পাখিমেলায় পোষা পাখি হাতে এক ব্যক্তি  : নয়া দিগন্ত
পাখিমেলায় পোষা পাখি হাতে এক ব্যক্তি : নয়া দিগন্ত
প্রেস কাব মুখরিত বিদেশী পাখি প্রদর্শনীতে

ম্যাকাউর চিৎকার আর লরিকিট রোজেলার কিচিরমিচির

সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

আমার একটা বাজরিগা ছিল। ছোট থেকে পোষ মানাই ওকে। জন্ম হয়েছে আমাদের বাসায়। টানা তিন বছর ও আমার কাছেই ছিল। ঘাড়ে বসে থাকত। ডাইনিং বা পড়ার টেবিলে হাঁটাহাঁটি করত। মনু নামেই ডাকতাম তাকে। গতবার তাকে প্রদর্শনীতে নিয়ে আসা হলে সবার দৃষ্টি কাড়ে। কারণ ও তার নাম সুন্দরভাবে উচ্চারণ করতে পারত। অনেক জোড়েই বলত মনু। সাধারণত বাজরিগারা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে না। কিন্তু মনু ছিল ব্যতিক্রম।
দুর্ভাগ্য এবার তাকে আনা গেল না। আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। মাত্র কয়েক দিন আগে তার খাঁচার মধ্যে কি জানি বিকট শব্দ করে অছড়ে পড়ল। আর ওমনি খাঁচার দরজাটা খুলে গেলে সে উড়ে যায়। এমনিতে সে খুব একটা উড়ার চেষ্টা করত না। কিন্তু সে দিন হয়তো ভয় পেয়েই উড়ে যায়। অনেক দিন মনুর দুঃখে ঘুমাতে পারিনি। বালিশে মাথা গুঁজে কেঁদেছি। আকাশে আকাশে তাকিয়ে বেড়িয়েছি, বারান্দায় কিচিরমিচির আওয়াজ পেলে ছুটে যেতাম। ভাবতাম মনু বুঝি এই এলো।
কথাগুলো সালমান আহমেদের। সে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। পুরান ঢাকার আহমেদ বাওয়ানী স্কুলের ছাত্র সে। গতকাল বিদেশী পাখি প্রদর্শনীতে সে তার একঝাক পোষা পাখি নিয়ে এসেছে। । এভিকালচার সোসাইটি অব বাংলাদেশের উদ্যোগে নবম বিদেশী পোষা পাখি প্রদর্শনী-২০১৮ গতকাল জাতীয় প্রেস কাব মিলনায়তনে শুরু হয়েছে। এবারের সেøাগান দেয়া হয়েছে ‘খাঁচায় পুষুন খাঁচার পাখি-বনের পাখি থাকুক বনে’।
এগুলো দেখভাল করার এক ফাঁকে পোষাপাখি নিয়ে নানান সুখ-দুঃখের কথা বলতে গিয়ে এসব কথা বলল সালমান আহমেদ। সে আরো জানাল পাখিগুলো থাকার কারণে তার মন একেবারে খারাপ থাকে না। কারো প্রতি রাগও হয় না। সালমান জানায়, তাদের বাসায় প্রায় ৫০টি বিভিন্ন জাতের বিদেশী পোষাপাখি আছে। তার পোষাপাখির মধ্যে আছে ককটেইল,জাভা,ফ্রিন্জ। সে জানায়, তার বাবা ব্যবসায়ী সাঈদ আহমেদ আর সে মিলে ঘরের বারান্দায় এগুলোকে পালছেন।
সালমানের মতো আরেকজনের দুঃখ ঠিক এমনিই। ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আসলাম জানান, তার ছিল একজোড়া আফ্রিকান গ্রে প্যারট। এরা তাকে নাম ধরেও ডাকত। আফ্রিকান গ্রে প্যারটকে যা শেখানো যেত তা-ই বলতে পারত। কিন্তু বলতে কষ্ট হচ্ছে, আমার একজোড়া আফ্রিকান গ্রে প্যারট আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। ব্যবসার কাজে ব্যাংকক গিয়েছিলাম। এসে দেখি খাঁচায় নেই সেগুলো। বাসার কেউ বলতে চায়নি, যদি আমি কষ্ট পাই। অনেক পড়ে তাই জানান হলো ওরা মারা গেছে। আসলে মেরে ফেলা হয়েছিল। কাজের মেয়ে আফ্রিকান গ্রে প্যারটদের গোসল করাতে গিয়ে ওদেরকে অনেকক্ষণ পানিতে চুবিয়ে রাখে। আর তাতে দম বন্ধ হয়ে পাখিগুলো মারা যায়। তিনি জানান, আফ্রিকান গ্রে প্যারট নীরব পরিবেশে থাকতে চায়। এ পাখিগুলো মানুষের উপস্থিতি তেমন পছন্দ করে না। তাই মধ্যরাতেও এরা জেগে থাকে। এদের দেহ ধূসর বর্ণের। গড় আয়ু প্রায় পঞ্চাশ বছর।
প্রদর্শনীতে এসেছে
প্রদর্শনীতে প্রায় ২৫ জন তাদের পোষাপাখি নিয়ে হাজির হয়েছেন। আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলবে। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সমাজে প্রকৃতিপ্রেমের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পোষাপাখি লালন-পালন ও প্রজননের মাধ্যমে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি তাদের। বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েকটি জনপ্রিয় পোষাপাখির মধ্যে জাপানিজ ক্রেস্টেড বাজরিগা অন্যতম। জাপানিজ বাজরিগা জাপানেই প্রথম হয়েছিল, যার কারণে এর নাম হয়েছে জাপানিজ ক্রেস্টেড বা হাগোরোমো। এর অর্থ হচ্ছে পরীদের পোশাক, পাখির ডানা। বিভিন্ন দেশে এই পাখিকে হেলিকপ্টার বাজরিগাও বলা হয়ে থাকে। কারণ এ পাখির পাখায় ফুলের পলক থাকে। ২০১২ সালে এ পাখি বাংলাদেশে আমদানি হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও মিস, কুয়েত, পাকিস্তানেও জাপানিজ ক্রেস্টেড বাজরিগা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এসেছে অত্যন্ত অকর্ষণীয় প্রজাতির স্পেলনডিড প্যারাকিট, বুরকিজ প্যাারাকিট, ইন্ডিয়ান রিংনেক প্যারোট, লরিকিট, রোজেলা, ক্যালিফোর্নিয়ান কোয়েল। আবার অনেক দামি পাখিও আনা হয়েছেÑ এগুলোর মধ্যে আফ্রিকান গ্রে প্যারট, ব্লু এন্ডং গোল্ড ম্যাকাউ, হ্যানস ম্যাকাউ। গতকাল প্রদর্শনী শুরু না হতেই সকাল থেকেই দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের এসব বিদেশী পোষাপাখি দেখতে। কেউ কেউ হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখে।
পুরুষ সঙ্গীকে পাহারা দিচ্ছে ম্যাকাউ
মেলায় আনা হয়েছে ব্লু অ্যান্ড গোল্ড ম্যাকাউ, হ্যানস ম্যাকাউ। চার জোড়া ব্লু এন্ডং গোল্ড ম্যাকাউ, হ্যানস ম্যাকাউ আনা হয়েছে। দর্শকরা কাছে আসা মাত্রই চিৎকার করছিল একজোড়া ম্যাকাউ। জানা গেল এরা স্বামী-স্ত্রী প্রদর্শনীতে আসা একজন দর্শক জানালেন স্ত্রী ম্যাকাউটি চিৎকার করছে। কারণ কেউ যেন তার স্বামীকে নিয়ে না যায়। বিকট চিৎকার করে সে ভয় দেখাচ্ছে। ভাবটি এমন যে, কেউ তার সঙ্গীর কাছে গেলে বিপদ আছে। রাইসুল হাসান খান অন্ত বললেন অন্য কথা । বললেন এরা এত শব্দ ঝামেলা পছন্দ করে না। তাই এমন চিৎকার করে বিরক্তি প্রকাশ করছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.