বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে আগাম নির্বাচনের চিন্তা
বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে আগাম নির্বাচনের চিন্তা

বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে আগাম নির্বাচনের চিন্তা

হারুন জামিল ও মঈন উদ্দিন খান

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে নানা সমীকরণ চলছে। টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে সরকারের মধ্যে নানা বিকল্প নিয়ে ভাবনা শুরু হয়েছে। এতে কখনো স্থান পাচ্ছে বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে আগাম নির্বাচন, কখনো খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন, আবার কখনো বিএনপিকে শক্তিশালী বিরোধী দল বানিয়ে ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করার মতো বিষয়গুলো। এই মুহূর্তে বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে থাকলেও নির্বাচনের চার-পাঁচ মাস আগে পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে মনে করছে সরকার। সেই ধারণার ওপর ভিত্তি করে ইতোমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া শুরু হয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা এ ক্ষেত্রে সরকারের হাতে একটি বড় অস্ত্র, যার প্রয়োগ চলছে বছরজুড়ে। নির্বাচনের মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী মাসগুলোতে এই প্রক্রিয়া আরো জোরালো হবে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করলেও বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায়। দলটির হাইকমান্ড মনে করছে, সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে তারা এবার মাঠে নামতে পারলে অতীতের মতো বিফল হতে হবে না। সমঝোতার মধ্য দিয়ে সরকার একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে। বিএনপি নেতাদের মতে, যদি নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়, তাহলে বিএনপিকে আটকানো মুশকিল হবে।

খালেদা জিয়ার কারাবন্দীর পর নির্বাচনকেন্দ্রিক সেই পরিকল্পনা থেকেই কঠোর কোনো আন্দোলনে যায়নি বিএনপি।

সরকার নির্বাচনের মাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনে বিএনপিকে আর কোনো স্পেস দেয়ার পক্ষপাতী নয়। বিএনপি প্রধানের কারাবন্দীর পর দলটির কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের সরব উপস্থিতি এবং তা নিয়ে মানুষের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পর সরকার আরো নড়েচড়ে বসেছে। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে ঘরোয়া রাজনীতিতেই আবদ্ধ করে রাখতে চায় তারা।

সরকারি দলের মধ্যে ধারণা রয়েছে, বিএনপিকে কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করা হলে পর্যায়ক্রমে আন্দোলন আরো বড় আকার ধারণ করতে পারে। একপর্যায়ে তা সহিংস রূপ নিতে পারে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সে জন্য বিএনপির চলমান আন্দোলনকে নিষ্প্রভ রাখার চেষ্টা চলছে।

সরকারি দলের নেতাদের ভাবনা অনুযায়ী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি মামলার কারণে জেল থেকে তার শিগগির বের হওয়ার সম্ভাবনা ীণ। যদি দলের চেয়ারপারসনের মুক্তি বিলম্ব হওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে আসে তাহলে তাদের আইনিভাবে দমন করা সহজ হবে। আর নৈরাজ্য না করে ঘরোয়া রাজনীতিতে আবদ্ধ থাকলে দলটি প্রচারের মুখ দেখবে না। এতে করে জনগণের সমর্থন লাভ করাও তাদের পক্ষে সহজ হবে না। একই সাথে বিএনপির প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতিও কোনো কাজে আসবে না।

নির্বাচনের বছরে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রায়ের পর জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও পর্যবেক্ষণে রেখেছে সরকার। গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে এসে ট্রাম্প প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লিসা কার্টিস সরকারের উচ্চপর্যায়ে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েও পাননি। লিসা কার্টিস আগামী নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মনোভাব তুলে ধরে গেছেন। তিনি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমন মনোভাবকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না ক্ষমতাসীন দল।

এ দিকে আগামী ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে উন্নয়ন সহযোগীদের চাপ কিভাবে মোকাবেলা করা হবে, তা নিয়ে সরকারের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। একটি পক্ষ মনে করছে, নির্বাচন অবাধ নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য না হলে সরকারকে আবারো বিতর্কের মুখে পড়তে হবে, দায়ভার নিতে হবে। অপরপক্ষ মনে করছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আদলে না হলেও মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করতে হবে। তবে দুই পক্ষই আরেকবার ক্ষমতায় আসাকে নিজেদের রাজনীতির জন্য নিরাপদ ভাবছে।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে কোন কৌশল অবলম্বন করা হবে, মাঠপর্যায়ে তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেশে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এক দিনে। সংসদের ৩০০ আসনে সমান শক্তি প্রয়োগ করে নির্বাচনে বিজয় অর্জন করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে টার্গেট ভিত্তিক আসনগুলোতে বিজয় নিশ্চিত করতে এখনি কাজ শুরু হয়েছে। বিএনপির সম্ভাব্য আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের দুর্বল করতে নতুন নতুন মামলা দায়ের এবং সক্রিয় কর্মীদের তালিকা করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী অনেককে গ্রেফতারও করা হয়েছে। রাজনৈতিক মামলাগুলোতে তাদেরকে নতুন করে জড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। আগামী নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের অনকূলে আনতে বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতে বিশেষ পন্থায় কাজ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই ২০টির মতো জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে মাঠ প্রশাসন ঢেলে সাজানোই এর মূল কারণ বলে জানা গেছে।

এ দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে জাতিসঙ্ঘ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি লিখিত বার্তা দেয়া হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করার বিষয়টি সেখানে তুলে ধরা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীরা এ বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত রেখেছে। সরকার ও বিরোধী দল উভয় শিবিরের সাথে তাদের যোগাযোগ চলছে। তবে সরকার নিজেদের মতো করে সব পরিস্থিতি উত্তরণের চিন্তাভাবনা করছে। প্রয়োজনে বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা অবস্থায় আগাম নির্বাচনও দেয়া হতে পারে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.