তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শীর্ষ পদে নারী

সুমনা শারমিন

বাংলাদেশের কর্মেেত্র উচ্চপদে দায়িত্বপালনকারী নারীর সংখ্যা হাতেগোনা। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এ সংখ্যা আরো কম। তবে এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের না, পাশ্চাত্যের অনেক দেশেই কর্মেেত্র নারীদের অংশগ্রহণ অনেক কম। প্রযুক্তিভিত্তিক দুনিয়ার প্রসারের সাথে বাংলাদেশের নারীরা এখন নতুন বিভিন্ন পেশায় যোগ দিচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অসাধারণ ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি কেউ নিজের কোম্পানি গড়েছেন, কেউ বা প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
লিখেছেন সুমনা শারমিন
সোনিয়া বাশির কবির
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মাইক্রোসফট
বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও লাওসের
মাইক্রোসফট বাংলাদেশের পর আরো তিন দেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন সোনিয়া বশির কবির। প্রতিশ্রুতিময় সোনিয়া এই চারটি দেশে মাইক্রোসফটের ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের ল্যপূরণসংক্রান্ত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের মূল ল্য হলো লোকবল, তথ্য ও পদ্ধতিকে একত্রের মাধ্যমে গ্রাহকদের জন্য মান উন্নয়ন ও ডিজিটাল জগতে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা। ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনের যাত্রা নিয়ে তিনি বেশ উচ্ছ্বসিত। প্রতিটি মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ইন্টেলিজেন্ট কাউড ও ইন্টেলিজেন্ট নতুন প্রান্তের সুযোগ গ্রহণ করতে পারে সে ল্য নিয়ে কাজ করছেন। মাইক্রোসফটে কাজের পাশাপাশি সোনিয়া জাতিসঙ্ঘের আওতাভুক্ত টেকনোলজি ব্যাংক ফর ডেভেলপড কান্ট্রিজের (এলডিসিএস) গভর্নিং কাউন্সিল মেম্বার হিসেবে কাজ করছেন। জাতিসঙ্ঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলি সপ্তাহে সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলসংক্রান্ত (এসডিজি) সেরা ১০ পথিকৃতের একজন হিসেবে ইউএন গ্লোবাল কমপ্যাক্ট সোনিয়া বশির কবিরকে স্বীকৃতি দান করেছে। এ ছাড়াও তিনি ২০১৬ সালে মাইক্রোসফট ফাউন্ডারস অ্যাওয়ার্ড পান। মাইক্রোসফটে কমর্রত এক লাখ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ১০ জনকে এ সম্মাননা দেয়া হয়।
মাইক্রোসফটে যোগ দেয়ার আগে তিনি সিনটেক নামে একটি তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়াও তিনি ডেল বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার, মাইক্রোসফটের দণি-পূর্ব এশিয়ার ব্যবসায় উন্নয়ন কার্যক্রমের পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। সোনিয়া আমরা টেকনোলজিসের চিফ অপারেটিং অফিসার হিসেবেও কাজ করেছেন। সোনিয়ার বর্ণিল ক্যারিয়ারে শুরুটা সিলিকন ভ্যালি থেকে। ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি সিলিকন ভ্যালিতে সান মাইক্রোসিস্টেমস, ওরাকলের মতো কোম্পানিগুলোয় কাজ করেছেন। তিনি প্রায় ২০ বছর দণি ক্যালিফোর্নিয়ায় ছিলেন।
লুনা সামসুদ্দোহা
প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, দোহাটেক নিউ মিডিয়া
লুনা শামসুদ্দোহা বাংলাদেশ উইমেন ইন আইটির (বিডব্লিউআইটি) সভাপতি। দেশের খ্যাতনামা সফটওয়্যার কোম্পানি দোহাটেক নিউ মিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। ১৯৯২ সালে যখন এ দেশে পুরুষরাই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা করত না, সেসময় তিনি এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কোম্পানিটি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সফটওয়্যার সল্যুশন, ডিজাইন, ডেভেলপমেন্ট সেবা প্রদান করছে।
সম্প্রতি তিনি জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হয়েছেন। সুপরিচিত এই তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্রযুক্তিতে বিশেষ অবদান রাখায় আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন। প্রযুক্তি খাতে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং নারীর মতায়ন বৃদ্ধির কারণে গ্লোবাল উইমেন ইনভেন্টরস অ্যান্ড ইনোভেটরস নেটওয়ার্ক (গুইন) সম্মাননা রয়েছে তার। লুনা বাংলাদেশ বিজনেস ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা, সুইজারল্যান্ডের গ্লোবাল থট লিডার অন ইনকুসিভ গ্রোথের সদস্য। ২০০৫ সালে তিনি সুইস ইন্টারঅ্যাকটিভ মিডিয়া সফটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (সিসমা) পান।
নারীদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি কর্মেেত্রর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে লুনা শামসুদ্দোহা বলেন, আমাদের মেয়েরা কম্পিউটার সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং খুব কম পড়ে। এটাকে অনেকেই ছেলেদের লেখাপড়াও ভাবে। তারপরে মেয়েরা যাও পড়ে, তাতে ছেলেদের তুলনায় ক্যারিয়ারে যায় না। অনেকেই মেয়েদের রাতের বেলায় আসা যাওয়া, কাজ করাকে স্বাভাবিকভাবে নেয় না। সবকিছু মিলিয়ে এখনো সামাজিক বাধাটাই সবচেয়ে বড় বাধা। এগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। মেয়েদের বুদ্ধি নেই, জ্ঞান নেই এমন ভাবাটা বোকামি। বরং এসব সামাজিক বাধার ফলেই তাদের কাজে নিয়ে আসা চ্যালেঞ্জের।
আইভি হক রাসেল
মায়া আপার প্রতিষ্ঠাতা
২০১১ সালে সেপ্টেম্বরে শুরু করার পর মায়া হয়ে উঠেছে বর্তমানে দেশের সহায়তাপ্রত্যাশী নারীদের মিলনমেলা। এখানে বিভিন্ন বয়সী নারীরা সমমনা নারীদের কাছ থেকে উপদেশ, সহায়তা পেয়ে থাকেন। খুব সাধারণ এক চিন্তা থেকে মায়ার জন্ম। কিন্তু সেই মায়াই এখন দেশের হাজারো নারীর ভরসার জায়গা। এ উদ্যোগ আরেক অসামান্য নারীর। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের যেসব নারীর বিশেষ কোনো পরামর্শের প্রয়োজন হয়, তারা পরম আস্থা রাখতে পারেন ভার্চুয়াল এ মায়া আপার ওপর, যেটি মূলত একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন। আর এ অ্যাপ্লিকেশনের নকশা ও উন্নয়ন থেকে শুরু করে পরিচালনা পর্যন্ত সর্বত্রই নারী প্রকৌশলী, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের শ্রম যুক্ত। এ পুরো ব্যাপারটিকে যিনি একটি গাঠনিক রূপ দিয়েছেন, তিনিও একজন নারী। তার নাম আইভি হক রাসেল। চট্টগ্রামে জন্মের পর আইভি ঢাকায় স্কলাস্টিকায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা শেষ করার পর যুক্তরাজ্যে উচ্চশিার জন্য চলে যান এবং সেখানে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তুলেন। এরপর তিনি মায়া নামে এই পোর্টালটি গড়ে তুলেন।
মায়া আপার শুরু সম্পর্কে আইভি বলেন, আমার প্রথম সন্তানের জন্মের সময় হঠাৎ করেই মায়ার ধারণা মাথায় আসে। আমার প্রথম সন্তানের জন্মের পরই ব্লগে বাংলাদেশের নারীদের নানা বিষয়বস্তু সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের মধ্য দিয়েই আসলে মায়ার প্রাথমিক পথ চলার শুরু। তখনই আমি আবিষ্কার করি দেশের নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-জ্ঞানের বিরাট এক শূন্যতা বিরাজ করছে এবং এই তথ্য তারা কিভাবে পাবেন, জানা নেই। তখন ল্য স্থির করলাম উঁচু মানসম্পন্ন, আমাদের নারীদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, বিশেষ করে মায়েদের উপযোগী নানাবিধ বিষয়বস্তুর জোগান নিশ্চিত করতে হবে। মায়া আপা ব্যবহার করার মানে হলো, কোনো লাইন নেই, কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্টের প্রয়োজন নেই, কোনো বিচারিক অভিমত নেই। কোনো ঝুঁকি নেই। চাইলে নামধামও গোপন থাকবে, একজন নারী যেকোনো প্রশ্ন নির্দ্বিধায় করবে।
মালিহা এম কাদির
প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সহজ ডট কম
‘ইয়াং গ্লোবাল লিডার’-এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের মালিহা এম কাদির মরগ্যান স্ট্যানলি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেছিল। কম্পিউটার সায়েন্স পড়া শেষ করে আমেরিকায় উন্নত জীবন গড়তে পারতেন। কিন্তু দেশটা যে উন্নয়নশীল! দেশেই কিছু করতে চাইলেন মালিহা এম কাদির। শুরু করলেন সহজডটকম। মালিহা জানান, ২০১২ সালের দিকে আমি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে চলে আসার পরিকল্পনা করি। তখন এখানে ইন্টারনেটসেবা সহজ হয়ে গেছে। অনেক ব্যবহারকারী দিন দিন বাড়ছে। কাসিফায়েড সাইটগুলো জনপ্রিয় হচ্ছে। তাই চাকরি ছেড়ে দিয়ে সিঙ্গাপুরে বসেই টিম বানালাম। সহজ আমার প্রথম উদ্যোগ। অনেক কিছু করা যায় অনলাইনে, কিন্তু ম্যাস মার্কেটে কাজ করতে চাইলাম যেন অনেক লোক সুবিধা পেতে পারে।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে চলে আসি। ১৪ জানুয়ারি থেকেই কাজ শুরু। বর্তমানে সহজ ডট কম হলো দেশের প্রথম ও সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অনলাইন টিকিট কাটার ওয়েবসাইট হিসেবে সবার কাছেই পরিচিতি পেয়েছে। ২০১৪ সালে চালু হওয়া এই প্লাটফর্মটি ফেনক্স ও সিঙ্গাপুরের সেনজেল ভেঞ্চার থেকে ভেঞ্চার ফান্ড নিয়ে কাজ শুরু করে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.