আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিআইআইটির কনফারেন্সে বক্তৃতা করছেন শাহ্ আবদুল হান্নান : নয়া দিগন্ত
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিআইআইটির কনফারেন্সে বক্তৃতা করছেন শাহ্ আবদুল হান্নান : নয়া দিগন্ত
বিআইআইটির নারী দিবস উদযাপন

ইসলামে নারী-পুরুষে কোনো মৌলিক ভেদাভেদ নেই : শাহ আব্দুল হান্নান

নিজস্ব প্রতিবেদক

সাবেক সচিব, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ শাহ আব্দুল হান্নান বলেছেন, ইসলামে নারী-পুরুষে কোনো মৌলিক ভেদাভেদ নেই। কিছু ক্ষেত্রে নারী পুরুষের চেয়ে এগিয়ে যেমন মাতৃত্ব। আবার কিছু ক্ষেত্রে পুরুষ নারীদের চেয়ে এগিয়ে যেমন সংসারের পুরো অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব।
গতকাল আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যটের (বিআইআইটি) উদ্যোগে রাজধানীর উত্তরাস্থ সংস্থার মিলনায়তনে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনে নারী ও ইসলাম’ শীর্ষক কনফারেন্সে সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় আরো আলোচনা করেন বিআইআইটির নির্বাহী পরিচালক ড. এম আব্দুল আজিজ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটির ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল কবির, বিশিষ্ট সমাজকর্মী এবং হাঙ্গার প্রকল্পের স্বেচ্ছাসেবী তাজিমা হোসেন মজুমদার প্রমুখ। ওমেন ইন ডেভেলপমেন্ট : ইসলামিক পারসপেকটিভ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন অন লাইনভিত্তিক থিংকট্যাঙ্ক উইটনেস’র সভাপতি ড. নাসিমা হাসান।
শাহ আব্দুল হান্নান বলেন, অনেক মুসলিম দেশেই নারীরা বহুবিধ বৈষম্য এবং সামাজিক প্রবঞ্চনার শিকার। যদিও ইদানীং ক্রমে ক্রমে এ অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। নারীর প্রশ্নগুলো সমাজের সামনে চলে আসছে। এটা বলা যায়, আগামী শতাব্দীতে ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রগতি যে কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে তার মধ্যে একটি হবে মানবাধিকার, বিশেষ করে নারীর অধিকার ইসলাম কতটা নিশ্চিত করতে পারবে তার ওপর। তিনি বলেন, পাশ্চাত্যে নারীর অবস্থা খারাপ, সেখানে পরিবার প্রথা ভেঙে যাওয়ায় নারীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশ্চাত্যে দেহব্যবসা ও মাদক নিষিদ্ধ না হওয়ায়, নারীরা পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় নারীরাই মূলত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু ইসলামে এসবকে অবৈধ বলায় নারীরা এ থেকে কোনো প্রকার ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে না। তিনি আল-কুরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, পুরুষরা হলো নারীর নিরাপত্তারক্ষক। আর একজন নিরাপত্তাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিরাপত্তাদাতার চেয়ে বেশি মর্যাদাবান বলেই তার নিরাপত্তা দরকার। তিনি ইসলামে নারী-পুরুষের সাম্যের উল্লেখ করে বিদায় হজের ভাষণ থেকে বলেন, সাদার ওপর কালোর, আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সার্বিক বিবেচনায়, নারী-পুরুষের কোনো পার্থক্য নেই। তবে যেসব কাজে গর্ভাশয়ের ক্ষতি হয় তা নারীদের না করাই ভালো।
ড. এম আব্দুল আজিজ বলেন, মূলত মজুরি বৈষম্য দূর করা, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মেেত্র বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের সুতা কারখানায় আন্দোলনরত একদল শ্রমজীবী নারীর ওপর মালিকপরে দমন-নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং পরবর্তী নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮ সালে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ও রাজনীতিবিদ কারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম নারী সম্মেলন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে জাতিসঙ্ঘ ৮ মার্চ এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সেই থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও এ দিনটি নারীর সংগ্রামের এ ইতিহাসের স্মরণে বিশ্ব নারী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের ৫ নম্বর লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখ করে ড. আজিজ বলেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। তাই উন্নয়নের স্বার্থে নারীদের পিছিয়ে রাখা যাবে না, তাদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, সুষম উন্নয়নের স্বার্থে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের গতিধারাকে বেগবান করতে হলে জাতীয় উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
ড. নাসিমা তার প্রবন্ধে উন্নয়নের সূচক যথা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপদ মাতৃত্ব, লিঙ্গ সমতাসহ প্রতিটিতে নারীর ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, পরিবার, সমাজ তথা দেশের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য নারী এবং পুরুষ উভয়ের ভূমিকাই অনস্বীকার্য এবং সমাজের সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির জন্য তাদের উভয়কেই কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তিনি আল-কুরআনের সূরা তওবার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নারী এবং পুরুষ একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক; তারা পরস্পর নিজেদেরকে সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করবে এবং অন্যায়-অপরাধ থেকে নিজেদের বিরত রাখবে। তাই তিনি পরিবার ও সামাজে নারীরা যেন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন, তাদের প্রাপ্য অধিকার যেন তারা অর্জন করতে পারেন, নারীরা যেন সব ধরনের শোষণ-বঞ্চনা থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে পারেন সে জন্য পুরুষদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। ড. নাসিমা হাসান তার প্রবন্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে ন্যায়, সমতা ও ভ্রাতৃত্বভিত্তিক সমাজ গঠনে নারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তাহলেই শুধু নারীদের ক্ষমতায়নে এবং লিঙ্গ সমতা অর্জনে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান বলেন, ইসলামই শুধু নারীদের অগ্রাধিকার দিয়েছে, কন্যা-জায়া ও জননী হিসেবে দিয়েছে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা। তিনি রাসূল সা:কে উদ্ধৃত করে বলেন, মায়ের মর্যাদা বাবার চেয়ে তিন গুণ বেশি। শালীনতা বজায় রেখে শরিয়াহ সম্মত যেকোনো কাজ পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে নারীদের কোনো বাধা ইসলামে নেই।
ড. আনোয়ারুল কবির বলেন, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে ইসলামে দেনমোহর বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তিনি সম্পদে নারীর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নারী-পুরুষ সবাইকে এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা রাখতে বলেন। তিনি বলেন, মানুষ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহর ইবাদত করা। এ ইবাদত পালনে নারী-পুরুষে কোনো পার্থক্য কুরআনে আল্লাহ তায়ালা করেননি।
তাজিমা হোসেন মজুমদার বলেন, অশিক্ষা নারী উন্নয়নে প্রধান অন্তরায়। নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। তবে পুরুষদের বাদ দিয়ে নারী একা চলতে পারবে না, এটা কাম্যও নয়। তিনি নারীদের সংগঠিত হওয়ার ওপর জোড় দিয়ে তাদের কাজকর্ম যেন টেকসই হয়, সবার কাজে লাগে সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.