী, ভিন্নমতের নেতাও ছিলেন অনেকে।


চীনা রাজনৈতিক ভাষ্যকার উ কিয়াং বলেন, ‘আমার মনে হয় গত পাঁচ বছরে তিনি একটি নীরব অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে দলের পলিটব্যুরোকে নামকাওয়াস্তের কমিটি বানিয়ে ফেলা। তিনি চান না তার দুই পূর্বসূরি জিয়াং জেমিন ও হু জিনতাওয়ের মতো টেকনোক্র্যাটদের হাতে ক্ষমতা চলে না যায়। প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার মেয়াদের সীমা তুলে দেয়া ছাড়াও সংবিধানের ওই সংশোধনীতে ছিল শি’র ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শন অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাষ্ট্রীয় বিষয়ে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা বৃদ্ধি।


অনায়াসেই এমপিদের গোপন দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ভোট পেয়ে পাস হয়েছে সংশোধনীটি। তেমনটাই হওয়ার কথা ছিল কারণ গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে চীনা পার্লামেন্ট কখনওই কমিউনিস্ট পার্টির কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায়নি। এমপিদের কেউ এর বিরোধিতা করলে তার সুযোগ রয়েছে গোপন ব্যালটে বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার। বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ভাষ্যকার হুয়া পো বলেন, ‘যেসব নেতা মনে করেন দেং জিয়াওপিংয়ের সংস্কারই যথাযথ ছিল তারা নিশ্চয়ই এই সংশোধনীকে দেংয়ের পন্থা থেকে পিছু হয়ে যাওয়া বলে মনে করছেন। তারা এর বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে থাকতে পারেন অথবা ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন’।


জানা যায়, গত বছরের সেপ্টেম্বরে শি’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পার্টির পলিটব্যুরোর এক মিটিংয়ে এই পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলেও গত ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত তা গোপন রাখা হয়। নতুন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শি তার দল, রাষ্ট্র এমনকি চীনা নাগরিকদের চিন্তাভাবনার ওপরও প্রভাব আরও জোরদার করলেন বলে মনে করা হচ্ছে। মাও সে তুুং বলেছিলেন, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনীর চেয়ারম্যান হওয়ার বিষয়টিই চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতার উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক, প্রেসিডেন্ট, সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক-এগুলো শি জিনপিংয়ের অফিশিয়াল পদবি। মূলত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হওয়ার কারণেই অন্যগুলো পদ তিনি পেয়েছেন। এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন উপাধি ও পদবি জুড়ে আছে তার নামের সাথে। অনেকের কাছে তিনি ‘শি দাদা’ বা অভিভাবক নামে পরিচিত। এমনকি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও তার নামের সাথে এই বিশেষণটি ব্যবহার করেছে। ২০১৬ সাল থেকে দলের ‘মূল নেতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এর আগে মাও সে তুং, দেং জিয়াওপিং ও জিয়াং জেমিন পেয়েছিলেন এই খেতাব, যারা দলের অদ্বিতীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

গত অক্টোবারের কমিউনিস্ট পার্টির কংগ্রেসের পর থেকে সরকারি মিটিং ও রাষ্ট্রীয় মিডিয়ায় শি’কে লিংজিও (নেতা) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। মাও সে তুংয়ের আগে কেউ এই উপাধি পায়নি। এ ছাড়া গত রোববার শি’র চিন্তাভাবনাকে রাজনৈতিক দর্শনের স্বীকৃতি দিয়েছে চীনের পার্লামেন্ট। যা তাকে এনে দিয়েছে ‘থিঙ্কার ইন চিফ’ উপাধি। অনেকের কাছেই শি ‘জীবন্ত দেবতা’। কিংঘাই প্রদেশের পার্টি প্রধান ওয়াং গৌশেং বলেছেন, তার অঞ্চলের অনেকেই মনে করেন শি জিনপিং আরেক গৌতম বুদ্ধ হতে চলেছেন। সূত্র : এএফপি, এপি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.