নারী দিবস

আমি চাই সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে : নুরুন্নাহার বেগম, শ্রেষ্ট কৃষাণী

সাক্ষাৎকার : আঞ্জুমান আরা বেগম

কৃষাণী, তা-ও আবার দেশের শ্রেষ্ঠ কৃষাণী। নাম নুরুন্নাহার বেগম। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানাধীন সলিমপুর (বখতারপুর) গ্রামের মেয়ে। ছিপছিপে সাদা সুন্দর মুখশ্রীর নুরুন্নাহারের ছেলেবেলার অধিকাংশ সময় কেটেছে নানাবাড়িতে। বাবা আবদুুল গফুর মোল্লা ছিলেন একজন গরিব তাঁতি। কাপড় বুনেই তার সংসার চলত। কিন্তু মেয়ে একটু বড় হতেই বিয়ে দিতে হলো এক গরিব কৃষকপরিবারে। স্বামী রবিউল ইসলাম তখন বেকার। বিয়ের রাতেই নুরুন্নাহারের শাশুড়ি একটি খালি চালের বস্তা আর একটি ১০ ইঞ্চি ইট হাতে দিয়ে বললেন, ‘মাগো তোকে আমি ঘুমানোর জন্য এর বেশি কিছু দিতে পারলাম না।’ সদ্য বিবাহিত ছোট্ট সুন্দরী কিশোরী নুরুন্নাহারের দু’চোখ বেয়ে শুধু তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ভেবেছিলেন বিয়ে হলে বুঝি ুধা আর তৃষ্ণা তাকে তাড়া করে ফিরবে না। বিয়ের পর এক বছর তিনি অভাবের সাথে যুদ্ধ করলেন। তারপর ছোটবেলার শিক্ষা মায়ের সাথে গাছ লাগানো, হাঁস-মুরগি পালন, মাছ ধরা এসব নিয়ে ভাবতে লাগলেন এবং যে কথা সেই কাজ। শুরুও করলেন কৃষিকাজ মাত্র ৬০০ টাকায়। তিন বছরের জন্য ১০ কাঠা জমি লিজ নিলেন আর ব্র্যাক ব্যাংক থেকে দুই হাজার টাকা ুদ্রঋণ নিয়ে শুরু হলো নুরুন্নাহারের কৃষিকাজের যাত্রা। শুরুটা ছিল ১৯৯২ সালে। প্রথম তিন মাসের মাথায় ফসল ঘরে তুলে তা বিক্রি করে লাভ হলো ৪০ হাজার টাকা। সেই টাকা দিয়ে কৃষিকাজের বিস্তৃতি বাড়াতে লাগলেন। পেঁয়াজ, শাকসবজি, আলু, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেয়ারা, নারকেল, বাউকুল, হাঁস-মুরগি, ধান, গমসহ কৃষির এমন কোনো সেক্টর নেই যা তিনি করেননি। সব সেক্টরেই তার হাতে সোনা ফলেছে। এরই মধ্যে বড় ছেলে রায়হান কবিরের জন্ম হয়। মাত্র সাড়ে তিন বছরের ছোট রায়হানও মায়ের হাত ধরে গাছে পানি দেয়া, ছোট্ট আগাছা পরিষ্কার করাসহ নানা কাজে মাকে সাহায্য করত। পাশাপাশি পড়াশোনা চালাত। রায়হান বর্তমানে ঢাকার ডেফোডিল ইউনিভার্সিটিতে ষষ্ঠ সেমিস্টারে অধ্যয়নরত। এখনো মায়ের সার্বক্ষণিক কৃষকযোদ্ধা ছেলে মাকে ছায়ার মতো আগলে রাখেন। স্বামী রবিউলও একই তালে স্ত্রীর সহযোগী হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তা না হলে এত দূর আসা সম্ভব ছিল না। নুরুন্নাহারের হাতে ছিল সোনার কাঠি। তিনি যেটাতেই হাত দিয়েছেন, তাতেই সোনা ফলেছে। হাঁস-মুরগি দিয়ে শুরু করে পোলট্রি ফার্মেও বাম্পার ফলন হলো। হাজার হাজার হাঁস-মুরগি দিয়ে খামার তৈরি হলো। কর্মসংস্থান হলো শত শত পরিবারের। প্রথমে একটা গরু দিয়ে শুরু করেন ডেইরি ফার্ম। তা ২০০ ছাড়িয়ে গেল, গ্রামের মানুষের দুধের চাহিদা মেটালো। তারপর গরু-ছাগল ও হাঁস-মুরগির বর্জ্য দিয়ে তিনি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট তৈরি করে গ্রামে গ্যাসের চাহিদাও মেটালেন। সব কিছুতেই নুরুন্নাহারের অবদান যেন চার দিকে জয়জয়কার। তা দেখে কৃষি বিভাগ তাকে ১৯৯৫ সালে শ্রেষ্ঠ কৃষক হিসেবে সরকারি পুরস্কারে ভূষিত করল। সেই প্রাপ্তি তাকে আরো উৎসাহিত করল। কৃষিকাজ প্রসারের জন্য সরকারি অনুদান পেলেন, ঋণ নিলেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। তা দিয়ে কৃষি ট্রেনিং সেন্টার করলেন। প্রতিদিন তার জমিতে ৫২ জন কৃষক ও ১৬ জন কৃষাণী কাজ করেন। ‘নুরুন্নাহার ডেইরি ফার্ম’ থেকে শত শত লিটার দুধ চলে যায় বিভিন্ন জায়গায়। তা দিয়ে তৈরি হয় দই, মিষ্টি আর মেটানো হয় দুধের চাহিদা। ২০০৯ সালে নুরুন্নাহার পান সিটি ব্যাংক অ্যাওয়ার্ড, ২০১০ ও ২০১২ সালে পান বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক। ব্যাংক এশিয়া ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পান শ্রেষ্ঠ কৃষকের পদক, মাছরাঙা টিভি থেকে পান রাঁধুনী কীর্তিময় নারী পদক। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগের শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন সমাজসেবামূলক কাজ করার জন্য। সরকারি-বেসরকারি ২৮টি পুরস্কারে তার ঘর ভরে গেছে। পাশাপাশি চারজন সোনার টুকরা ছেলের গর্বিত মাÑ যারা তাকে সাহায্য করছে ছায়ার মতো।
নুরুন্নাহার এ বছর কওই পুরস্কার পেয়েছেন। এবারো ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু কৃষি পদকে ভূষিত হয়েছেন। তার অবদানে প্রধানমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রী অত্যন্ত স্নেহের আসনে বসিয়ে রেখেছেন; যারা তাকে বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যমণি হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
একজন অত্যন্ত সাধারণ অশিক্ষিত নারী কিভাবে এত দূর আসতে পারেন তা বিস্ময়কর। কারণ, শিক্ষা শুধু বইয়ে নয়, মানুষের মগজেই তা বিচরণ করে। তা না হলে নুরুন্নাহারের মতো নারীদের জন্ম হতো না। তার মাধ্যমে আজ ৫২টি কৃষক পরিবার স্বনির্ভর, ১৬টি নারী পরিবার নির্মল সূর্যের আলোর পথ দেখছে। পাশাপাশি নুরুন্নাহার তার ভাইয়ের ছেলে ও বোনের দুই সন্তানকে মেডিক্যালে পড়াচ্ছেন। ভাইবোনদের পরিবারকেও স্বনির্ভর করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোনো তরুণ-তরুণীকে টাকা দিয়ে সাহায্য করার চেয়ে কাজ শিখিয়ে সাহায্য করা ভালো। কারণ, কাজই তাকে সৌভাগ্যের সিঁড়ি দেখিয়ে দেবে। তিনি মনে করেন, কর্মই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। যে নারীর এক টুকরো জমি ছিল না, সেই নারী এখন ২০-২২ বিঘা জমির মালিক ছাড়াও ১৫০ বিঘা জমিতে তার কর্মিবাহিনী প্রতিদিন কাজ করছে নিরলসভাবে।
ফলাচ্ছে সোনার ফসল। নুরুন্নাহার বর্তমানে ‘জয় বাংলা নারী উন্নয়ন সমিতি’ নামে একটি এনজিও করেছেন। সেখানে এক হাজার ২০০ নারীকে তিনি কৃষি ট্রেনিং দিচ্ছেন। বিষমুক্ত ফসল উৎপাদন, কীটনাশকমুক্ত সবজি উৎপাদনসহ নানা ধরনের কৃষিশিক্ষা দিয়ে থাকেন। হাঁস-মুরগি, ভেড়া, ছাগল-গরু পালন পদ্ধতিও তিনি শিক্ষা দিয়ে থাকেন। দুঃখভরা মন নিয়ে তিনি জানালেন, সবাই বলে কৃষক নাকি এ দেশের প্রাণ। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে; কিন্তু বাস্তব জীবনে কৃষক হচ্ছেন সবচেয়ে অবহেলিত। আমার মতো দু-একজন কৃষককে সম্মান দিলে তো হবে না, বাংলাদেশের সব কৃষককেই প্রাপ্ত সম্মান দিতে হবে; মূল্যায়ন করতে হবে তার কাজের। কারণ, কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা উৎপাদন করেন, তা খেয়েই দেশের খাদ্যের অভাব পূরণ হয়। কৃষক এত কষ্ট করে ফসল উৎপাদন করলেও তার সঠিক মূল্য পান না। কৃষকের ফসল বিক্রি করতে না পারলে তা নষ্ট হয়ে যায়। তাই কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করার জন্য কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠাসহ কৃষিকাজে ইন্টারেস্ট আছে, এমন লোকের মাধ্যমে কৃষিপণ্য বিক্রি করে সঠিক মূল্য কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। তাহলে কৃষকের মুখে হাসি ফুটবে। আমি চাই, এ ব্যাপারে সরকারের সুদৃষ্টি ও পৃষ্ঠপোষকতা। নুরুন্নাহার বর্তমানে কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের একজন সদস্য। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি চান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় নারী কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে, যাতে গ্রামের একজন নারীও বেকার না থাকেন। সবাই যেন খেয়েপরে সুখে-শান্তিতে বাঁচতে পারেন আর চান গ্রামে একটি হাসপাতাল করতে, যেখানে গরিব কৃষক পরিবার বিনাপয়সায় চিকিৎসাসেবা পেতে পারে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চান নিরলসভাবে দেশের জনগণের জন্য কাজ করতে। সমৃদ্ধশালী সুস্থ সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.