শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি শহরে সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থান। গতকালও শহরটির একটি মসজিদে পেট্রলবোমা হামলা হয়েছে : এএফপি
শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি শহরে সেনাবাহিনীর সতর্ক অবস্থান। গতকালও শহরটির একটি মসজিদে পেট্রলবোমা হামলা হয়েছে : এএফপি

শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধরা আগেও সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে

টরোন্টো স্টার

শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি এলাকায় সিংহলি দাঙ্গাকারীরা সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা চালিয়েছে। এর শিকার হয়েছেন নিরাপরাধ মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুরা। হত্যা করা হয়েছে নারী-পুরুষদের। তাদের দোকানপাট, মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ১০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে সরকার। এই সহিংসতা ও জাতিবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের কড়া নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
শ্রীলঙ্কায় এই ধরনের সহিংসতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিরা ১৯৫৮, ১৯৭৭ ও ১৯৮৩ সালে তামিলবিরোধী কর্মসূচি হাতে নিয়েছিল। দেশটির অস্থির ইতিহাসে তামিল, মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর মাঝে মধ্যেই সহিংসতা হয়েছে থেমে থেমে। এখানে ১৯৮৩ সালের ২৩ জুলাই রাতে তামিলবিরোধী অভিযান শুরু হয়। এর নাম দেয়া হয় ‘ব্লাক জুলাই’। ওই সময় শ্রীলঙ্কার সরকার তামিল ভোটারদের তালিকা সরবরাহ করে সশস্ত্র দাঙ্গাকারীদের কাছে। এর ফলে তারা হত্যা করে কমপে তিন হাজার তামিলকে। রাজধানী কলম্বোতে তামিলদের মালিকানাধীন বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার ফলে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা থেকে দলে দলে তামিলরা দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিতে থাকেন কানাডার মতো দেশে। ওই ঘটনার ফলে শ্রীলঙ্কায় সৃষ্টি হয় ২৬ বছর স্থায়ী গৃহযুদ্ধের। তা শেষ হয় ২০০৯ সালের মে মাসে। এই যুদ্ধ শেষ হয় গুরুতর সব অভিযোগের মধ্য দিয়ে। অভিযোগ করা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক আইন ভয়াবহভাবে লঙ্ঘন করেছে সরকার। ২০১৫ সালে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশনারের অফিস প্রমাণ পায় যে, ওই যুদ্ধের শেষের দিকে মারাত্মকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। মানবাধিকার ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যৌন সহিংসতা, সংপ্তি বিচারে ফাঁসি ও জোরপূর্বক গুমের সাথে জড়িত শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী।
এসব সহিংসতার সবটাই একই সুতোয় গাঁথা। তা হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। প্রায় ৭০ বছর আগে স্বাধীনতা অর্জন করে শ্রীলঙ্কা। তারপর থেকেই এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি সেখানে বিদ্যমান। এসব দাঙ্গার জন্য যারা দায়ী অথবা ২০০৯ সালে শেষ হওয়া যুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সমতা নেই শ্রীলঙ্কার। তারা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অব্যাহতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বা দিয়ে যাচ্ছে। বলছে, এই বিচারে বিদেশী ও কমনওয়েলথের বিচারক, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী থাকবেন। কিন্তু ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথে কোনোই অগ্রগতি হয়নি।
সরকার তার সেনাবাহিনীকে যেকোনো রকম জবাবদিহিতা থেকে সুরতি রেখেছে। প্রকৃত সত্য হলো, ২০০৯ সালে শেষ হওয়া যুদ্ধে জড়িত ছিলেন এমন সেনাবাহিনীর সিনিয়র অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। কিন্তু সরকার কী করেছে! সরকার তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দিয়েছে। তাদেরকে নিয়োগ করেছে বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে। সেখানে তারা বিচারের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি সুবিধা ভোগ করছেন।
কঠোরভাবে বলতে হয়, সর্বশেষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে দাঙ্গা বা হামলা হচ্ছে তা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক কাউন্সিল শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার রেকর্ড, জবাবদিহিতা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ও পুনরেকত্রীকরণের রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করছে। এ সপ্তাহে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার প্রিন্স জায়েদ বিন রাদ জায়েদ আল হোসেন শ্রীলঙ্কার বিষয় তুলে ধরেছেন। এতে শ্রীলঙ্কায় দায়মুক্তির সুবিধা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতির অগ্রগতিতে অভাব তুলে ধরেন তিনি। তিনি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান শ্রীলঙ্কার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সার্বজনীন বিচারের মূলনীতি প্রয়োগ করতে।
গণতান্ত্রিক একটি অভ্যুত্থান এরই মধ্যে ঘটে গেছে দেশটিতে। সেটা ঘটেছে ২০১৫ সালে। তখন কর্তৃত্ববাদী শাসক মাহিন্দ রাজাপাকসেকে মতা থেকে উৎখাত করে ওই অভ্যুত্থান। এর মধ্য দিয়ে একটি আশার আলো দেখা দেয় যে, শান্তির পথে অগ্রসর হবে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় মতায় আসেন নতুন প্রেসিডেন্ট। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। সমর্থন প্রকাশ করেন ‘ওয়ার হিরো’ বা তাদের দৃষ্টিতে যুদ্ধের নায়কদের প্রতি, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত যারা তাদের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি দেন। এর ফলে নির্যাতিতরা বা ভিকটিমদের সত্য ও ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে নতুন করে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।
শ্রীলঙ্কা তার নিজের ছায়ার ভেতরেই রয়েছে। দায়মুক্তি দেয়ায় এই দ্বীপরাষ্ট্রটির এবং এর জনগণের যে তি করা হয়েছে তা তাদের উল্টো দেয়া উচিত। আমরা যদি ইতিহাস থেকে শিা নিতে চাই, যদি অতীতের ভুল এড়িয়ে চলতে চাই, তাহলে যারা নিয়মিতভাবে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করেছে তাদেরকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ড, তাদের নির্লিপ্ততায় যে তি হয়েছে, যা হারিয়ে গেছে তার জন্য এই বিচার করতে ব্যর্থ হলে পুরো মানবতা ব্যর্থ হবে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.