স্বজনদের আহাজারি, ইনসেটে সোনিয়া
স্বজনদের আহাজারি, ইনসেটে সোনিয়া

এনায়েতপুরে স্বামীর দেয়া আগুনে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর করুণ মৃত্যু

থানায় মামলা : স্বামী ও শ্বশুর বাড়ির লোকজন পলাতক
রফিক মোল্লা, চৌহালী (সিরাজগঞ্জ)

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার রূপনাই গ্রামের তাঁতশ্রমিক আব্দুল খালেকের মেয়ে ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা সোনিয়া খাতুন (২০) স্বামীর দেয়া আগুনে পুড়ে অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।

মঙ্গলবার দুপুরে পারিবারিক কলহের জের ধরে পাষণ্ড স্বামী তাঁতশ্রমিক জাহাঙ্গীর হোসেন (২৪) গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে সোনিয়াকে। মূমুর্ষ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে এনায়েতপুর খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়। কিন্তু অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় বাড়িতেই রাখা হয়। রাতে অবস্থার আরো অবনতি হলে তাকে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১টার দিকে মারা যায়।

সোনিয়ার মা নূরুন্নাহার খাতুন ও বাবা আব্দুল খালেক জানান, পারিবারিক কলহের জেরে গত ৪ দিন ধরে সোনিয়ার স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়ি বেধড়ক মারপিট করে নির্যাতন করে আসছিল। এর এক পর্যায়ে গত সোমবার তার মামা-মামী উদ্ধার করে বাপের বাড়ি রূপনাই রেখে আসে। মঙ্গলবার সকালে জাহাঙ্গীর গোপন কথা বলার নাম করে মোবাইল ফোনে সোনিয়াকে ডেকে পাঠায়। ওই দিন দুপুরে সোনিয়াকে তার গোপালপুর বটতলার মামার বাড়ি থেকে প্রায় ৭০ গজ দূরে স্থানীয় একটি মাদরাসার পাশের চাপা গলিতে ডেকে নিয়ে যায়।

বোরকা পরিহিত সোনিয়ার সাথে তার স্বামী জাহাঙ্গীর কথা বলার এক ফাঁকে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।

এ সময় সোনিয়ার সমস্ত বোরকায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে মুখ-মন্ডল, হাত-পাসহ শরীরের ৯০ ভাগ পুড়ে যায়। তার দুই চোখ আগুনে পুড়ে গলে যায়। নাক ও জিহ্বার ৮০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মঙ্গলবার রাত সোয়া ৭টার দিকে গোপালপুরে সোনিয়ার মামার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অর্থাভাবে তাকে বিনা চিকিৎসায় একটি ঘরের মেঝের মধ্যে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সে বাঁচার আকুতি জানিয়ে চিৎকার করছে। তার স্বজনেরা অর্থের জোগার করতে না পেরে তাকে ঘিরে অসহায়ের মতো বসে অঝোর ধারায় কাঁদছে। রাত ১০টার দিকে তার অবস্থার আরো অবনতি হলে তাকে সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে তার করুণ মৃত্যু হয়।

সোনিয়ার নানা আব্দুর রউফ জানান, ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো এক ফাগুনে রূপনাই কান্দিপাড়া এলাকার তাঁতশ্রমিক আব্দুল খালেকের মেয়ে সোনিয়ার গোপালপুর বটতলা গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের তাঁতশ্রমিক ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর থেকে সোনিয়াকে তার স্বামী জাহাঙ্গীর, শ্বশুর ও শাশুড়ি বিভিন্ন অজুহাতে কথায় মারপিট করে নির্যাতন করে আসছিল। এ নিয়ে একাধিকবার দেন-দরবারও হয়েছে। এরই জের ধরে এদিন সোনিয়ার গাঁয়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে ওই রাতেই তার করুণ মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নিহতর মা নূরুন্নাহার খাতুন বাদী হয়ে সোনিয়ার স্বামী জাহাঙ্গীর হোসেন, শ্বশুর, শাাশুড়িসহ ৪ জনকে আসামি করে এনায়েতপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানান।

তবে এনায়েতপুর থানার ওসি রাশেদুল ইসলাম বিশ্বাস বলেন, শুধু সোনিয়ার স্বামী জাহাঙ্গীরকে একমাত্র আসামি করে মামলা করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

এদিকে গতকাল বুধবার দুপুরে সোনিয়ার মামার বাড়ি গোপালপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। গ্রামবাসী সোনিয়া হত্যার বিচার দাবিতে ফুঁসে উঠেছে। গ্রামে শোকের মাতম চলছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.