হাসান আলীম স্বতন্ত্র এক কবি

নোমান সাদিক

‘আমার রক্তের মধ্যে নুহের প্লাবন বুনোঝড়
ধীরে ধীরে পলি জমে জেগে ওঠে সেমেটিক চর’
(আমরা দ্রাবিড় : দ্রাবিড় বাংলায়)
প্রত্যেক কবিই তার হৃদয়ে স্বদেশকে রাখেন। তার সীমানা যত ক্ষুদ্রই হোক, হৃদয়ে তা সর্বাধিক বিস্তৃত ভূমি। কিন্তু এই যে স্বদেশ, এর বাইরেও আরেকটা জগত থাকে। বিষয়টা ঠিক বাইরে নয়। অর্থাৎ তার স্বদেশের ঠিক পাশে সে তার পছন্দসই আরেকটি রাজ্য স্থাপন করে উভয়ের কাঁটাতার উঠিয়ে দেন। একটি স্বদেশ তো আছেই, অন্যটি কল্পনার রাজ্য। একজন কবিকে অবশ্যই ঐতিহ্য-সচেতন হতে হয়। যখনই তিনি কোনো আদর্শ বা দর্শনের দিকে ইঙ্গিত করবেন, তখন ঐতিহ্য-চেতনা তার নির্দেশিত বিষয়টিকে ব্যাপকতা দান করে।
হ্যাঁ। কবি হাসান আলীমের স্বদেশের কথা আমরা জানি
‘নুহের উত্তরজাত আমরা বাংলাদেশী শ্রেষ্ঠবীর’
তিনি এই বাংলার এই বাংলাদেশের বাংলা ভাষার কবি। এখন প্রশ্ন, এই বাংলার সাথে কবির সম্পর্ক কতদূর? কতদিনের? কেবলই কি এই বাংলায় জন্মেছেন আর ভাষা তার বাংলা বলে? একজন মানুষ তার দেশের তার ভূখণ্ডের অধিকার ও সম্পর্কের কথা ততটা জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, যতটা ইতিহাস তিনি জানেন। হাসান আলীম ততটাই ঐতিহ্য-সচেতন কবি, যতটা তিনি আধুনিক। প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই তিনি বর্তমানের সাথে ইতিহাসকে রেখেছেন, যেভাবে বালক তার মায়ের অস্তিত্ব অনুভব করে থাকে। প্রশ্ন হলো, হাসান আলীমের ইতিহাস-চেতনা, বোধ আর পূর্বোক্তদের থেকে স্বতন্ত্র কতটুকু? ফররুখ আহমাদের উপর প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে গবেষক শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেনÑ ‘একজন সত্যিকার কবির তিনটি গুণ থাকা আবশ্যক বলে আমি মনে করি। তার কাব্যে সুস্পষ্ট জীবনদর্শন থাকতে হবে। তার কাব্যে স্বাতন্ত্র ও মৌলিকত্ব থাকতে হবে। বক্তব্যের তীব্রতা থাকতে হবে।’ এখানে আমরা জীবন দর্শন ও বক্তব্যের তীব্রতা নিয়ে অনেক সময় কথা বলতে পারি। কবির কাব্যভাষা যে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, এ বিষয়ে বোদ্ধাগণই মতামত দিয়েছেন।
এ দেশ কখনো স্বাধীন কখনো সুবা। কিন্তু সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তায় ব্যাঘাত ঘটেনি। সিরাজের পতন ও তার এক শ’ বছর পর দিল্লির পতনের মাধমে সেই সূর্য স্তিমিত হয়। তাহলে এই যে প্রায় সাড়ে ছয়শত বছরের গৌরবময় ইতিহাস, আমাদের কবিতা বা গদ্যে তা তেমনভাবে উঠে আসেনি। হতাশাগ্রস্ত জাতীকে জাগাতে একমাত্র নজরুল আঘাত করেছেন। পরবর্তীদেরই দ্বায়িত্ব পড়ে যায়, বাদবাকি বিষয়কে সাহিত্যে নিয়ে আসার। কিন্তু আমরা দেখি, এ ব্যাপারে আমাদের সাহিত্যিকগণ বিশেষ উদাসীনতা, উদারতা প্রদর্শন করেছেন। হাসান আলীম এই উদাসীনতার স্রোতে নিজেকে না ভাসিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতে হেঁটে চলেছেন। আমাদের হারানো গৌরবের কথা জানান দিয়েছেন তিনি। কিন্তু আমাদের ইতিহাসের গণ্ডি এখানেই শেষ নয়। মুসলিমদের আগে এ দেশে আর্যদের রাজত্ব ছিল। তারো আগে পালরা। তার আগে দ্রাবিড় (সেমেটিক শাখা) ও হ্যামেটিকরা এ দেশের অধিবাসী ছিল।
তারা ছিল নুহ আ:-এর বংশধর। একেশ্বরবাদী। কালক্রমে তারা বহুশ্বরবাদ ও প্রকৃতি পূজায় লিপ্ত হয়। তবুও এই যে মানবজাতির প্রারম্ভের দিক থেকে আমাদের যে সম্পর্ক, তাকেই কবি টেনে এনেছেন। এভাবে প্রত্যেকটা পরম্পরাকে তিনি নিয়ে এসেছেন, অথচ আরোপিত নয় প্রাসঙ্গিক করে। এখানেই তিনি স্বতন্ত্র।
কথার আড়ম্বর প্রদর্শন না করে কিছু পঙ্ক্তিই উপস্থাপন করা যেতে পারে।
‘লক্ষ লক্ষ বছরের পূর্ব থেকে কে ছিল এখানে
এই বরেন্দ্র টিলার লালমাটি মৃত্তিকার পর?’
পরম বিশ্বাসে প্রেমে আবিরের পলিমেখে প্রাণে
ব্যাথাজমে হিমযুগ পাললিক অন্তর প্রদেশে
মেলেনি উত্তর কোনো, বীরশ্রেষ্ট সামের পুত্ররা
ব্যাবিলন থেকে আরো দূর দেশে ভালোবেসে শেষে
ঘর বাঁধে বীর বেশে গঙ্গাতীরে দিব্যস্বয়ম্বরা
(ভিষ্মের করাত : দ্রাবিড় বাংলায়।)
সে নাবিক রাসূলের মাতৃকুল আবু ওয়াক্কাস
পদস্পর্শে ধন্য যার দেশমাটি নীলাভ্র আকাশ
(সুদুর ক্যান্টন থেকে)
একজন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ মালাবার
সমুদ্র সৈকতে বীর বিক্রম অনিকে অনিবার
একটি বোনের অশ্রু মোছাবার পবিত্র প্রত্যয়ে
এখন আর আসে না কেউ হায়, নারীরা নীরবে
অশ্রুপাত করে শুধু
(একজন হাজ্জাজ বিন ইউসুফ)
রেখে যাচ্ছে স্মৃতিচিহ্ন নক্ষত্র বন্দরে অকৃপণ
সিকান্দার শা’র ঘোড়া ছুটিতেছে অকৃপণ
(সিকান্দার শা’র ঘোড়া)
এইখানে শুয়ে আছে সিরাজের খুনঝরা লাশ
(সিরাজের মুখ)
আজন্ম স্বাধীনচেতা হে বীর মুজিব তুমি শেষে
দিলে হাঁটার নির্দেশ।
(বজ্রকণ্ঠ)
তোমাকে কেবলই মনে পড়ে জিয়াউর রহমান।
(তোমার উত্থান)
এখানে আমরা দেখি সর্বপ্রকার সঙ্কীর্ণতার পাশ কাটিয়ে বাংলার ইতিহাসকে কবি এনেছেন তার কবিতায়, পরম্পরায়। শব্দে ও ইতিহাস সচেতনতায় কবি হাসান আলীম স্বতন্ত্র এক কবি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.