সন্তানের পরীক্ষার টেনশনে
সন্তানের পরীক্ষার টেনশনে

সন্তানের পরীক্ষা, টেনশনে মরেন মা-বাবা

মেহেদী হাসান

ভাই আমি নাই। আমি শেষ। সন্তানের পরীক্ষার টেনশনে মরে যাচ্ছি। ঠিকমতো মরতে পারব কি না তা-ও জানি না। কারণ মরার আগে মনে হয় পাগল হয়ে যাব। আমার দুই ছেলে পরীক্ষার্থী এবার। একজন পঞ্চম শ্রেণীতে আরেকজন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ছে। তাদের পরীক্ষা নিয়ে টেনশনে আমি ও আমার স্ত্রী শেষ হয়ে যাচ্ছি। জানুয়ারির এক তারিখ থেকে তাদের নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছি।

সন্তানের লেখাপড়া, পরীক্ষা নিয়ে অভিভাকদের অবস্থা কেমন জানতে চাওয়ায় সাইদুর নামে একজন অভিভাবক এভাবেই শুরু করলেন তার কথা। কথার শুরুতেই সাইদুর তার দুই হাত মাথায় তুলে এগিয়ে আসেন এ প্রতিবেদকের দিকে। তিনি বলেন, দুঃখের কথা কিভাবে বলব ভাই। এর কোনো শেষ নেই। এই সমাপনী আর জেএসসি পরীক্ষা আমাদের জীবন পানি করে দিচ্ছে।

সাইদুরের দুই ছেলে রাজধানীর বনশ্রীর নামকরা একটি স্কুলে পড়ছে। তিনি বলেন, দুই ছেলের প্রত্যেকেই দু’টি করে কোচিংয়ে যায়। সব বিষয়ে তারা কোচিং কাস করে। কোচিং বাবদ মাসে সাড়ে আট হাজার টাকা খরচ হয় দুইজনের পেছনে। বড় ছেলের জন্য বাসায় একজন শিক্ষক রেখেছি। মাসে পাঁচ হাজার টাকা। দুই ছেলের জন্য আছে ধর্মীয় শিক্ষক। মাসে দুই হাজার টাকা। এ ছাড়া স্কুলের একেকজনের বেতন ১১ শ’ টাকা। এভাবে শুধু দুই ছেলের পেছনে মাসে খরচ হয় ১৭ হাজার ৭০০ টাকা। এর পাশাপাশি যাতায়াত, টিফিন, খাতা-কলমসহ আছে আরো অনেক খরচ তাদের পেছনে। মাসে কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা শুধু দুই ছেলের পড়ার খরচ। বোঝেন অবস্থা। তারপরও শান্তি নাই।

ব্যবসায়ী সাইদুর জানান, সকাল সাড়ে ৬টায় আসেন ধর্মীয় শিক্ষক। এরপর কোনোমতে খাওয়া-দাওয়া করে ৯টায় যায় কোচিংয়ে। কোচিং চলে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। ১২টায় শুরু হয় স্কুল। ছেলেরা সকালে কোচিংয়ের ব্যাগ নিয়ে যায় কোচিংয়ে। আমার স্ত্রী ১১টায় বাসা থেকে দুইজনের স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বের হয় কোচিংয়ে। সেখানে তাদের কাছ থেকে কোচিংয়ের ব্যাগ নিয়ে স্কুলের ব্যাগ দিয়ে স্কুলে পাঠায় সে। স্কুল ছুটি হয় সাড়ে ৫টায়।

সাইদুর বলেন, ছেলেদের পড়াশুনার কারণে পারিবারিক-সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রম বাদ দিয়েছি আমরা। গত দুই মাসে আমি ৩২ দিন গ্রামের বাড়ি থেকেছি। আমাদের পরিবার অনেক বড়। প্রতি বছর শীতে সবাই বাড়িতে একত্র হই। একসাথে সবাই অনেক দিন থাকি। আনন্দ করি। কিন্তু এবার আমি ৩২ দিন তাদের সাথে বাড়িতে থাকলেও ছেলেদের সাথে নিতে পারি নাই তাদের পড়ার ক্ষতি হবে বলে। ঢাকায় আমার অনেক আত্মীয়স্বজন আছে। সবাইকে বলে দিয়েছি আমি কারো বাসায় যেতে পারব না। আমার বাসায়ও তারা না এলে ভালো হবে। সবাইকে বলে দিয়েছি- দুই ছেলের পরীক্ষা নিয়ে খুব ঝামেলায় আছি।

সাইদুর আফসোস করে বলেন, এত কিছু করার পরও আমি নিশ্চিত নই যে, আমার ছেলেরা জিপিএ ৫ পাবে। কারণ পড়ালেখার কোনো আগামাথা বুঝি না। এর চেয়ে সারা দিন বেত দিয়ে পেটালে মনে হয় ভালো হতো। এ কেমন পড়ালেখা। সব কেমন যেন অদ্ভুত! বই শুধু কঠিনই করেনি, খুবই অদ্ভুত। এত ছোট ছেলেরা এত কঠিন পড়া কিভাবে শিখবে? বাধ্য হয়েছি কোচিংয়ে দিতে, বাসায় শিক্ষক রাখতে।

সন্তানদের পড়ালেখা নিয়ে সামাজিক প্রতিযোগিতা বিষয়ে সাইদুর বলেন, জিপিএ ৫ না পেলে মানসম্মান কিছু থাকবে না গ্রামে পরিচিত লোকজন ও আত্মীয়স্বজনের কাছে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। ছেলেরা যদি জিপিএ ৫ না পায় তাহলে মানসম্মান থাকে কী করে বলেন। আমার বাসার সামনের চায়ের দোকানদারের ছেলেও জিপিএ ৫ পেয়েছে এবং তা সে সবাইকে বলে বেড়াচ্ছে ঢাকঢোল পিটিয়ে। গ্রামের অনেক সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েরা জিপিএ ৫ পাবে, বৃত্তিও পাবে। গ্রামে শিক্ষার্থী অনেক কম। প্রতিযোগিতাও কম। এখন এ অবস্থায় আমাদের ছেলেরা যদি ভালো রেজাল্ট না করে তাহলে মানসম্মান থাকে কী করে আপনিই বলেন।

সাইদুর বলেন, যদিও জানি সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষার সনদের বাস্তবে কোনো মূল্য নেই। কেউ দেখেও না। কোথাও কাজেও লাগবে না। কিন্তু তারপরও পাবলিক পরীক্ষার কারণে আজ এটা আমাদের এত অস্থিরতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, কোচিং, স্কুলে রয়েছে নানা ধরনের হয়রানি। পঞ্চম শ্রেণী পড়–য়া ছোট ছেলেকে কোচিংয়ে ভর্তি করানোর দুই দিন পর বলে সে কোচিংয়ে যাবে না। কেন যাবে না জিজ্ঞেস করায় কোচিংয়ের একজন শিক্ষক সম্পর্কে সে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলল, ওটা কি শিক্ষক না মদন? কেন মদন জানতে চাইলে সে অভিনয় করে দেখায় কোচিং কাসে এসে শিক্ষক কী করে। শিক্ষক কাসে এসে চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে। এরপর মোবাইল টেপাটিপি শুরু করে। কারো দিকে না তাকিয়ে বলে, এই পড়াটা লিখে নিয়ে আয়। সে থাকে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকানো। তারপর লেখা জমা দিলে খাতা না দেখেই টিক মার্ক দিয়ে দেয়। এরপর গাইড দেখে বলে কাল এই পড়াটা তৈরি করে নিয়ে আসিস। এভাবেই শেষ হয় ক্লাস।

পরে ওই কোচিং বাদ দিয়েছি। এভাবে আছে স্কুলের বিরুদ্ধেও অসংখ্য অভিযোগ। ছোট ছোট শিশুরাই বলে শিক্ষক কাসে ভালো পড়াতে পারে না। কোথায় যাব বলেন ভাই?

সাইদুর খুবই হতাশা আর আতঙ্ক নিয়ে বলেন, সন্তানদের পরীক্ষার টেনশনে আমরা পাগলপ্রায়। আমার স্ত্রীকে বলে দিয়েছি বাসায় রান্নাবান্না করতে পারলে কর, না পারলে কোনো আপত্তি নেই। ঘরসংসার গোছানো থাকল কি না থাকল তা নিয়েও চিন্তা নেই। কিন্তু ছেলেদের পড়ার কোনো ক্ষতি হতে পারবে না। এ অবস্থায় চলছে আমাদের জীবন। শুধু সন্তানদের এ পাবলিক পরীক্ষার কারণে আজ আমাদের জীবনে এত অস্থিরতা আর হতাশা নেমে এসেছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.