বসন্তের এই দিনে গল্প

তারেকুর রহমান

শীত শেষে বসন্ত এসেছে। প্রকৃতিতে তার পরিবর্তন দেখা দিলো। সোমা জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এ সৌন্দর্য তাকে একটুও গ্রাস করেনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজকের এত সুন্দর দিনে তার প্রিয় মানুষটা কাছে নেই। ভালোবেসেই রাতুলকে বিয়ে করে সোমা। কিন্তু দিনে দিনে রাতুলের ভালোবাসা কমে যাচ্ছে মনে হয়। স্ত্রীর প্রতি আগের মতো মনোযোগ নেই।
বসন্তের এই দিনে হলুদ শাড়ি পরে রাতুলের সাথে ঘোরার কত ইচ্ছা ছিল সোমার। রাতুল টুকটুকে লাল একটা পাঞ্জাবি পরবে। এরপর দু’জন হাত ধরে হারিয়ে যাবে। এসব ভাবতে ভাবতে সোমার চোখে জল চলে এলো। মোবাইলটা হাতে নিয়ে রাতুলকে কল দেয় সোমা।
-হ্যালো, তুমি কি অফিসে?
-হুম,আর কোথায় থাকব?
-কখন ফিরবে?
-প্রতিদিন যখন ফিরি!
-আজ একটু আগে আসো না।
-কেন?
-বসন্তের এই দিনে বাসায় ভালো লাগছে না। চলো না আজ একটু বের হই।
সোমার কথা শেষ হওয়ার আগেই রাতুল কলটি কেটে দেয়। জানালার পাশে একটা কাঠের চেয়ারের ওপর চুলগুলো এলিয়ে দিয়ে বসে আছে সোমা। বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখছে। একটুও ভালো লাগছে না তার। জীবনের হিসাব কিছুতেই মিলাতে পারছে না সে। একটা মানুষ কী করে এত সহজে বদলে গেছে? বিয়ের আগের সময়গুলো চোখে ভাসতে লাগল তার।
মাত্রই ভার্সিটিতে ভর্তি হয় সোমা। প্রথম কাসেই পরিচয় হয় রাতুলের সাথে। রাতুল খুব মেধাবী ছাত্র। কোনো আড্ডাবাজিতে সে নেই। একটু লাজুক প্রকৃতির রাতুলকে কিছু দিনের মধ্যেই ভালো লেগে যায় সোমার। রাতুলও সোমাকে ভালোবাসে কিন্তু দু’জন দু’জনকে বলতে পারছিল না। অবশেষে সোমা সাহস করে রাতুলকে ভালোবাসার কথা বলে।
-রাতুল শোনো, তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
-কী?
-আসলে, আসলে...
-আসলে কী?
-আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
এ কথা শুনে রাতুল লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কিছু না বলে বাসায় চলে যায়। দুই দিন কাসেই আসেনি। এরপর এক দিন একটা মেসেজ পাঠায় রাতুল।
-সোমা, আমিও তোমাকে ভালোবাসি।
এরপর এভাবেই চলতে লাগল। পরিবারের মতেই দু’জন বিয়ে করে। সোমা রাতুলকে পেয়ে মনে হলো পৃথিবীর সব সুখ সে পেয়েছে। রাতুল স্ত্রীর প্রতি খুব টেককেয়ার করে। সোমার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে এই মানুষটা এত বদলে গেল কেন?

৩. কলিং বেলের আওয়াজ শুনে সোমা দরজা খুলতে এগিয়ে এলো। এই সময় তো কেউ আসার কথা নয়। তাহলে কে এলো? চিন্তায় পড়ে গেল সোমা।
-কে?
-আমি?
রাতুলের কণ্ঠের মতো মনে হলো।
-রাতুল?
-হুম, দরজা খোলো।
দরজা খুলেই সোমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। রাতুলের হাতে একটা প্যাকেট আর কিছু ফুল।
-এগুলো কী?
-আগে শোনো, আমি আসলে তোমার কাছে সরি। আমার দেরি হয়ে গেছে।
-থাক, সরি বলতে হবে না। আমাকে তো এখন আগের মতো ভালোবাসো না।
-কী যে বলো! আমি আসলে তোমার জন্য শাড়ি কিনতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে।
সোমা রাতুলের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। অথচ একটু আগে তাকে নিয়ে কত কিছু ভেবেছিল সে। এই মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে।
সোমার হাতে শাড়ির প্যাকেট দিয়ে রাতুল বলল,
-এই শাড়িটা তুমি পরো। এরপর দু’জন আজ ঘুরতে বের হবো।
-তোমার অফিস করবে কে?
-আজ ছুটি নিয়েছি শুধু আমার প্রিয়তমা বউটার সাথে ঘোরার জন্য।

সোমা হলুদ শাড়িটা পরে নিলো। খোঁপায় খুব সুন্দর করে রাতুলের ফুলগুলো দিয়ে দিলো। রাতুল একটা লাল পাঞ্জাবি পরল। সোমার দিকে রাতুল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এত সুন্দর মায়াবী মানুষটা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। কিছুতেই চোখ ফেরাতে ইচ্ছা হচ্ছে না। আজ সোমাকে এত ভালো লাগছে কেন রাতুল বুঝে উঠতে পারছে না।
-কী দেখছ?
-তোমাকে দেখছি।
-আজ মনে হয় নতুন দেখছ?
-হুম, নতুন করেই দেখছি। তোমাকে যত দেখি ততই নতুন মনে হয়।
-উহ! ঢং... আমাকে একা রেখে চলে যায়। সারা দিন আর কোনো খবর থাকে না।
একটু রাগের সুরে কথাগুলো বলল সোমা।
রাতুল বুঝতে পারে তার ভুলগুলো।
-আজ থেকে এ ভুল আর হবে না। ঠিক আছে ম্যাডাম?
-আচ্ছা আচ্ছা হয়েছে।
সোমা রাতুলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। রাতুলও হাসতে থাকে। সোমা ভাবতে থাকে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক। এতে ভালোবাসার কোনো কমতি নেই।
একটা রিকশা নিয়ে সোমা আর রাতুল বের হলো। আজকের দিনটা সত্যিকারের বসন্ত মনে হলো দু’জনের কাছে। পরিবেশটাও খুব সুন্দর লাগছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.