হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প
হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প

হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

ইন্টারমেডিয়েট পড়ার সময় বিএম কলেজে একজন মজার শিক্ষক পেয়েছিলাম। ভদ্রলোক পরে সিভিল সার্ভিসে চলে যান। গরমের ছুটির আগের দিন ক্লাস নিচ্ছিলেন তিনি। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ছুটির বিষয়টি চলে আসে। বাড়িতে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক পড়াশোনা করবে, নাকি আম কাঁঠাল খেয়ে বেড়াবে সেটা নিয়ে কথা হচ্ছিল। স্যার মজা করে বললেন, বাড়িতে কেউ পড়াশোনা করবে না, মজা করে ঘুরে বেড়াবে। যখন পরীক্ষা দেবে তখন ‘হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প’ দেবে। গ্রামের স্কুলে হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্পের কথা শুনেছি। এর কোনো জনপ্রিয় বাংলা শব্দ শুনিনি। তবে ‘দম ধাপ লাফ’- এ রকম একটি বাংলা বোধ হয় করা যায়। সেটা যে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায় সেটা বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল। স্যার ব্যাখ্যা করলেন। এই খেলার কৌশল হলোÑ লাফ দেয়ার সময় খেলোয়াড় খানিকটা পিছিয়ে যায়। সেখান থেকে মাঝখানে একটা নির্দিষ্ট স্থানে পা স্পর্শ করে পূর্ণ উদ্যমে দৌড় দেয়। তার মানে উদ্যম ফিরে পাওয়ার জন্য পিছু হটা। সে রকম তোমরাও কিছু দিন পড়াশোনা না করে হয়তো পিছিয়ে পড়বে। পরে ক্যাম্পাসে ফিরে পূর্ণ উদ্যম ও শক্তিতে লেখাপড়া করে এগিয়ে যাবে। 

খেলাধুলার ক্ষেত্রে হাইজাম্প, লংজাম্প এমনকি পোল জাম্প পর্যন্ত সহজ বিষয়; কিন্তু হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প অনেকটা কৌশলনির্ভর। অনেকেই এই খেলাটায় সতর্ক না হলে আনফিট হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির হালচাল দেখে এই খেলার কথা মনে পড়ল। রাজনীতিতো আসলে একটি বড় খেলা। অনেকে একে দাবা খেলার সাথে তুলনা করেন। মজার বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানেও একটি তত্ত্ব আছে- গেম থিওরি বা ক্রীড়া তত্ত্ব। খেলায় যেমন নিয়মকানুন আছে রাজনীতিতেও তেমন আইনকানুন আছে। সৎ খেলোয়াড় এবং সৎ টিমের লোকেরা খেলার নিয়মকানুন মেনে জেতার জন্য চেষ্টা করে। আর অসৎ খেলোয়াড় বা অসৎ টিম ‘ছলে বলে কলে কৌশলে’ জিততে চায়। এ জন্যই পৃথিবীতে খেলা কেলেঙ্কারিও কম নয়। ঘুষ দিয়ে খেলোয়াড়কে নিষ্ক্রিয় করা, রেফারিকে ঘুষ দিয়ে বশ করা, এমনকি শক্তি প্রয়োগের মতো নিকৃষ্ট উদাহরণও বিরল নয়। দেশে এবং বিদেশে খেলা নিয়ে অন্যায় ও অপকর্মের অনেক উদাহরণ রয়েছে। আমাদের সময়ে গ্রাম দেশে হাডুডু খেলা হতো। প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য অসৎ পক্ষ খেলার জায়গায় কাঁচ ভাঙা এমনকি শেভের ব্লেড পুঁতে রাখত। এখন বাংলাদেশের রাজনীতির খেলায় যে রণকৌলশ অবলম্বন করা হচ্ছে তা ওই ধরনের খেলার চেয়ে ভিন্নতর কিছু নয়।

খেলা যেমন শুধু খেলা নয়, খেলা একটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক উৎকর্ষতার বিষয়; রাজনীতিও তেমনি মানবিক ও আদর্শিক বিষয়। রাজনৈতিক দলগুলো এবং নেতা-নেত্রীরা এই খেলার নিয়ামক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ব্যাকরণ অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকারভেদ আছে। একদল লোক রাজনীতিকে গদি দখলের প্রতিযোগিতা বলে মনে করে। ক্ষমতার জন্য তারা পারে না এমন হেন কাজ নেই। অসৎ খেলার টিমের মতো গদি দখলের জন্য যা বলতে হয়, যা করতে হয় এবং খুন, জখম, হামলা এবং মামলা যা করতে হয়- সবই তাদের জন্য জায়েজ। এজন্য যদি নিজের দেশকে বেচে দিতে হয় তাতেও তাদের আপত্তি নেই। ২০০৬ সালের প্রস্তাবিত নির্বাচনের আগে পাশ্চাত্যে বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র প্রমাণ করার জন্য তাদের প্রচারণা, প্রকাশনা এবং কূটকৌশলে কোনো কিছুই বাধেনি। ৬৪টি জেলায় বোমা ফাটানোর কৃত্রিম প্রজেক্ট নিতে তাদের কোনো দ্বিধা হয়নি। সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় আরোহণের কূটকৌশল হিসেবে ২৮ অক্টোবরের নির্মম তাণ্ডব ঘটাতে তাদের বিবেক বাধা দেয়নি। অবশেষে তাদের যোগসাজশে ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার দূরবর্তী পরিকল্পনা নিতে তারা সফল হয়েছে। অথচ তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে। সামরিক বাহিনীর রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থানের কথা ঘোষণা করে। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য এরা এমন সব কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করে যা স্ববিরোধী, প্রতারণাযুক্ত এবং অভিসন্ধিমূলক। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল থেকে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস পর্যন্ত সে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত। অপর দিকে আরেক দল রাজনীতিবিদ আছেন যারা মানবিক ও আদর্শিক গুণাবলিকে ধারণ করেন। সময় ও সুযোগের প্রেক্ষিতে রঙ বদলান না।

যা হোক, রাজনৈতিক অপশক্তি নতুন করে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে বিভ্রান্ত করার জন্য এবং গণতন্ত্রের সংগ্রাম ব্যাহত করার জন্য বিভিন্ন রকম ফন্দিফিকির আঁটছে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জনতার ঢল আশা করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের পর। তীব্রতর আন্দোলন তার ভাষায় ‘জ্বালাও পোড়াও এবং হরতালে’ আতঙ্কিত ছিলেন। হয়তোবা বুদ্ধি এঁটেছিলেন যে, বিরোধী দলের কঠোর কর্মসূচিকে কাজে লাগিয়ে বিএনপির বিরুদ্ধে জনমত গঠন করবেন। সেই সাথে নেতাকর্মীদের ব্যাপকভাবে জেলে পুরবার সুযোগ পাবেন; কিন্তু বিএনপি প্রণীত এবং অনুসৃত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন। এখন পুলিশ, র‌্যাব এবং দলীয় পেটোয়া বাহিনী ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অশান্ত করার প্রয়াস নিচ্ছেন। বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতারের আগে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেয়ার পক্ষে সুদৃঢ় অবস্থান নেন। সেজন্য মানববন্ধন, অনশন এবং অবস্থান ধর্মঘটের মতো নমনীয় কর্মসূচি নেয়া হয়। বিএনপি কালো পতাকা মিছিলের পরিবর্তে কালো পতাকা প্রদর্শনের কর্মসূচি নেয়। সারা দিনের অনশনের কর্মসূচি কমিয়ে তিন ঘণ্টায় নিয়ে আসা হয়। গত বৃহস্পতিবার মাত্র এক ঘণ্টার অবস্থান ধর্মঘট দেয়া হয়।

দৃশ্যত, এগুলো পিছু হটার উদাহরণ হলেও কৌশলগতভাবে সঠিক; কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার যে, নিজস্ব কার্যালয়ের সামনে একান্ত নিজস্ব আঙিনায় অনুষ্ঠিত কালো পতাকা প্রদর্শনের মতো নিরীহ কর্মসূচিও তারা হতে দেয়নি। প্রেস ক্লাবের মর্যাদাকে অগ্রাহ্য করে সেখান থেকে বেআইনিভাবে বিএনপির এক নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সেদিন স্বল্প সময়ের কর্মসূচিও তারা সহ্য করেনি। অপরাধী খোঁজার স্টাইলে দলীয় কর্মী সমর্থক সেজে সাদা পোশাকের পুলিশ বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। এটি সংবিধান, মৌলিক মানবাধিকার এবং সর্বশেষ উচ্চ আদালত কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনার নির্লজ্জ লঙ্ঘন। এসব অত্যাচারের প্রতিবাদে বিএনপি নেতাকর্মীরা সহসাই হতাশা, ক্ষোভ ও ক্রোধ প্রকাশ করছেন। তারা সর্বাত্মক সংগ্রামী কর্মসূচি দাবি করছেন। এমনকি কোনো কোনো সংক্ষুব্ধ কর্মী নেতাদের আপসকামী ভাবছেন। আসলে তা নয়।

রাজনৈতিক দল তার সময় শক্তি এবং নীতি আদর্শ দ্বারা রণকৌশল নির্ধারণ করে। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক দল হিসেবে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে। সন্দেহ নেই যে, এখন জাতীয়তাবাদী শক্তি এর সময়কালে সবচেয়ে সঙ্কটময় এবং সংবেদশীল সময় অতিক্রম করছে। এ সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে নেতাদের কুশলী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন হতে হবে। অতীতে সরকারি ষড়যন্ত্রে বিএনপির কর্মসূচিকে সহিংস এবং সন্ত্রাসী প্রমাণ করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নিজেদেরও ভুলত্রুটি ছিল অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান সময়েও সমস্যাকে সামনে রেখে এমনভাবে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে যাতে তারা বদনাম দেয়ার সুযোগ না পায়। তার অর্থ এই নয় যে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে জেলে রেখে নেতাকর্মীরা ছোটখাটো লোক দেখানো আন্দোলন করবে। বরং সমগ্র দেশের জনশক্তিকে সংহত করে সংযমের সাথে পথ অতিক্রম করতে হবে- যাতে জাতীয়তাবাদী শক্তি অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। কথায় বলে, ‘স্লো বাট স্টেডি উইন্স দ্য রেস’ অর্থাৎ ধীর অথচ অনবরত নীতি কৌশলই লক্ষ্যে পৌঁছায়।

সরকার ইতোমধ্যে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। এখন তারা পরিকল্পনা নিয়েছে- ১. বিএনপির সব প্রার্থীকে ভয়ভীতি লোভ লালসা এবং কৌশলের মাধ্যমে অকার্যকর করে তোলা। ২. গ্রাম থেকে মহল্লা পর্যন্ত বিএনপির সব সচল নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা অথবা আত্মগোপনে বা এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা। ইতোমধ্যে গ্রামে গ্রামে তালিকা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। ৩. নির্বাচন কেন্দ্র দখলের জন্য অন্য নামে তারা কমিটি গঠনের চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে দলীয় ক্যাডারদের সঙ্ঘটিত করা হচ্ছে। ৪. ওসি ডিসিদের দলীয় পরিচয় নিশ্চিত করে নির্বাচন প্রভাবিত করা। ৫. নির্বাচনের বছরে আইনি ও বেআইনি অর্থের ছড়াছড়ি। ৬. রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে বিভেদ-কোন্দল উসকে দেয়া। ৭. বিএনপির আদলে বিএনএফের মতো বোগাস সংগঠন তৈরি করা। ৮. ধানের শীষের বিপরীতে গমের শীষ ব্যবহার করে ভোট নষ্ট করা। ৯. নির্বাচনে জয়ের জন্য বিচার বিভাগ এবং আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা। ১০. গণমাধ্যমকে সরকার পক্ষে প্রচারণায় বাধ্য করা।

সবাই বিএনপিকে নীরব ভোটের দল বলে মনে করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল হিসাব নিকাশ ও পরিসংখ্যন দিয়ে দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নীরবে নিভৃতে ধানের শীষে ভোট দেয়। এ দলে কর্মীসংখ্যা কম সমর্থক অনেক। আর তাদের সব কর্মীই নেতা। নির্বাচনে জিততে হলে ওই নীরব জনগোষ্ঠীকে সরব করতে হবে। নির্বাচনের বাকি ১০ মাস। যথাসময়ে এই বিপুল জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হলে সযত্নে সময়-শ্রম, মন-মগজ ও অর্থ-বিত্তকে লালন করতে হবে। সঞ্চয় করতে হবে শক্তি-সাহস, ধৈর্য-শৌর্য এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব। এখন থেকেই পরিকল্পনা মাফিক ভোটকেন্দ্রনির্ভর কৌশল ও কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে। এ লক্ষ্যে জাতীয় নেতারা বিএনপিকে কঠিন ও কঠোরভাবে পরিচালনা করছেন। ‘হপ স্টেপ অ্যান্ড জাম্প’ খেলার কৌশল অনুযায়ী শক্তি সঞ্চয়ের জন্য যেমন খেলোয়াড় পিছু হটে এবং প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চয় করে বিজয়ের লাফ দেয়, ঠিক তেমনি জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্বাচনে নিশ্চিত বিজয়ের জন্য দৃশ্যত পিছু হটেও সামগ্রিক বিজয়ের জন্য বড় ধরনের জাম্প বা লাফ দিতে হবে। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য আমাদের সব আবেগকে সময়ের ক্ষণে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। কারাগার থেকে সর্বশেষ আহ্বানে তিনি কারো উসকানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সুতরাং অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য আস্থা বিশ্বাসের সাথে নেত্রীর নির্দেশ অনুসরণ করাই সময়ের দাবি।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.