রুম নম্বর ১৩২

চারাগল্প
মুজাহিদুল ইসলাম

অনেক দিন থেকে প্রভোস্ট স্যারের কাছে একটি রুম বরাদ্দ চাচ্ছি। স্যার শুধু আশা দিয়ে যাচ্ছেন। রুম না পাওয়ায় আমাদের হল ডিবেটিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমরা কখনো গেস্ট রুমে বসি। কখনো টিভি রুমে। আবার কখনো রিডিং রুমে। এতে প্রায়ই সাধারণ ছাত্রদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
আমরাও নাছোড়বান্দা। যে করেই হোক এবার ডিবেটিং সোসাইটির জন্য স্বতন্ত্র একটা রুম নেবো। স্যার অপরাগতা প্রকাশ করলেন। আমরা প্রস্তাব দিলাম ১৩২ নম্বর রুমের জন্য। দক্ষিণ ব্লকের পশ্চিম দিকের শেষ রুম এটি। দীর্ঘ দিন থেকে পরিত্যক্ত। হলের অব্যবহৃত মালামাল এখানে রাখা আছে। স্যার প্রথমে ইতস্তত করলেন। ইতস্ততার কারণ আমাদের জানা ছিল।
কয়েক বছর আগের কথা। এ রুমে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন সৌরভ। সৌরভ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র। সৌরভের ঝুলন্ত লাশ দেখে তার রুমমেটরা ভয় পেয়ে যান। তার পর থেকে এই রুমে কেউ থাকতে পারেননি। প্রথম দিকে রাতে তো দূরে থাক, দিনেও কেউ এ রুমের আশপাশ দিয়ে আসা-যাওয়া করতেন না।
অগত্যা স্যার রাজি হলেন। ১৩২ নম্বর রুমটি ডিবেটিং সোসাইটির জন্য বরাদ্দ হলো। হলের নতুন বিতার্কিকদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলো। সবাই মিলে রুমটি পরিপাটি করে সাজিয়ে নিলাম। পরে শুরু হলো বিতর্কের নানা আয়োজন। বিতর্কের আমেজে ‘ডর-ভয়’ বেমালুম ভুলে গেছেন সবাই।
আমরা একটা কর্মশালার আয়োজন করলাম। সেখানে নতুন-পুরনো অনেক ছাত্র অংশ নিয়েছিল। প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন জাতীয় বিতার্কিকরা। আমি আলোচনা করেছিলাম সংসদীয় বিতর্কের নিয়ম পদ্ধতি নিয়ে। এ ধরনের বিতর্কে একটা মজার ব্যাপার হলো পয়েন্ট উত্থাপন।
সাপ্তাহিক সেশনগুলোতে বাড়তে থাকে ছাত্রদের ভিড়। পাঠচক্রগুলো এখন আগের চেয়ে আরো প্রাণবন্ত হয়। আর সংসদীয় ধারার বিতর্ক হলে রুমে জায়গা সঙ্কুলান হয় না।
সে দিন ছিল সংসদীয় বিতর্ক। সন্ধ্যা থেকেই সাজ সাজ ভাব। সংসদ শুরু হবে রাত ৯টায়। ধীরে ধীরে ১৩২ নম্বর রুমটি পরিপূর্ণ হয়ে যায় বিতর্কপ্রেমী দর্শক-শ্রোতায়। সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাব ছিলÑ ‘এই সংসদ মনে করে, মেধার অবমূল্যায়নই মেধাবীদের আত্মহননের মূল কারণ’।
স্পিকারের অনুমতিসাপেক্ষে শুরু হয় বিতর্ক। স্পিকার বা মডারেটর হিসেবে মামুন স্যারের বেশ সুখ্যাতি রয়েছে। স্যার একজন দৃঢ়চেতা মানুষ। তার মধ্যে রয়েছে যৌক্তিক বোধের অনন্য সমাবেশ। আজকের বিতর্কে তিনিই স্পিকার। প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রথমেই প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চের সংজ্ঞায়ন তুলে ধরেন। ‘মেধার অবমূল্যায়ন’ বলতে তিনি ‘কোটা পদ্ধতি’র মাধ্যমে মেধার অবমূল্যায়নকে বোঝান। আর ‘মেধাবীদের আত্মহনন’ মাধ্যমে আত্মহত্যা ও অসংখ্য সম্ভাবনা অঙ্কুরে বিনাশ হওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেন।
সরকারি দলের বক্তারা বলেন, ৬৫ শতাংশ কোটার ভারে কোণঠাসা সরকারি চাকরির বাজার। সে বাজারে সবচেয়ে সস্তা ‘মেধা’। মুহুর্মুহু করতালিতে দর্শকের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া সহজেই অনুমেয়।
এবার বিরোধী দলের পালা। বিরোধীদলীয় নেতা এ প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে দাবি করলেন। তিনি বলেন, ‘কোটা পদ্ধতি’র মাধ্যমে মেধার অবমূল্যায়ন হয়নি। বরং মেধাবীদের পৃথক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ বহাল থাকছে। অন্য দিকে দেশের অনগ্রসর শ্রেণী এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পরিবারের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা পূরণ হচ্ছে।
বিতর্ক তখন জমে উঠেছিল। দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। গঠনমূলক পর্ব শেষ। এবার যুক্তিখণ্ডন। এ পর্বে এসে বিরোধীদলীয় নেতা বললেন, ‘কোটা পদ্ধতির ফলে অবমূল্যায়িত হয়ে কেউ আত্মহত্যা করেছেÑ এমন কোনো নজির নেই।’
ঠিক তখনই কেউ একজন বলে উঠলেন, ‘মাননীয় স্পিকার! পয়েন্ট অব অর্ডার’। ভারী কণ্ঠটি কয়েকবার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। উপস্থিত সবাই একে অপরের দিকে তাকালেন। সরকারি দলের কেউ পয়েন্ট তোলেননি। মামুন স্যার বিস্মিত হলেন। তাহলে পয়েন্ট অব অর্ডার তুলছে কে?
হঠাৎ বিকট হাসির শব্দ। অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে কেউ। সেই হাসিতে স্পষ্ট তাচ্ছিল্য। হাসির রেশ না যেতেই আবার ভেসে এলো সেই কণ্ঠÑ ‘আমি, আমি বলেছি’। এবার সবার দৃষ্টি উপরের দিকে যায়।
ভয়ে হতবিহ্বল হয়ে গেছেন সবাই। মামুন স্যারের কপাল থেকে ঘাম ঝরছে। রুমের ঠিক মাঝখানে ফ্যানের সাথে ঝুলছে সৌরভের লাশ! মুখের এক কোণা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে তার। যেন তরতাজা লাশ।
‘আমি সৌরভ। চিনতে পেরেছেন স্যার?’ কথা শুনে স্যারের ঠোঁটজোড়া একতারার সুতার মতো কাঁপছে। কোনো কথা বেরোচ্ছে না।
‘আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল যার, যে ছেলেটি শৈশবের প্রথম বেলায় হারিয়েছিল বাপ, আমি সেই সৌরভ। প্যারালাইজড হয়ে বাড়িতে পড়ে থাকা মাকে কথা দিয়েছিলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে বড় চাকরি নিয়ে তবে ঘরে ফিরব। তার উন্নত চিকিৎসা করাবো। সব দুঃখ ঘুচিয়ে দেবো।
মা বিশ্বাস করেছিলেন। ভেবেছিলেন সত্যিই তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। তিনি জানেন তার ছেলে অনেক মেধাবী। কিন্তু তিনি জানতেন না, চাকরির বাজারে কোটাওয়ালাদের ভিড়ে তার ছেলের মেধা কতটা মূল্যহীন। মায়ের স্বপ্ন আর সত্য হয়নি স্যার। বাঁচাতে পারিনি মাকে। তাই আমারও আর বেঁচে থাকা হয়নি।
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.