কালের সাক্ষী অচিন বৃক্ষ

শওকত আলী রতন

মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার হরিরামপুর-ঝিটকা সড়কের লাউতা নামক স্থানে রাস্তায় পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা অচিন বৃক্ষটি এখন কালের সাক্ষী। ২০০ বছরের পুরনো গাছটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা। অন্য যেকোনো গাছের সাথে কোনো ধরনের মিল না থাকায় মানিকগঞ্জসহ সারা দেশে মানুষের কাছে বৃক্ষটি অচিন গাছ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। গাছটির নামকরণের ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে মতভেদ থাকলেও এ নামেই এখন প্রসিদ্ধ। গাছটির জন্য দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে মানিকগঞ্জের জনপদ। প্রাচীনতম এ গাছটি একনজর দেখার জন্য কৌতূহল নিয়ে উৎসুক দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে।
জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুরের বাজুরা ইউনিয়নের লাউতা গ্রামের এখলাছ উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি তৎকালীন ভারতের কোচার অঞ্চল থেকে একটি গাছ এনে জমিতে রোপণ করেছিলেন। গাছটি ধীরে ধীরে বড় হয়ে ডালপালা ছড়িয়ে আজ বিশালাকার ধারণ করেছে। ভিনদেশী গাছ হওয়ায় এবং দেশীয় প্রজাতির কোনো গাছের সাথে মিল না থাকায় স্থানীয়রা গাছটির নাম দেন অচিন বৃক্ষ। পরে এ নামেই পরিচিতি লাভ করে।
তবে গাছটির নামের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন লাউতা গ্রামের নরেশ চন্দ্র শীল। তিনি জানান, এ গাছটি তেলীকদম নামে আমরা জানি; তবে এর নামটি সঠিক কি না তাও আমাদের জানা নেই।
একই ধরনের কথা বলেন আইয়ুব আলী নামে এক কৃষক। লাউতা গ্রামের ধিরাজ খান নামের ৮০ বছর বয়সের এক ব্যক্তি জানান, ছোটবেলা থেকে এ গাছটি এমনই দেখছেন তিনি। এমনকি তার বাবা তোফাউদ্দিন বেপারির কাছে এ গাছের বয়স সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছেন।

এ গ্রামের আরেক মুরুব্বি বললেন, গাছটির নাম নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গাছটি কেউ চেনেন না, তাই এর সহজ নাম হয়েছে অচিন গাছ।
দূর থেকে দেখলে মনে হয় এর উচ্চতার দিকে যেমন আকাশ ছুঁয়েছে, তেমনি এর সুনাম মানিকগঞ্জ জেলাকে করেছে সমৃদ্ধ। গাছটির পাতা অনেকটা তুলসীপাতার মতো। এ গাছে ফুল হয় এবং ফুল থেকে ছোট একধরনের বীজ হয়।
বীজ পড়ে গাছটির চার পাশে আরো কয়েকটি গাছের চারা হয়েছে। স্থানীয়রা আরো জানান, বাংলাদেশের কোনো অঞ্চলে এ গাছের মতো কোনো গাছ তাদের নজরে পড়েনি। গাছের অত্যধিক বয়স হওয়ায় উপরি ভাগে ডালপালা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তবে গাছের নিচের অংশে এখনো রয়েছে সতেজ ও ডালপালায় ভরপুর।
গাছটিকে ঘিরে কৌতূহলেরও শেষ নেই। মানিকগঞ্জের বাজুরা ইউনিয়নের লাউতা ও আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামে অনেক হিন্দু পরিবারের বাস। এ এলাকার হিন্দুরা নিয়মিত উপাসনা করেন গাছতলায়। সকাল-সন্ধ্যা এখানে আগরবাতি ও মোমবাতি জ্বালিয়ে উপাসনা করতে দেখা যায়। অন্যান্য ধর্মের লোকও প্রার্থনা করে থাকেন। আবার কেউ কেউ গাছের সামনে এসে মানত করেন, পরে এসে মানত পুরো করে। এ জন্য গাছের গোড়ায় বিভিন্ন ধরনের খাবারের মধ্যে দুধ, কলা, বাতাসা, মিষ্টি ও ফল-ফুল দেখা যায়। তা ছাড়া এ গাছকে ঘিরে এর আশপাশে গড়ে উঠেছে মাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের খেলনার দোকান। খেলনার মধ্যে হাতি, ঘোড়া, গরু ও পুতুল চোখে পড়ে।
এ এলাকার মানুষের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে এ গাছের ডালপালা বা পাতা ছিঁড়লে তার অমঙ্গল হয়। তাই সঙ্গতকারণেই কেউ এ গাছের পাতা বা অন্য কোনো অংশ ছেঁড়ে না কিংবা গাছের ডালপালা ছিঁড়তে সাহস করে না। গাছটিকে কেন্দ্র করে লোকজন মেলা বসানোর চেষ্টা করলেও সচেতন ও দায়িত্বশীলদের জন্য তা সম্ভব হয়নি বলে জানা যায়। ছোট-বড় সবার মধ্যে গাছ নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য। গাছটির প্রকৃত নাম জানার আগ্রহ না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী গাছটির দেখার জন্য সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। তাই নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ে মানিকগঞ্জ জেলার এই অচিন বৃক্ষের ছায়াতলে।

 

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.