মাধ্যমিকে তিন দিনের কর্মবিরতি কাল থেকে ১৪ ও ১৯ মার্চ মহাসমাবেশ

জাতীয়করণের দাবিতে শিকেরা আবারো আন্দোলনে নামছেন

আমানুর রহমান

দেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ দাবিতে সব পক্ষের শিক্ষকেরা আবারো আন্দোলনে যাচ্ছেন। বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের এসব এমপিওভুক্ত শিক্ষক জাতীয়করণের দাবিতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে আন্দোলন ও রাজপথে নামছেন। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের একক বৃহৎ সংগঠন শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট এবং বর্তমান সরকার সমর্থক ১০টি শিক্ষক-কর্মচারী সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত শিক্ষক কর্মচারী সংগ্রাম কমিটির আহ্বানে আগামীকাল শনিবার থেকে পরবর্তী তিন দিন (১১, ১২ ও ১৩ মার্চ) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের ডাক দেয় সংগঠনটি। শিক্ষক কর্মচারী সংগ্রাম কমিটি ১৪ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষকদের এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের একক বৃহৎ সংগঠন অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়ার নেতৃত্বাধীন শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের ১ দফা দাবিতে ১৯ মার্চ ঢাকায় জাতীয় প্রেস কাবের সামনে মহাসমাবেশ করবে।
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণ দাবি ছাড়াও উপরি উক্ত দুই পক্ষের শিক্ষকদের আরো বড় দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, বছরান্তে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতো ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট, বৈশাখীভাতা, চিকিৎসাভাতা, পূর্ণাঙ্গ উৎসবভাতা, পেনশনব্যবস্থা চালুকরণসহ অন্যান্য দাবি। এসব দাবিতে ইতোমধ্যে সারা দেশে উপরি উক্ত শিক্ষক সংগঠন ও জোট পৃথক সমাবেশ মানববন্ধন স্মারকলিপি পেশ করেছেন। ইতঃপূর্বে ঢাকায় অবস্থান ধর্মঘটও পালন করেছে শিক্ষকদের অপর একটি অংশ। কিন্তু এ পর্যন্ত দাবিগুলোর ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। বর্তমান সরকারের মেয়াদ আর মাত্র কয়েক মাস, এ অবস্থায় ওই দাবিগুলোর ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বারবারই অর্থ মন্ত্রণালয়কে দায়ী করছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা বা বক্তব্য নেই। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার সমর্থক ও বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষক সংগঠনগুলো এ মুহূর্তে রাজপথেই সমাধান খোঁজার পথে যাচ্ছেন। সরকার সমর্থক শিক্ষক সংগঠন ও সংগ্রাম কমিটির নেতা আজিজুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, এ কর্মসূচি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের লক্ষ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে। এ কর্মসূচি সরকারবিরোধী কোনো কর্মসূচি নয়। বিরোধী দল সমর্থক শিক্ষক সংগঠন ও জোট নেতা অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, কোনো সরকারের আমলেই শিক্ষকেরা রাজপথে না নামার আগে দাবি পূরণ হয়নি। তাই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও চাপ দিতেই কর্মসূচি ঘোষণা করতে হচ্ছে। এ আন্দোলন শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন মাত্র।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে এবং দুইপক্ষের শিক্ষক নেতারা জানান, সারা দেশে সরকারি মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে ৩৬৫টি এবং উচ্চ মাধ্যমিক কলেজ রয়েছে ২৫৬টির মতো। অপর দিকে, কেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে, ২৮ হাজারের বেশি আর কলেজ প্রায় দুই হাজারের মতো। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা হচ্ছে পৌনে ৫ লাখ।
শিক্ষক নেতাদের দাবি সরকারি শিক্ষকদের সমযোগ্যতা নিয়েই তারা বছরের পর বছর মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজে কর্মরত রয়েছেন। কিন্তু তারা বেতনের শতভাগ পেলেও, অন্যান্য কোনো সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো সুবিধা তারা পান না। সরকারি বেতনই তাদের ভরসা। অপর দিকে, সম-যোগ্যতা এবং একই পাঠ্যক্রমে পাঠদান এবং পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকার শীর্ষে থাকছেন। কিন্তু সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্য হয়েও সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকার নিচে অবস্থান করছেন। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দাবি বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় বৈষম্যের শিকার। এ বৈষম্যের অবসান না হলে মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
আন্দোলনরত সরকার সমর্থক শিক্ষক নেতা আজিজুল হক নয়া দিগন্তকে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করা হলে শিক্ষাব্যবস্থায় বহু বছর থেকে চালু থাকা দুর্নীতি প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে আসবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বর্তমান যে দুর্নীতি অভিযোগে বিদ্ধ হতে হচ্ছে তার অবসান ঘটবে। তিনি বলেন, দুর্নীতির মূল শিকড় হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাণিজ্য এমপিওভুক্ত এবং অডিটে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এসব অভিযোগ নেই। তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণই এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোট চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ করতে যে পরিমাণ আর্থিক সংশ্লেষ প্রয়োজন হবে তা কোনো সরকার এবং তার ভেতরের আমলাতন্ত্র তা মেনে নেবে না। তাই এ মুহূর্তে সর্বাগ্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-কর্মচারী হয়রানি-চাকরিচ্যুতি-নির্যাতন বন্ধ হবে। শিক্ষক নিয়োগে একটি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ হলে সরকারকে এ খাতে নতুন করে বড় ধরনের কোনো বরাদ্দ দিতে হবে না। এমপিও খাতের বরাদ্দের সাথে সামান্য কিছু বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পরে অর্থনীতির সাথে সঙ্গতি রেখে পর্যায়ক্রমে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন, শিক্ষা খাতে যে বড় দুর্নীতির কারণ হচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। জাতীয়করণ হলে এগুলো বন্ধ হবে।
শিকদের উপরি উক্ত দাবিগুলো ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ বা শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়। এ ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক এমপিওভুক্তির ব্যাপারে বিদ্যমান নীতিমালার ব্যাপক সংশোধনের কাজ চলছে। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে অনেক কিছু সংশোধন-সংযোজন করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটের আগে এ ব্যাপারে কোনো কিছু বলার নেই।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.