আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও সিগমার গাব্রিয়েল
আঙ্গেলা ম্যার্কেল ও সিগমার গাব্রিয়েল

পদ হারাতে চলেছেন জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় মন্ত্রী?

নয়া দিগন্ত অনলাইন

সবকিছু ঠিকমতো চললে আগামী ১৪ মার্চ চতুর্থবারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ নিতে চলেছেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল৷ সে দিনই মন্ত্রিসভার বাকি সদস্যদেরও শপথ নেয়ার কথা৷ গত সপ্তাহেই ম্যার্কেল সিডিইউ দলের মন্ত্রীদের তালিকা পেশ করেছিলেন৷ সোমবার বাভেরিয়ার সিএসইউ দলও তাদের বরাদ্দ পদগুলোর জন্য তালিকা প্রকাশ করেছে৷ এবার সবার নজর এসপিডি দলের দিকে৷ চলতি সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে বলে দলের এক নেতা জানিয়েছেন৷ বেশ কয়েকটি পদে নাম স্থির করা হলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে৷

এদিকে সরকারে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশে স্বস্তি আনলেও কিছুতেই জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে না এসপিডি দল৷ সর্বশেষ জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী মাত্র ১৫ শতাংশ ভোটার এই দলের প্রতি আস্থা রাখেন৷ অর্থাৎ, গত সপ্তাহের তুলনায় ০ দশমিক ৫ শতাংশ সমর্থন হারিয়েছে এসপিডি৷

এই দলের পক্ষে অস্বস্তির আরেকটি কারণ বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গাব্রিয়েলের বিপুল জনপ্রিয়তা৷ এসপিডি দলের মধ্যে কোণঠাসা এই নেতাকে নতুন সরকারেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার৷ এসপিডি সমর্থকদের মধ্যে ৭৪ শতাংশেরও সেটাই ইচ্ছা৷ এসপিডি নেতৃত্বের পক্ষে সেই ইচ্ছা মেনে নেয়া এ মুহূর্তে কার্যত অসম্ভব৷ এদিকে চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ইউনিয়ন শিবিরের প্রতি ভোটারদের আস্থা সামান্য বেড়ে ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে৷

জার্মানির নতুন মন্ত্রিসভায় অর্ধেকই নারী হতে পারেন, এমন সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠলেও সিএসইউ দল সেই পথে যাচ্ছে না৷ ম্যার্কেল নিজের দলের মন্ত্রী তালিকায় সাম্য এনেছেন৷ এসপিডিও সেরকম ইঙ্গিত দিয়েছে৷

সরকার গঠনের আগেই দুই শিবিরের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে৷ সিডিইউ সংসদীয় দলের উপনেতা রাল্ফ ব্রিংকহাউস এসপিডি দলকে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন৷ তিনি বলেন, গত সরকারের কার্যকালে অর্থমন্ত্রী ভল্ফগাং শয়েবলে বাজেট ঘাটতি দূর করে যে সাফল্য অর্জন করেছেন, নতুন সরকারকেও তা ধরে রাখতে হবে৷ অতএব, ইউরোপসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে কোয়ালিশন চুক্তির বাইরে গিয়ে কোনো বাড়তি ব্যয় মেনে নেওয়া হবে না৷

জার্মানির আগামী সরকারের সদস্যরা
আঙ্গেলা ম্যার্কেল
চতুর্থ বারের মতো জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে শপথ নেবেন আঙ্গেলা ম্যার্কেল (৬৩)৷ গত কয়েক মাসে একাধিক সংকট কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পেরেছেন তিনি৷ তবে তাঁর অবস্থান আগের তুলনায় কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে৷ কোয়ালিশন চুক্তি অনুযায়ী কার্যকালের মাঝামাঝি সময়ে পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে৷ সম্ভবত তখনই ম্যার্কেল-এর ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হয়ে যাবে৷

সিগমার গাব্রিয়েল
বিদায়ী জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও এসপিডি নেতা সিগমার গাব্রিয়েল (৫৯) জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক হলেও নিজের দলে প্রবল বিরোধিতার মুখে৷ ফলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজ চালিয়ে যাবার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ৷ মার্টিন শুলৎস রাজনীতির আঙিনা থেকে বিদায় নেবার পর এই গুরুত্বপূর্ণ পদে কার নাম ঘোষণা করা হবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়৷

হর্স্ট সেহোফার
বাভেরিয়ার সিএসইউ দলের শীর্ষ নেতা হর্স্ট সেহোফার-ও (৬৩) নিজের দলে বেশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন৷ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা আগেই হয়েছিল৷ এবার প্রস্তাবিত সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে চলেছেন তিনি৷ তবে তার অধীনে মন্ত্রণালয়ের নাম বদলে ‘স্বদেশ’ রাখা হবে৷ অভিবাসনের প্রশ্নে দলের কড়া অবস্থানের প্রতিফলন ঘটাতে চান সেহোফার৷

ওলাফ শলৎস
শহর-রাজ্য হামবুর্গের মুখ্যমন্ত্রী ও এসপিডি দলের নেতা ওলাফ শলৎস (৫৯) নতুন সরকারে অর্থমন্ত্রী হতে পারেন৷ সেইসঙ্গে ভাইস-চ্যান্সেলরের আলঙ্কারিক পদেও তিনি থাকবেন৷ শান্ত স্বভাবের ধীর-স্থির এই মানুষটিকে ঘিরে দেশে-বিদেশে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল দেখা যাচ্ছে৷ বিগত সরকারের বাজেট-ঘাটতি দূর করার সাফল্য ধরে রেখে তাঁকে বেশ কিছু কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হবে৷

পেটার আল্টমায়ার
সরকার গঠিত হলে সিডিইউ দলের মধ্যে চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন নেতা পেটার আল্টমায়ার (৫৯) অর্থনীতি ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী হবেন৷ বিগত সরকারে তিনি চ্যান্সেলরের দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন৷ সিডিইউ দলের মন্ত্রীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় তাঁর গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে৷

উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন
মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবেই থেকে যাবেন সিডিইউ দলের নেত্রী উরসুলা ফন ডেয়ার লাইয়েন (৫৯)৷ ম্যার্কেলের উত্তরসূরি হিসেবে তার নাম বারবার উঠে এলেও এখনো সেই ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না৷ ইংরাজি ও ফরাসি ভাষায় পারদর্শী এই নেত্রী আন্তর্জাতিক মঞ্চে যথেষ্ট পরিচিত৷

ইয়েন্স স্পান
তরুণ নেতা ও ম্যার্কেল-এর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইয়েন্স স্পান (৩৭) নতুন সরকার গঠিত হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবেন৷ মন্ত্রিসভায় তাঁকে অন্তর্গত করার জন্য প্রবল চাপ ছিল৷ মাত্র ২২ বছর বয়সে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি৷ ২০১৫ সাল থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি৷

হাইকো মাস
এসপিডি দলের নেতা হাইকো মাস (৫১) বিগত সরকারে আইন ও বিচারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ নতুন সরকার গঠিত হলে তিনি শ্রম ও সামাজিক কল্যাণ মন্ত্রী হতে পারেন৷ এসপিডি দলের মধ্যে অপেক্ষাকৃত তরুণ এই নেতার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কদর রয়েছে৷

গ্যার্ড ম্যুলার
আগামী সরকারেও উন্নয়ন সাহায্য মন্ত্রী থাকছেন সিএসইউ দলের গ্যার্ড ম্যুলার (৬৩)৷ নিজের বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী এই মন্ত্রী উন্নয়ন সাহায্যের ক্ষেত্রে বিশ্বমঞ্চেও যথেষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছেন৷ বিশেষ করে আফ্রিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার পরিকল্পনা প্রশংসা কুড়িয়েছে৷ বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন৷

আন্দ্রেয়াস শয়ার
সিএসইউ দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর এবার নতুন মন্ত্রিসভায় পরিবহণমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন আন্দ্রেয়াস শয়ার (৪৪)৷ ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি পরিবহণ মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন৷

এফা হ্যোগেল
নতুন মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ হিসেবে দেখা যেতে পারে এসপিডি সংসদীয় দলের বর্তমান উপ-প্রধান এফা হ্যোগেল-কে (৪৯)৷ হাইকো মাস-এর কাছ থেকে বিচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি তিনি ভোক্তা সুরক্ষা দপ্তরেরও ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হতে পারেন৷

কাটারিনা বার্লে
এসপিডি নেত্রী কাটারিনা বার্লে (৪৯) নতুন সরকারেও পরিবার, বয়স্ক, নারী ও তরুণ প্রজন্মের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে থেকে যেতে পারেন৷ ব্রিটিশ বাবার সুবাদে তার সে দেশের নাগরিকত্বও রয়েছে৷ ফলে প্রস্তাবিত সরকার তিনিই হবেন একমাত্র বিদেশি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি৷ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় রয়েছে৷

আনিয়া কারলিচেক
নতুন সরকার গঠিত হলে শিক্ষামন্ত্রী হবেন সিডিইউ দলের নেত্রী আনিয়া কারলিচেক (৪৬)৷ ২০১৩ সাল থেকে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ সংসদে দলের চিফ হুইপ হিসেবে সক্রিয় থাকলেও তিনি জনমানসে তেমন পরিচিত নন৷

বারবারা হেন্ডরিক্স
এসপিডি দলের অভিজ্ঞ নেত্রী বারবারা হেন্ডরিক্স (৬৫) বিগত সরকারে পরিবেশ মন্ত্রী হিসেবে সক্রিয় ছিলেন৷ সম্ভবত নতুন সরকারেও তিনি সেই দায়িত্ব পালন করে যেতে পারেন৷ সাহসি ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করেন না তিনি৷ সমকামী হিসেবে ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কোনো রাখঢাক নেই তার৷

ইয়ুলিয়া ক্ল্যোকনার
সিডিইউ দলের অপেক্ষাকৃত তরুণ নেত্রী ইয়ুলিয়া ক্ল্যোকনার (৪৫) এতকাল রাইনল্যান্ড প্যালেটিনেট রাজ্য শাখার সভাপতি ছিলেন৷ নতুন সরকার গঠিত হলে তিনি খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী হবেন৷ রক্ষণশীল ও মুক্ত বাণিজ্যের প্রবক্তা হিসেবে তিনি পরোক্ষভাবে ম্যার্কেলের উদার শরণার্থী নীতির সমালোচনা করেছেন৷

ডোরোটে বেয়ার
বাভেরিয়ার সিএসইউ দলের তরুণ নেত্রী ডোরোটে বেয়ার (৩৯) চ্যান্সেলর দফতরের মধ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তির দায়িত্ব পাচ্ছেন৷ রাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি জার্মানিতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগকে মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান৷ সিএসইউ দলের একমাত্র নারী মন্ত্রী হিসেবে তিনি বাড়তি গুরুত্ব পাবেন বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে৷

হেলগে ব্রাউন
সিডিইউ দলে পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃ্ত্বে হেলগে ব্রাউন (৪৫) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছেন৷ প্রস্তাবিত সরকারে চ্যান্সেলর দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্গত করেছেন চ্যান্সেলর ম্যার্কেল৷

সূত্র: ডয়চে ভেলে

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.