মর্মস্পর্শী সেই ভিডিও বার্তা
মর্মস্পর্শী সেই ভিডিও বার্তা
পড়তে না চাওয়ায় মেয়ের গলা টিপে ধরেন মা

মর্মস্পর্শী সেই ভিডিও বার্তা

মেহেদী হাসান

শিউলি (ছদ্মনাম) রাজধানীর খুবই নামকরা একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। আগামী নভেম্বরে তাকে সমাপনী পরীক্ষায় বসতে হবে। প্রতিদিন স্কুলের কাসের পাশাপাশি ছয়টি পাঠ্য বিষয়েই তাকে কোচিং কাসও করতে হয়। রয়েছে বাসায় গৃহশিক্ষক। স্কুলের কাস, তার ওপর কোচিংয়ের কাস শেষে একদিন সন্ধ্যায় শিউলি খুবই কান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। শিউলির মা তাকে বারবার টেবিলে পড়তে বসার আদেশ করছিলেন। কিন্তু শিউলির সে দিকে মনোযোগ ছিল না। বিছানা থেকে ওঠেনি সে। এতে রাগ হয় তার মা। একপর্যায়ে শিউলির মা প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মারতে শুরু করেন। শিউলির গলা টিপে ধরেন। শিউলি তখন তার মাকে বলে আমাকে মেরে ফেল। এভাবে এত পড়া আর ভালো লাগে না। এর চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।

২০১৬ সালে রাজধানীর বনশ্রীতে মাহফুজা মালেক নামে এক মা হত্যা করেন তার দুই সন্তান অরনী (১২) ও আমানকে (৭)। জিজ্ঞাসাবাদের সময় মাহফুজা মালেক তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, সন্তানদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলেন তিনি। পড়াশোনায় ভালো না করলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে এ নিয়ে সবসময় ভাবতেন তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে মানসিক দুশ্চিন্তা আর অস্থিরতায় তিনি তাদের হত্যা করেছেন। নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ দাবি করে মাহফুজা মালেক জানান, সন্তান হত্যার সময় তার মাথা ঠিক ছিল না।

মাহফুজার মেয়ে অরনী পড়ত ভিকারুননিসা নূন স্কুলে। ছেলে আমানও পড়ত নামকরা আরেকটি স্কুলে।
গত বছর এসএসসিতে জিপিএ ৫ না পাওয়ার পর রাজধানীতে আত্মহত্যা করে এক ছাত্র। এই ছাত্রের মা তার নাম-পরিচয় গোপন রেখে এনটিভি ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেন সন্তানের আত্মহত্যার কারণ। ভিডিও বার্তায় তিনি তুলে ধরেছেন কিভাবে দিনের পর দিন ভালো রেজাল্টের জন্য তারা তাদের সন্তানের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ভালো রেজাল্ট করতে না পারায় এবং পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে না পারার চাপ ও মনোকষ্টে সন্তান পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেয় রেজাল্ট প্রকাশের দিন।

ভিডিও বার্তায় ওই নারী সবার কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, পরীক্ষা আর পড়া নিয়ে সন্তানের ওপর যেন তাদের মতো আর কেউ বাড়াবাড়ি না করেন।

কিন্তু কেউ শুনছে না কারো কথা। রাজধানীর কয়েকটি স্কুলের সামনে গিয়ে অভিভাবকদের সাথে সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে জানতে চাওয়ায় যে বিবরণ পাওয়া গেল, তা খুবই উদ্বেগজনক।

সমাপনী, জেএসসি বা জেডিসি, এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা ঘিরে ঘরে ঘরে চলছে অস্থিরতা, অশান্তি। পরীক্ষার্থী সন্তানের মা-বাবা ভুগছেন প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায়। এমনকি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়ই অনেকের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়ে যায় সমাপনী পরীক্ষার কারণে। রাজধানীর বিভিন্ন স্কুলে চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণরূপে সমাপনী পরীক্ষার আদলে পরীক্ষা গ্রহণ এবং পাঠদান করে আসছে। ছোট শিশুদের এসব পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে অভিভাবকেরা এতটাই চাপে রয়েছেন যে, অনেক অভিভাবক বলেছেন তাদের অবস্থা পাগল হওয়ার উপক্রম। পরীক্ষার কথা মনে হলেই বুকের মধ্যে ধড়ফড় ও অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়।

পরীক্ষার কারণে মনের সব শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে। সারাক্ষণ এক দুশ্চিন্তা। মন মেজাজ নষ্ট। তার ওপর রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের নৈরাজ্য। রয়েছে সৃজনশীলের দুশ্চিন্তা। এক কথায় সন্তানের পড়ালেখা মানে জীবনে বড় ভারী এক বোঝা, যা বয়ে চলা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীতে প্রায় সব অভিভাবক এ নিয়ে রয়েছেন মানসিক অস্থিরতার মধ্য। এক দিকে আজকের সমাজে মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে নানামুখী দুশ্চিন্তা, বৈপরীত্য, সঙ্ঘাত, টানাপড়েন, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানামুখী জটিলতা। তার ওপর যুক্ত হয়েছে সন্তানের পড়ালেখা আর পরীক্ষাকেন্দ্রিক অস্থিরতা।

আজকের সমাজে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে তার পেছনে এ অস্থিরতা কম দায়ী নয় বলে মনে করছেন অনেকে। সন্তানের পড়ালেখা ঘিরে অনেক পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও নিয়মিত ঝগড়া আর মনোমালিন্য চলছে। প্রায় সব অভিভাবকই বলেন, সমাপনী আর জেএসসি পরীক্ষা না থাকলে একটু হাফ ছেড়ে বাঁচতে পারতাম আমরা। অনেকে কাতর কণ্ঠে বলেছেন, ভাই এসব পরীক্ষা কি কোনো অবস্থায়ই বাতিল করা হবে না। আমাদেরকে কি এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেয়া যায় না। এ পরীক্ষায় আমাদের আর শিশু সন্তানদের হয়রানি, কষ্ট, অর্থের অনাচার, মানসিক যন্ত্রণা ছাড়া কোনো লাভ হচ্ছে না। শিশুদের মানসিকভাবে টর্চার করা হচ্ছে।

অভিভাবকেরা জানান, সবাই ছুটছে কোচিংয়ে। যাদের সামর্থ্য রয়েছে তারা সব বিষয়ে কোচিং করাচ্ছে। কোচিং ও প্রাইভেট পড়ে না এমন শিক্ষার্থী রাজধানীতে খুব সীমিত। একের পর এক পরীক্ষার কারণে আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে আকুতি প্রকাশ করেছেন অনেকে।

মর্মস্পর্শী সেই ভিডিও বার্তা
পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্টের কারণে এক ছাত্র আত্মহত্যার পর এর নেপথ্য কারণ ক্যামেরার সামনে তুলে ধরেন ওই ছাত্রের মা। সন্তানহারা ওই মা জানান, তার ছেলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভালো ফল করতে পারেনি। এতে তার স্বামী ভীষণ রেগে যান। এমনকি ছেলের দাদাবাড়ির লোকজনও পরীায় খারাপ ফলের জন্য আমাকে দোষারোপ করতে থাকেন। সবাই অভিযোগ করতে থাকেন, আমি ঠিকমতো ছেলের যত্ন নেয়নি।

এ অবস্থায় ছেলের ওপর আমি চাপ দিতে থাকি ভবিষ্যতে যেন ভালো করার লক্ষ্যে। ছেলেকে নিয়েই বেশির ভাগ সময় কাটাই আমি। সে ঠিকমতো বাড়ির কাজ করছে কি না, অযথা সময় নষ্ট করছে কি না এসব খেয়াল রাখতে শুরু করি সব সময়। ছেলেকে সব সময় পড়ালেখায় মনোযোগী হতে বলি।

ছেলেকে স্কুলে আনা-নেয়া থেকে শুরু করে সব কিছু আমি একাই করি। আমার জীবন হয়ে যায় শুধু আমার ছেলেকেন্দ্রিক। এভাবে আমার ছেলে অষ্টম শ্রেণীতে ভালো ফল করে। পরে তার ওপর পরিবারের প্রত্যাশা বাড়তে থাকে। পরিবারের সবাই বারবার বলতে থাকেন এসএসসিতেও ভালো ফল করতে হবে। আমার স্বামী ঘোষণা করেন যে করেই হোক তাকে জিপিএ ৫ পেতেই হবে। তা না হলে তার মান-সম্মান থাকবে না। পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে।

তিনি বলেন, আমার স্বামী ব্যবসায়ের কাজে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি ছেলেকে লেখাপড়ার মাধ্যমে বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। পরিবার ও স্বামীর এ চাপে আমিও ছেলের ওপর চাপ বাড়াতে থাকি।

আমার ছেলে খেলাধুলা খুব পছন্দ করত। ছবি আঁকত। কিন্তু পড়ার চাপে ধীরে ধীরে সে গুটিয়ে যেতে থাকে। চুপচাপ হয়ে যায়। ছবি আঁকাও বন্ধ করে দেয়। তার পরও আমরা তার ওপর পড়ার চাপ দিয়ে যেতে থাকি। এসএসসি পরীা যতই এগিয়ে আসে ততই আমার ও ছেলের ওপর চাপ বাড়ান আমার স্বামী। ছেলে প্রতিনিয়ত কী করছে জানতে চাইতেন। ও কী পড়তেছে? ও এখন কী করছে? আমি তার যতœ নিচ্ছি কি না ঠিকমতো, খেয়াল রাখছি কি না জিজ্ঞেস করতেন। আমিও বাধ্য হয়ে ছেলেকে চাপ দেই আর উৎসাহ জোগাই ভালো ফলের জন্য।

ফাইনাল পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় কয়েকটি বিষয়ে ভালো ফল করতে পারেনি ছেলে। এতে প্রচণ্ডভাবে ক্ষেপে যান আমার স্বামী। এমনকি ঘোষণা দেন ছেলে জিপিএ ৫ না পেলে তিনি ছেলের মুখ দেখবেন না।

পরীক্ষার পর খুব বেশি চুপচাপ হয়ে যায় আমার ছেলে। সারা দিন রুমে একা বসে থাকতে পছন্দ করত। এভাবে একদিন এলো রেজাল্ট প্রকাশের দিন। সকালে ভয়ে কাতর চেহারা নিয়ে বাসা থেকে বের হয় আমার ছেলে। সকাল পেরিয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলেও বাসায় আসে না আমার ছেলে। এ কথা শুনে প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে আমার স্বামী বলেন, ‘কী বলো তুমি, খেয়াল রাখো না, কেমন মা তুমি? কিছুই করতে পারো না। ছেলেটাকে ঠিকমতো মানুষ করতে পারো নাই।’
সন্ধ্যায় আমরা থানায় গিয়ে ডায়েরি করি। এর দুই দিন পর আমরা জানতে পারি আমাদের ছেলে আর নেই এ পৃথিবীতে।

ভিডিও বার্তায় এ নারী বলেন, আমার ছেলে জিপিএ ৫ পায়নি। সে জন্য আর সে ঘরে ফেরেনি। ফিরতই বা কেমন করে। আমরাই তো তাকে বলেছি ভালো রেজাল্ট না করলে তোর মুখ দেখব না। আজ আমি জানি ভালো ফল করতে না পেরে, পরিবারের চাপে কত মনোকষ্ট নিয়ে সে এ পথ বেছে নিয়েছে।

এ কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে কাঁদতে থাকেন তিনি। এরপর সন্তানহারা এ মা বলেন, মা হিসেবে আমি ব্যর্থ। আমি আমার ছেলেকে কখনো বোঝার চেষ্টা করিনি। কখনো তাকে কাছে নিয়ে জিজ্ঞাসা করিনি, বাবা তোর কি ভালো লাগে, তুই কি করতে চাস? তোর কোনো কষ্ট হচ্ছে কি না তাও কখনো জিজ্ঞাসা করিনি। শুধু সারাক্ষণ তাকে বলেছি পড় পড় পড় পড়। পড়তে হবে, পড়তে হবে, জিপিএ ফাইভ পেতে হবে।

সন্তানহারা এ মা সবার কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, আজ আমার প্রিয় সন্তান আমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছে। আর কাউকে যেন আমার মতো কাঁদতে না হয়। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের কাছে নিয়ে জানতে চাই কী তাদের ভালো লাগে, কী তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা। শুধু ভালো রেজাল্টের জন্য আমরা যেন তাদের ওপর বাড়াবাড়ি না করি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.