অগ্রণী এক নারী আফরোজা

সাবিরা সুলতানা

‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’Ñ প্রচলিত এ প্রবাদবাক্যটি যে কতটা সত্য তার প্রমাণ আজকের অনেক নারী দিয়েছেন। ৬০-৭০ বছর আগেও আমাদের জীবন ছিল খুবই সাধারণ। বিশেষ করে নারীর জীবন সংসার আর সন্তান প্রতিপালনই ছিল প্রধান কাজ। সারা দিন পরিবারের সবার জন্য রান্না করা আর সবার সেবা করা ছিল মূল দায়িত্ব। সে রান্নাই আজ নারীর জন্য হয়ে উঠেছে উপার্জনের উপায়। শুধু অর্থ উপার্জন কেন, রান্না করে তারা বিভিন্ন পুরস্কার আর সম্মানও জিতে নিচ্ছেন। তেমনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা আফরোজা খানম মুক্তা। শুধু রান্না নয়, হস্তশিল্পেও রয়েছে তার অসাধারণ নৈপুণ্য। গড়ে তুলেছেন নিজের প্রতিষ্ঠান, শৌখিন কারুশিল্প। সেখানে তিনি নারীদের রান্না ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
শুরুটা সেই ১৯৯১ সালে; বাবার উৎসাহে তিনি নিজ হাতে তৈরি কাপড়ের ফুল উপহার দেন সুইডিশ রাষ্ট্রদূত ও তার স্ত্রীকে। তাদের ভূয়সী প্রশংসা মুক্তার মনে নিজের সৃজনশীলতাকে মেলে ধরার বীজ বপন করে দিয়েছিল। তখন থেকে হস্তশিল্পের দিকে তিনি ঝুঁকে পড়েন। ঘরেই তৈরি করতে থাকেন বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প। মূলত বিয়ের পর থেকেই তিনি পুরোদমে কাজ শুরু করেন স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায়; পাশাপাশি রান্নাও শিখতে শুরু করেন।
নিজের প্রতিষ্ঠানে তিনি মহিলাদের রান্না ও হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। একই সাথে তিনি ওয়ার্লপুলের রান্নার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি বাটারফাই-এলজির মাইক্রোওয়েভ রান্নার ট্রেনার হিসেবেও কাজ করছেন। তিনি যুব উন্নয়ন অধিদফতরেরও একজন প্রশিক্ষক। বিটিভির ‘শতরূপা’ রান্নার অনুষ্ঠানের নিয়মিত রন্ধনশিল্পী। ১৫০তম পর্ব চলছে তার। এ ছাড়াও এটিএন বাংলার স্টার লাইন, মাছরাঙা টিভির ‘ঙ পধষ’, বাংলাভিশন, চ্যানেল নাইন টিভিসহ বিভিন্ন চ্যানেলের রান্নার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এগুলো ছাড়াও নয়া দিগন্ত, যুগান্তরসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত তার রান্নার রেসিপি প্রকাশিত হয়।
একইভাবে তার হস্তশিল্পের সুনামও রয়েছে যথেষ্ট। দেশ টিভির দূরপাঠ অনুষ্ঠানে তার জাপানি টাইডাইসহ পুঁতির পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণের ওপর ১৮ দিনব্যাপী অনুষ্ঠান সম্প্রচার হয়। মাছরাঙা টিভির শৈলী অনুষ্ঠানেও ১৯ পর্ব তার হস্তশিল্পের ওপর প্রচারিত হয়। আফরোজা খানম হস্তশিল্প ও রান্নার ওপর নিয়েছেন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ। ভারত ও নেপাল থেকে তিনি হস্তশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কোরিয়ান টিমের কাছ থেকে ওয়ার্লপুলের পক্ষ থেকে মাইক্রোওয়েভ কুকিংয়ের ওপর নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ নিয়েছেন যুব উন্নয়ন অধিদফতর ও জাতীয় পর্যটন করপোরেশন থেকে।
আফরোজা খানম খুবই যতœ নিয়ে কাজ করে থাকেন। তাই তার হাতের কাজ বিভিন্ন মহলে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। বিভিন্ন মেলায় তার হাতে তৈরি পণ্য প্রধান অতিথিসহ দর্শনার্থীদের নজর কেড়ে নেয়। বহু মাধ্যমে তিনি কাজ করে থাকেন। ব্লক, বাটিক, টাইডাই, এমব্রয়ডারি থেকে শুরু করে পুঁতির বিভিন্ন পণ্য তৈরি, মোম তৈরি, পারফিউম তৈরি, কে, কাপড়, কাগজ, গ্লাসের কাজ অর্থাৎ তার কাজের পরিধি ব্যাপক। বিশেষ করে তার পুঁতির কাজ অসাধারণ। পুঁতি দিয়ে তিনি বিভিন্ন ফল ছাড়াও তৈরি করেন ব্যাগ, ড্রাগন, ফুলের ঝাড়, ফুলদানি, তাজমহলও তৈরি করেছেন। তার হাতে তৈরি পুঁতির চাবির রিং ইতালিতে রফতানি হয়ে থাকে। এ ছাড়াও অনেকে পুঁতির বিভিন্ন পণ্য অর্ডার দিয়েও করিয়ে নিয়ে যান। একইভাবে তার রান্নার প্রশংসাও করেছেন অভিজ্ঞ অনেক রন্ধনবিদ। তার তৈরি করা আচারও দেশের বাইরে যায় নিয়মিত। তার তৈরি আচার দেশের বাইরেও সুনাম কুড়িয়েছে।
তার প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন স্বীকৃতি ও সম্মাননা। হস্তশিল্পের জন্য ২০০৯ সালে পেয়েছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি স্বর্ণপদক।
২০১৬ সালে ৩২তম সার্ক চার্টার ডে অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইয়ার পালসেস প্রতিযোগিতায় ডালের ওপর করা ছয় বিভাগের মধ্যে দু’টি বিভাগে প্রথম পুরস্কার জিতে নেন। জিতেছেন বিজনেস গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার।
২০১১ সালে ফোকাস বাংলাদেশ ফেডারেশনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্প হিসেবে পেয়েছেন আজীবন সম্মাননা।
২০১৭ সালে জিতেছেন ট্যুরিজম ও ভয়েস পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ড। ২০১০ সালে কারু ও রান্নায় বিশেষ অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস গবেষণা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে পেয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সম্মাননা পদক।
রান্না ও হাতের কাজের মধ্য দিয়ে যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত করা যায়, তার প্রমাণ আফরোজা খানম। আফরোজা খানম জানান, তার আজকের অবস্থানের পেছনে প্রথম যিনি অবদান রেখেছেন তিনি হলেন তার বাবা। বিভিন্নভাবে বাবা তাকে উৎসাহ দিতেন। পরে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, পরিবারের সহযোগিতা ছাড়া মেয়েদের সাফল্য পাওয়া কঠিন। চেষ্টা মানুষকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারে বলেই আমি মনে করি।
আফরোজা এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। শুধু প্রশিক্ষণ দেয়ায়ই শেষ নয়, বরং তিনি শিক্ষার্থীরা কিভাবে এ প্রশিক্ষণ কাজে লাগাবে; কিভাবে আয় করার সুযোগ তৈরি করবেÑ সেসব বিষয়েও সার্বিক সহযোগিতা করে থাকেন। তার সহযোগিতায় অনেক নারী এখন রান্না ও হস্তশিল্পের মাধ্যমে নিজেদের আয়ের পথ খুঁজে নিয়েছেন। এখানেই শেষ নয়, নারীদের নিয়ে তার কিছু স্বপ্ন রয়েছে। আফরোজার স্বপ্ন এমন একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, যেখানে অনগ্রসর মেয়েরা বিনা অর্থে প্রশিক্ষণ নিতে পারবে। সেখানে দূর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য এরই মধ্যে তিনি কাজ শুরু করছেন। তিনি আশা করেন, সমাজের সব মেয়ে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সচেষ্ট হবে।
নারীদের প্রতি তার বক্তব্য হলোÑ পরিবারের কারোর পরিচয়ে নয়, নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। তবেই সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.