ভারতের পানি আগ্রাসন

অকার্যকর হতে চলেছে সেচ প্রকল্প

প্রতিবেশী দেশ ভারত সেই সত্তরের দশকে ফারাক্কা বাঁধ চালু করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পানি আগ্রাসন শুরু করেছিল, তা আজ আরো প্রবল থেকে প্রবলতর করা হচ্ছে। আর এর ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর এর বিরূপ প্রভাবে ব্যাপক পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার শিকার হচ্ছে ভাটির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এর জন্য যত প্রতিবাদই জানাক না কোন, ভারত তা মোটেও আমলে নিচ্ছে না। বরং অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী দেশ ও উজানে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে ভারত বাংলাদেশের কোনো বাদ-প্রতিবাদকেই তোয়াক্কা করছে না। আন্তর্জাতিক পানি ও নদীসংক্রান্ত সব ধরনের আইন, কনভেনশন ও রীতিনীতি উপেক্ষা করে ভারত এ পানি আগ্রাসন অব্যাহতভাবে চালু রেখেছে। এতে বাংলাদেশ সার্বিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে।
ভারত বাঁধের ফাঁদে ফেলে নদীমাতৃক বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকায় শিকল পরিয়ে রেখেছে। ইচ্ছা ও প্রয়োজন হলেই ভারত এই সুযোগে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে চলেছে। এতে বাংলাদেশ আর্থিক ও পরিবেশগত কতটুকু ক্ষতির মুখে পড়ল সে ভাবনা ভারতের নীতিনির্ধারকদের মাথায় নেই। ভারত যখন চাইছে তখন বাঁধ দিয়ে আন্তর্জাতিক নদীর পানি আটকে রাখছে, আবার প্রয়োজনে বাঁধ খুলে দিয়ে বাংলাদেশকে বন্যার পানিতে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ডুবিয়ে দিচ্ছে ফসলের ক্ষেত।
আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশের উৎসমুখে একাধিক বাঁধ ও ড্যাম নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ সেচসুবিধার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে। অপর দিকে, বাংলাদেশের কৃষি-অর্থনীতিকে ক্রমেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতীয় এই আগ্রাসী নীতির মুখে কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চল খরার সময় মরুভূমি আর বর্ষার সময় পানির নিচে ডুবে থাকছে। উত্তরের প্রাণরেখা হিসেবে পরিচিত তিস্তার উৎসমুখে গজলডোবা বাঁধ এখন বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য মারণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিনির্ভর উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোকে ধীরে ধীরে নিঃস্ব করে ফেলা হচ্ছে। জেলেদের পরিণত করা হয়েছে ভিখারিতে। বর্তমানে নদীর পানিপ্রবাহ ঠিক রেখে সেচকাজের জন্য প্রয়োজন ২০ হাজার কিউসেক পানিপ্রবাহ। অথচ মাত্র পাওয়া যাচ্ছে ৭০০ কিউসেক পানি। বাংলাদেশের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা ব্যারাজ থেকে ৯৭ কিলোমিটার পর্যন্ত নদীতে এক কিউসেক পানিও থাকছে না। এ কারণে তিস্তা অববাহিকায় বাংলাদেশ অংশের এই বিশাল এলাকা পানিস্বল্পতার কারণে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। ভাটিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজ ভারতীয় পানি আগ্রাসনের মুখে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
শুধু এখানেই শেষ নয়। ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের সব এলাকায়। অস্তিত্ব সঙ্কটে সাতক্ষীরার নদ-নদী, খাল-বিল। অভিন্ন নদীগুলোর ওপর পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে সারা দেশেই এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ সরকারের নতজানু নীতির কারণে ভারত দীর্ঘ দিন ধরে এই পানি আগ্রাসন চালিয়ে যেতে পারছে অবাধে। এখন সময় এসেছে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলা। নইলে শুধু মৌখিক বাদ-প্রতিবাদ এ সমস্যার সমাধান বয়ে আনবে না। এরই মধ্যে সমস্যাটি জটিল আকার ধারণ করেছে। এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাংলাদেশ ফেরার পথও যেন হারিয়ে ফেলছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.