নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না শিগগিরই

বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
আশরাফুল ইসলাম

আমানত রেখে তা ফেরত পাচ্ছে না নতুন প্রজন্মের ব্যাংক ফারমার্স থেকে। নতুন প্রজন্মের অন্য ব্যাংকগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। বর্তমানে অনেকটা আস্থার সঙ্কট দেখা দিয়েছে গ্রাহকের মধ্যে। বেশি মুনাফার প্রলোভন দিয়েও আমানত প্রত্যাহার ঠেকাতে পারছে না নতুন ব্যাংকগুলো। শুধু সাধারণ গ্রাহকই নন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও নতুন এ ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও নতুন ব্যাংক থেকে তহবিল প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। আর নতুন আমানত বলা চলে আসছেই না। ফলে নতুন প্রজন্মের ৯টি ব্যাংকের সাথে বেকায়দায় পড়েছে অন্য ব্যাংকগুলো। এরই মধ্যে নগদ টাকার সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারি ব্যাংক বাদে বেশির ভাগ ব্যাংকই কলমানি মার্কেট থেকে ধার করে চলছে। এমনি পরিস্থিতিতে আরো ব্যাংকের লাইসেন্স দিয়ে ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকির মাত্রা বাড়াতে চাচ্ছে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর এ কারণেই শিগগিরই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে না রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রস্তাবিত আরো তিনটি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রস্তাবিত তিনটি নতুন ব্যাংকের নাম হলো বাংলা ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক ও সিটিজেন ব্যাংক লিমিটেড। এর মধ্যে বাংলা ব্যাংকের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ও বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো: জসিম উদ্দিন। পিপলস ব্যাংকের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এম এ কাশেম। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। অন্য দিকে সিটিজেন ব্যাংকের উদ্যোক্তা হচ্ছেন সরকার সমর্থক জনৈক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইকবাল। এর আগে গত বছরের শেষে দিকে বাংলা ও পিপলস ব্যাংক লাইসেন্স দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এখন সিটিজেন ব্যাংকের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালে নতুন ৯ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মতামত চাওয়া হয়েছিল। দেশের অর্থনীতির বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স না দেয়ার পক্ষে মতামত দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার পক্ষে অর্থমন্ত্রীর মতামতের ভিত্তিতে তখন ৯ ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। তখন অনেক উদ্যোক্তাই ব্যাংক পাওয়ার জন্য নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেনি। এর মধ্যে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মহিউদ্দীন খান আলমগীর লাইসেন্স পাওয়ার আগেই ফারমার্স ব্যাংকের অফিস খুলে কার্যক্রম চালিয়েছিলেন। আরেকটি ব্যাংক লাইসেন্স নিয়ে আমানত নিলেও প্রথম এক মাস বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাধ্যতামূলক নগদ অর্থ সংরক্ষণ বা সিআরআর সংরক্ষণ করেনি। প্রভাব খাটিয়ে অনেকেই অধিক হারে ব্যাংকের শাখা খোলার লাইসেন্স নিয়েছিলেন। যেমন, ১০ বছর বয়সী একটি ব্যাংকের যেখানে শাখা রয়েছে ৬০টি, সেখানে নতুন এ ৯ ব্যাংকের কোনো কোনোটির শাখা খুলেছে ৬০টির ওপরে। জালজালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ বিতরণ, নানা অনিয়ম জড়িয়ে পড়েছে কোনো কোনো ব্যাংক। এভাবেই আগ্রাসী ব্যাংকিং করে ব্যাংকগুলো। লাইসেন্স পাওয়ার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ডুবতে বসেছে ফারমার্স ব্যাংক। গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। আটকে পড়েছে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু তহবিলের ৫০৩ কোটি টাকা।
নতুন অন্য ব্যাংকগুলোর তিন-চারটির অবস্থাও নাজুক। ব্যাংকগুলো নগদ টাকার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর। সরকারি ব্যাংকগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত পাচ্ছে। ফলে তাদের তহবিল সঙ্কট নেই। তবে, বেশির ভাগ বেসরকারি ব্যাংকেরই তহবিল সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ সঙ্কট মেটাতে বেশির ভাগই কলমানি মার্কেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এমনি পরিস্থিতিতে সরকার আবারো নতুন তিনটি ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারের শীর্ষ মহলের সম্মতির পাওয়ার পর গত বছর মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলা ও পিপলস ব্যাংকের অনুমোদনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। সিটিজেন ব্যাংক লিমিটেড নামে অন্য একটি ব্যাংকের সম্মতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে চিঠি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। সেখান থেকে সম্মতি পাওয়া গেলে সিটিজেন ব্যাংককে অনুমোদন দেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সুপারিশ করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান ব্যাংকিং খাতের সার্বিক পরিস্থিতি উত্তরণে বাংলাদেশ ব্যাংক হিমশিম খাছে। খেলাপি ঋণ কোনো কোনো ব্যাংকের গলা পর্যন্ত ওঠে গেছে। কাক্সিত হারে নগদ আদায় হচ্ছে না। স্যালাইন দিয়ে কোনো কোনো ব্যাংকের টিকে রাখা হচ্ছে। কিছু কিছু ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে এক বছরের প্রভিশন তিন বছরে দেয়ার অনুমোদিত দিচ্ছে। যদিও প্রভিশন ঘাটতি রেখেই ঘোষিত মুনাফার ভিত্তিতে ডিভিডেন্ট দিয়ে অর্থ বের করে নিচ্ছে। খেলাপি ঋণ নবায়নে নানা ছাড় দেয়া হচ্ছে। এমনি পরিস্থিতি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ে যাবে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সে কারণে শিগগিরই দেয়া হবে না নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স তবে।
তবে অভিযোগ উঠেছে প্রস্তাবিত নতুন ব্যাংকের মধ্যে একটি সাইন বোর্ড টাঙ্গিয়ে অফিস খুলেছে। এটি হলো ‘পিপলস ব্যাংক লিমিটেড’। রাজধানীর বনানীতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় দেখে যে কারোরই মনে হবে, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ তফসিলি ব্যাংক! ব্যাংকটির সাইনবোর্ডে ‘প্রস্তাবিত’ শব্দটিও ব্যবহার করা হয়নি।
জানা গেছে, বনানী ডিওএইচএসের ২ নম্বর সড়কের ২৩/এ মোবারক প্লাজার পঞ্চম তলা ভাড়া নিয়ে অফিস খুলেছে পিপলস ব্যাংক। প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের ফ্যাটের গেটে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ভেতরে রয়েছে অভ্যর্থনা কেন্দ্র, সেখানেও বড় সাইনবোর্ড ঝুলছে। ভেতরে চেয়ারম্যানসহ অন্য কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক ক। এম এ কাশেম ওই অফিসে নিয়মিত আসেন বলে জানান ভবনটির প্রহরীরা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.