নারী দিবস

সব কাজেই সমাজের প্রতি কমিটমেন্ট থাকতে হবে : নাজমুন নাহার নাজনীন, অনলাইন উদ্যোক্তা

সাক্ষাৎকার : রুমা ইসলাম

নাজমুন নাহার নাজনীন (মিমি) একজন মহিলা উদ্যোক্তা। ২০০৮ সালের কথা, দুই বান্ধবী তামান্না ইয়াসমিন লোপা ও মিমি ব্লক-বাটিক, এমব্রয়ডারির তৈরি মেয়েদের সালোয়ার-কামিজের ব্যবসা শুরু করেন নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের মধ্যে। মূল পুঁজি ছিল পাঁচ হাজার টাকা। সময়ের বিবর্তনে ব্যবসা কিছুটা বড় হলো, কিন্তু দু’জনের বাসস্থানের দূরত্বের কারণে আর একসাথে হয়ে উঠল না। ছোট সন্তানদের দেখভালের জন্য স্বামী-সংসার সব মিলিয়ে ব্যবসা কিছুটা স্তিমিত হয়ে গেল। মাঝখানে প্রায় ছয়-সাত বছর কিছুই করা হয়নি। তারপর মিমির দুই মেয়ে জান্নাত ও আদিনা বড় হলে এক বছর ধরে নতুন ধারায় নতুন আঙ্গিকে নতুন ধরনের বোরকা সেলাই করে পর্দানশিন ফ্যাশন সচেতন মেয়েদের মধ্যে বোরকা পরার আগ্রহ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়েছেন। মিমির এই ব্যবসার মূল উৎসাহদাতাদের মধ্যে মা মাজেদা হোসেন, স্বামী কামরুল হাসান লিংকন (ব্যাংকার), দেবর ডা: রাশেদুল হাসান (লন্ডন প্রবাসী) ও বড় দুই বোন মেরিনা নাজনীন ও মৌসুমী নাজনীন, আত্মীয়স্বজন, মানারাত ঢাকা ইন্টা. স্কুলের মায়েরা। যারা মিমিকে নিত্যনতুন ডিজাইনের বোরকা পরতে দেখে অর্ডার করতে থাকেন, পাশাপাশি মেয়ের আর্ট স্কুলের (রংধনু আর্ট একাডেমি) মা-বোনেরা। মিমির বোরকার ডিজাইন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম, যা অন্য মার্কেটে ডুপ্লিকেট কপি নেই। মূল্যও রিজনেবল, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। একজন সদ্যকিশোরী অথবা তরুণী তার সালোয়ার-কামিজ না বানিয়ে অনায়াসে এই বোরকা পরতে পারেন হিজাব দিয়ে। এতে তার পর্দাও রক্ষা হবে; অন্য দিকে ফ্যাশনও ঠিক থাকবে। আজকাল হিজাবি মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। তার নতুন ফ্যাশন হাউজের নামÑ An najah fashion অনলাইন পেজ- https/www. facebook.com/ annajah-তে কিক করলেই নানান ডিজাইনের বোরকা দেখা যাবে।
মিমি মূলত অনলাইনেই ব্যবসা করেন। তিনি বিভিন্ন মেলায় নিজের প্রডাক্ট নিয়ে বসে যান। এতে তার ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। এক একটা মেলায় তার সেল হচ্ছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। দেশের বাইরেও এর চাহিদা প্রচুর। তাই রাতদিন খেটে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ঘর যেহেতু শাশুড়ির তত্ত্বাবধানে সুন্দরভাবে চলছে, তাই মিমির কাজ করতে তেমন অসুবিধা হচ্ছে না। তবে নিজ বাসার আশপাশে একটা স্থায়ী শোরুম নিতে পারলে ভালো হতো। এতে কারিগরদের কাজের ইন্সট্রাকশন দেয়া, শোরুমে সময়-অসময়ে ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুললে ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি পেত। কিন্তু এতে প্রচুর মূলধন প্রয়োজন, যা মিমির নেই। তার পরও যা লাভ হয় তা দিয়ে নতুন কাপড় কিনে নতুন নতুন বোরকা বানিয়ে সেল করছেন।
ইডেন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে (বাজার) প্রথম ব্যাচ অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলায় পুতুলের শাড়ি কাপড়ে ডিজাইন আর ছবি আঁকার দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে পড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি, কিন্তু শিল্পচর্চা থেমে থাকেনি। দুই মেয়ে জান্নাত ও আদিনা শিশু আঁকিয়ে হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেছে, যা মিমির স্বপ্নের ফসল।
মিমি মনে করেন, কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনকে সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য নতুন প্রজন্মের নারীদের কর্তব্যপরায়ণ, সৎ, ডিসিপ্লিনড, পাংকচুয়াল ও ক্রিয়েটিভ হওয়া দরকার। সার্বিকভাবে বিনয়ী হওয়া এবং কাজের প্রতি কমিটমেন্ট থাকা জরুরি। কাজের পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার সুন্দর মানসিকতা থাকতে হবে এবং চার পাশের পরিবেশ বুঝে অগ্রসর হতে হবে। অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা থাকা দরকার। একা বড় হলে সুখ নেই বা লাভ নেই, সবাইকে সাথে নিয়ে বিশেষ করে আশপাশের সবাইকে উন্নত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার চেষ্টা ও মানসিকতা থাকা দরকার। নতুন প্রজন্মের জন্য আমাদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা শিক্ষিত ও যোগ্য কর্মী হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং তাদের মেধার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পেয়ে আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেড়ে উঠতে পারে।
তিনি আরো বলেনÑ আমি নারীকে নারী হিসেবে নয়, ব্যক্তি হিসেবে দেখতে চাই। একজন নারী কর্মজীবনে প্রবেশের সময় তাকে অনেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। একজন নারীকে সফলভাবে কাজ করতে গেলে পরিবারের সহযোগিতা বিশেষভাবে প্রয়োজন; তা না হলে তার সাফল্য অসম্ভব। আমার বোরকার কাপড়ের কোয়ালিটি খুবই ভালো। ডিজাইন আমার একদম নিজের ক্রিয়েট করা। তাই অন্যান্য বোরকার চেয়ে এর গেটআপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুতরাং অনলাইনে আমার ক্রেতা ‘আলহামদুলিল্লাহ’ খুব ভালো। মানুষ এখন কোয়ালিটি বিচার করার ক্ষমতা রাখে, তাই আমার ক্রেতারাও রুচিশীল।
নতুন প্রজন্মের নারীদের উদ্দেশে কিছু বলতে গিয়ে তিনি জানানÑ প্রত্যেক নারীর জন্য যে বিষয়টি সবচেয়ে জরুরি তা হচ্ছে নিজেকে প্রস্তুত করা এবং অর্থনৈতিকভাবে নিজেকে স্বাধীন করা। কোনো বাধাকে বাধা হিসেবে নেয়া ঠিক নয়, বরং বাধাকে জয় করার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে জয় করতে হবে এবং সেখানেই কৃতিত্ব। সাফল্যের পথে নারী-পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই পরস্পরের প্রতি ইগো ইস্যু দেখা যায়। এটাকে অবশ্যই অ্যাভয়েড করতে হবে।
কর্মজীবনে শর্টকাট বলে কোনো কথা নেই। সব কাজেই সমাজের প্রতি কমিটমেন্ট থাকতে হবে। নয়তো কার জন্য কাজ হবে? ভালোবেসে কাজ করলে কাজে তৃপ্তি পাওয়া যায়। ৮ মার্চ নারী দিবস নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেনÑ আলাদা করে নারী দিবস পালন করার কোনো যুক্তি নেই; বরং নারীকে মানুষ হিসেবে এগিয়ে আসার পথ প্রশস্ত করা বাঞ্ছনীয়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.