জাফর ইকবালের ওপর হামলা

ফয়জুর ১০ দিনের রিমান্ডে

সিলেট ব্যুরো ও শাবি সংবাদদাতা

জনপ্রিয় লেখক এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর হাসানকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। এ দিকে জাফর ইকবালের ওপর হামলার প্রতিবাদে শাবিসহ সিলেটে বিভিন্ন সংগঠনের নানা কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
১০ দিনের রিমান্ডে ফয়জুর : অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর রহমান ওরফে ফয়জুল ওরফে শফিকুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১টা ১৫ মিনিটে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ফয়জুরকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে সরাসরি মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩ এর হরিদাস ঠাকুরের আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত তা মঞ্জুর করেন। সিলেট প্রসিকিউশনের সহকারী কমিশনার অমূল্যকুমার চৌধুরী এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এ এফ এম রুহুল আনাম মিন্টু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, আদালতে কেউ ফয়জুরের জামিন আবেদন করেননি। তার পে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। সিলেটের কোনো আইনজীবী ফয়জুরের পে লড়বেন না। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার থেকেই তার রিমান্ড শুরু হবে। তবে, তাকে সিলেটে না ঢাকায় নেয়া হবে এ বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে কিছু বলতে চাননি তিনি। তবে, অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ড মঞ্জুরের পরই ফয়জুরকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট।
গত শনিবার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান চলাকালে ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে পেছন থেকে মাথায় ছুরিকাঘাত করে ফয়জুর। আহতাবস্থায় জাফর ইকবালকে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার শেষে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়। বুধবার সকালে ইনসেনটিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) থেকে বিশিষ্ট এ লেখককে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়।
‘দাওয়াহ ইলাল্লাহ’ ফোরামের নির্দেশনায় হামলা : ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলার ব্যাপারে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। হামলাকারী ফয়জুরকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পান তারা। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ‘দাওয়াহ ইলাল্লাহ’ নামে একটি উগ্রবাদী ফোরামের নির্দেশনায় অধ্যাপক ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলা করেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে হামলাকারী ফয়জুর। ওই গ্রুপে জাফর ইকবালকে হত্যা করা নিয়ে নিয়মিত আলোচনাও হতো বলে জানিয়েছে সে। নির্দেশনা পাওয়ার পর ফয়জুর সিলেটের মদিনা মার্কেটের একটি জিমে শারীরিক প্রশিণের জন্যও ভর্তি হয়েছিল। হামলার চূড়ান্ত নির্দেশনা পাওয়ার পর সিলেটের জিন্দাবাজারের একটি দোকান থেকে কমান্ডো নাইফ (চাকু) কেনে ফয়জুর। ফয়জুরকে শেখানো হয় মাথা এবং ঘাড়ের পেছনে আঘাত করতে হবে। তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই ‘টার্গেট’ মৃত্যুর মুখে পতিত হবে। সেই প্রশিণ অনুযায়ী সে জাফর ইকবালের মাথা ও ঘাড়েই কমান্ডো নাইফ নিয়ে আঘাত করেছিল।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, ফয়জুরের সঙ্গে আরো কেউ ছিল। কিন্তু সে মুখ খুলতে চাইছে না। সে একাই জাফর ইকবালকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে বলে দাবি করছে। কিন্তু সে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। আমরা এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘হামলাকারী ফয়জুরের কোথায় কোথায় বিচরণ ছিল, কোথা থেকে সে কমান্ডো নাইফ কিনেছে, কখন কিভাবে পরিকল্পনা করেছে, এসবের কিছু কিছু তথ্য জানা গেছে। তার সহযোগীদের শনাক্ত এবং গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে।’ জাফর ইকবালকে ছুরিকাঘাতের ঘটনা তদন্তে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, সিআইডি, পিবিআই এবং জঙ্গি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা বিশেষায়িত ইউনিট কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট হামলার রহস্য উন্মোচনে অনুসন্ধান শুরু করে। পুলিশ সদর দফতর থেকেও সরাসরি বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে।
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বুধবার রাতে বলেন, ‘ফয়জুরের কয়েকজন সহযোগীকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। এ ছাড়া সুমন নামে ফয়জুরের এক সহকর্মীও পলাতক। সুমনের সঙ্গে ফয়জুর তার বোনের বিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেও জঙ্গিবাদ ভাবাদর্শের অনুসারী হতে পারে। এ ছাড়া ফয়জুরের ভাই এনামুলও পলাতক। তাকেও খোঁজা হচ্ছে। এনামুলের কাছে ফয়জুরের ব্যবহৃত সব ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো রয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা জানান, দাওয়াহ ইলাল্লাহ হলো বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং আনসার আল ইসলামের একটি অনলাইন ফোরাম। যেখানে নির্দিষ্ট আইডির মাধ্যমেই শুধু প্রবেশ করা যায়। বিভিন্নভাবে পরীতি লোকজনই এই ফোরামের আলোচনায় যুক্ত হতে পারে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আনসার আল ইসলামের যেসব সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তারাও দাওয়াহ ইলাল্লাহ ফোরামের মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রমের কথা স্বীকার করেছে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে দাওয়াহ ইলাল্লাহসহ অনেক গ্রুপ এবং ওয়েবসাইট বন্ধ করেও দেয়া হয়েছে।
‘ভিন্ন কায়দায়’ নামাজ পড়ত ফয়জুর : ফয়জুর হাসান নামাজ পড়ত ভিন্ন কায়দায়। নামাজ পড়া নিয়ে স্থানীয় মসজিদ ও তার কর্মস্থলের মসজিদের ইমামের সাথে প্রায়ই বিতর্কে জড়াতো সে। মতে না মেলায় জামাতে নামাজ আদায় না করে ঘরে একা একা নামাজ পড়ত ফয়জুর। ঘরে একা একাই বেশির ভাগ সময় কাটাতো সে। এমনটি জানিয়েছেন ফয়জুরের মামা ফজলুর রহমানের স্ত্রী রিপা রহমান। বুধবার সিলেট শহরতলির শেখপাড়া বাসায় সংবাদকর্মীদের এমন তথ্য জানান রিপা।
জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর ফয়জুরের মামা সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ফজলুর রহমানকে আটক করে পুলিশ। ধর্ম পালন নিয়ে মতের সাথে না মেলায় ফয়জুরকে পছন্দ করতেন না তার বাবা হাফিজ আতিকুর রহমান। যিনি নিজেও একজন মাদরাসা শিক। রিপা রহমান বলেন, ফয়জুর অনুসরণ করতো তার কুয়েত প্রবাসী দুই চাচাকে। এই দুই চাচা আবদুল জাহার ও আবদুল সাদিকের মতো সেও ভিন্ন কায়দায় নামাজ পড়ত। অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সাথে ভালো সম্পর্ক না থাকলেও কুয়েত প্রবাসী দুই চাচার সাথে সখ্য ছিল ফয়জুরের। এই দুই চাচা নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা করতেন ফয়জুরের পরিবারকে। সিলেট শহরতলির শেখপাড়ায় জায়গা কিনে ফয়জুরের পরিবারকে বাসাও করে দেন চাচা জাহার ও সাদিক। এর বাইরে তার দামি মোবাইল, ল্যাপটপসহ দামি দামি কাপড় চোপড় প্রায়ই কিনে দিতেন এই দুই চাচা। বর্তমানে সাদিক দেশে অবস্থান করলেও জাহার কুয়েতে অবস্থান করছেন। রাজধানী ঢাকায় বাড়ি রয়েছে জাহারের। কুয়েত থেকে প্রায় নিয়মিতই দেশে আসা-যাওয়া ছিল তাদের।
জাফর ইকবালের নিরাপত্তা আরো বাড়ানো হবে : এসএমপি কমিশনার
হামলায় আহত অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের নিরাপত্তা আরো বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া।
তিনি বলেন, স্যার সুস্থ হয়ে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসার পর তার নিরাপত্তা আরো বাড়ানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপকেও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
বুধবার রাতে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে একথা বলেন পুলিশ কমিশনার। জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় আগেই আটজন পুলিশ সদস্য ও দুজন গানম্যান নিয়োজিত ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এখন নিরাপত্তা আরো বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, ‘জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে’।
ফয়জুরের ভাই এনাম গাজীপুর থেকে গ্রেফতার
সিলেট ব্যুরো জানায়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর রহমানের ভাই এনামুলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় তাকে গাজীপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তার কাছে থাকা ফয়জুরের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ট্যাব উদ্ধার করে পুলিশের বিশেষ এ ইউনিট।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার পর ফয়জুরের মোবাইল ফোন ও ট্যাব নিয়ে পালিয়ে যায় এনামুল। গাজীপুর থেকে ওই মোবাইল ফোন ও ট্যাবসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মোবাইল ফোন ও ট্যাব ঘেঁটে তাদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততার আলামত পাওয়া গেছে।
সিটিটিসির উপকমিশনার (ডিসি) মহিবুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এনামুলের কাছ থেকে ফয়জুরের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলেও জানান তিনি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.