মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস

টাকা পাঠানোর চেয়েও বেশি কিছু

যোগাযোগের বাহন হিসেবে যাত্রা শুরু মোবাইল ফোনের। সময়ের সাথে সাথে মুঠোয় বন্দী এই ছোট্ট যন্ত্রটির প্রভাব ও প্রসার বেড়েছে ব্যাপক হারে। তাই মোবাইলের ব্যবহার আর এখন কোনোভাবেই কেবল যোগাযোগযন্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। ঘড়ির বিকল্প হিসেবে সময় দেখা থেকে শুরু করে অতিগুরুত্বপূর্ণ ফিন্যান্সিয়াল লেনদেন সব কিছুুই এখন হচ্ছে মোবাইলের মাধ্যমে। বাংলাদেশেই মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) ছয় কোটি গ্রাহক এ মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১০০০ কোটি টাকা লেনদেন করে। ২০১১ সালে যাত্রা শুরু করে অল্প সময়ের ব্যবধানে সমাজের সব স্তরের এই বিপুল গ্রাহককে এমএফএস-এ আগ্রহী করেছে এর সময়, কাল ও নিরাপত্তাগত সুবিধাগুলো।
তবে বাংলাদেশে এমএফএস-এর যে প্রসার তা মূলত টাকা পাঠানো বা ক্যাশ ট্রান্সফার-ভিত্তিক। খুচরা বাজারের কেনাকাটা, বেতন দেয়া, বিল দেয়ার মতো খাতগুলোতে এমএফএস-এর ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে জানুয়ারি ২০১৮তে এমএফএস-এ ক্যাশ ইন ট্রানজেকশনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা, ক্যাশ আউট ট্রানজেকশনের পরিমাণ ছিল সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির টাকা পাঠানোর পরিমাণ ছিল সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। অথচ মার্চেন্ট পেমেন্ট বা কেনাকাটার লেনদেনের পরিমাণ মাত্র ১৪৪ কোটি টাকার মতো।
আন্তর্জাতিক সংস্থা বেটার দ্যান ক্যাশ অ্যালায়েন্সের বিল্ডিং ডিজিটাল বাংলাদেশ : দি ওয়ে ফরওয়ার্ড ফর ডিজিটাইজিং পেমেন্ট শীর্ষক সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে বাংলাদেশে সারা বছরে যত লেনদেন হয় তার অর্ধেকই হয় খুচরা পণ্যের বাজারে। আর এ খাতে ডিজিটাল পেমেন্ট হয় মাত্র ৩ শতাংশ।
এই ৩ শতাংশ ডিজিটাল পেমেন্টের মধ্যে কার্ডে পেমেন্ট এবং মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের পেমেন্ট উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে এমএফএস-এর মাধ্যমে পেমেন্ট সম্প্রসারিত হওয়ার আরো সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
দেশের সবচেয়ে বড় এমএফএস-এর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ-এর তথ্যানুসারে, প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৫০ হাজার মার্চেন্ট পেমেন্ট গ্রাহক রয়েছে। এ তালিকায় আছে মুদি দোকান, সুপারশপ, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, বুটিক চেইন শপ-সহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
বাজার ঘুরে এমএফএস গ্রাহক ও মার্চেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে এমএফএস-এর জন্য ব্যবহৃত ইউএসএসডি পদ্ধতি সময়সাপেক্ষ ও কিছুটা জটিল হওয়ায় অনেকেই সুযোগ থাকলেও নগদ অর্থেই কেনাকাটা করেন। পদ্ধতিগত জটিলতা খুচরা বাজারে এমএফএস-এর যথাযথ সম্প্রসারণের অন্তরায় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেবল খুচরা পণ্যের দোকানগুলোই নয় এমএফএস পেমেন্ট জনপ্রিয় হওয়ার আর একটি বড় খাত হতে পারে অনলাইন কেনাকাটার জগৎ। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে বছরে অনলাইনে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয় ও প্রতিদিনের অর্ডার ডেলিভারির পরিমাণ প্রায় বিশ হাজার। অনলাইন-ভিত্তিক উদ্যোক্তারা বলছেন এমএফএস পেমেন্ট কিউআর কোড অর্থাৎ অ্যাপ-ভিত্তিক হলে অনেকেই সহজে অনলাইন কেনাকাটার পেমেন্টে এমএফএস বেছে নেবে।
কিউআর কোডের ব্যবহার কেবল অনলাইন নয় সব ধরনের কেনাকাটাকেই সহজ করবে। এখনো সুপারশপগুলো বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এমএফএস-এর পেমেন্ট কাউন্টার-নির্ভর। বার কোডের ব্যবহারও রয়েছে। তবে কিউআর কোড বহুল প্রচলিত হলে তখন গ্রাহক নিজেই মোবাইলে কিউআর কোড স্ক্যান করে সরাসরি মোবাইল থেকে নিজেই পেমেন্ট করতে পারবেন। ফলে জটিলতা কমবে ও অল্প সময়ে লেনদেন সম্পন্ন হবে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ও এশিয়ার অন্যতম দেশ চীনে ইতোমধ্যে এমএফএস পেমেন্টের ব্যবহার বহু গুণ বেড়েছে। চীন প্রায় ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’তে পরিণত হয়েছে। কিউআর কোডে পেমেন্টের ব্যবহার চীনের সর্বত্র। ফলে খুচরা বা ভাঙতির জটিলতা একেবারেই নেই এই দেশটিতে। অনেকেই আবার প্রিয় রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়ার আগেই কিউআর কোডের মাধ্যমে পেমেন্ট করে অর্ডার দিয়ে রাখেন। ফলে খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। ভারতেও কিউআর কোড পেমেন্টের সম্প্রসার উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে এমএফএসের যে জনপ্রিয়তা তাতে পদ্ধতিগত এই জটিলতা দূর করে বাংলা ভাষায় অ্যাপ-ভিত্তিক এমএফএস পেমেন্ট চালু করলে টাকা ট্রান্সফারের মতো অন্য খাতগুলোতেও এমএফএস সেবা আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমাবে এবং সর্বোপরি সময়, শ্রম আর অর্থ সাশ্রয় করে ‘ক্যাশলেস সোসাইটির’ পূর্ণ বাস্তবায়নের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখবে। তখন মানুষ মানিব্যাগ বা কার্ড নিয়ে না ঘুরে কেবল মোবাইল ওয়ালেটই ব্যবহার করবে। বিজ্ঞপ্তি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.