সামাজিক মাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় মনে করা হয় ফেসবুককে যেখানে নারী ব্যবহারকারীদের সংখ্যাও অনেক
সামাজিক মাধ্যমগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় মনে করা হয় ফেসবুককে যেখানে নারী ব্যবহারকারীদের সংখ্যাও অনেক

অপরাধ, কেন তার রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করিনি...

নয়া দিগন্ত অনলাইন

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বিটিআরসির হিসেবে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা আট কোটির বেশি। আর তাদের একটি বড় অংশই নারী। যারা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করছেন।

কলাবাগান এলাকার বাসিন্দা নায়লা নওশিনের বিয়ে হয় ১৩ বছর আগে। স্বামীর সাথে তার যোগাযোগ ঘটেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে। প্রথাগতভাবে দেখা-শোনা বা পারিবারিক হস্তক্ষেপ ছিল না সেখানে। তারা দু'জন দু'জনকে খুঁজে পেয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

মিজ নওশিন জানান, "একদিন খুব মন খারাপ। তো ইয়াহু মেসেঞ্জারের চ্যাট করছিলাম। আমার স্টেটাস ছিল 'মনটা খুব খারাপ'। তো হঠাৎ দেখি দুটি বিড়ালের মাথাওয়ালা একজন নক করলো, 'কেন মন খারাপ?'...এভাবে শুরু হল। এরপর ফোন নম্বর বিনিময়। সে লন্ডনে ছিল। তারপর একটা সময় আমার বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছিল। সেটা তাকে বলার পর হঠাৎ বলে বসলো যে, সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। অথচ তখনও কিন্তু আমরা একে অপরকে দেখিনি।"

একটা সময় বাংলাদেশে বেশ পরিচিত হয়েছিল ইয়াহু মেসেঞ্জার চ্যাট। সে মাধ্যমে যোগাযোগ, তার পর সম্পূর্ণ অপরিচিত দুটো মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবন সঙ্গী নির্বাচন করার বিষয়টি পরিবার বা নিকটজনকে বেশ হতচকিত করেছিল।

এখন অবশ্য ফেসবুক মেসেঞ্জার বা ইমো, ভাইবারসহ নানা রকম মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে তরুণ-তরুণী থেকে বিভিন্ন বয়সের মানুষের। তৈরি হচ্ছে নতুন নানা সম্পর্ক।

নওশিন বলেন, সেটা যেন নতুন এক দুয়ার খুলে দিল। সেখানে তো বাধা দেয়ার কেউ নেই। ছোট ছোট চ্যাটরুমে কথা হচ্ছে, অনেকের সাথে আলাপ হচ্ছে, চেনাজানা হচ্ছে। সেটা সামাজিক মাধ্যম ছাড়া তো সম্ভবই না।

বিটিআরসির হিসেবে বাংলাদেশে বর্তমানে ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা আট কোটির বেশি। তার একটি বড় অংশই নারী। অনেক মেয়ে যারা বিভিন্ন কারণে নিজেদের মতামত সামাজিক বা পরিবার কিভাবে হয়তো খোলাখুলি প্রকাশ করতে পারেন না। তাদের অনেকেই মন-খুলে লেখেন সামাজিক মাধ্যমে।

অনেক নারী এখন সামাজিক মাধ্যমকে মনে করছেন তাদের স্বাধীন বিচরণের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। অনেকের ব্যক্তিগত জীবনের একাকীত্ব, একঘেয়েমি কাটাতে ভূমিকা রাখছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।

গৃহিণী ফাতেমা খাতুন যেমনটা বলেন, "প্রতিদিন ফেসবুকে পোস্ট দিই। নাহলে কোনো পোস্ট পছন্দ হলে শেয়ার করি। স্বামী-সন্তান সবাই নিজেদের জগত নিয়ে ব্যস্ত। দিনশেষে ফেসবুকে ঢুকে সময় কাটাতে পারি। পরিচিত-অপরিচিত সকলের সাথে সেখানে যোগাযোগ হয়। "

সামাজিক মাধ্যমে সম্পর্ক যেমন গড়ে উঠছে তা ভাঙছেও। তবে সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা থাকছে মেয়েদেরও।
আবার ফেসবুকে পেজ খুলে রোজগারের পথও তৈরি করছেন যা অর্থনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ এনে দিচ্ছে।

একটি রক্ষণশীল পরিবারের মাঝে বেড়ে উঠেছেন এবং নিজেও পর্দার মাঝে চলাফেরা করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমন একজন নারী বলছিলেন, সামাজিক মাধ্যম তাকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। "একসময় ফেসবুকটা নেশার মত হয়ে গিয়েছিল। তবে পরে ভাবলাম সময়টাকে ভালোভাবেও তো কাজে লাগাতে পারি। তখন একটি বুটিক খুললাম ফেসবুকে। সোশ্যাল মিডিয়া এভাবে অনেককে স্বাবলম্বী করেছে।"

কিন্তু সামাজিকভাবে মেয়েদের যেখানে নানা ক্ষেত্রে বৈষম্যের মধ্যে পড়তে হয় সেখানে এ ধরনের সামাজিক মাধ্যম বা ভার্চুয়াল জগত আসলে তাদের স্বাধীনতা কতটা দিতে পারছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং সাবেক বিভাগীয় প্রধান মনিরুল ইসলাম খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব সেখানেও আসলে ডমিনেট করতে চায়। তারপরও নারীরা তাদের মতামত কিন্তু প্রকাশ করছে, করতে চাইছে।

তার ভাষায়, "আমাদের যে গতানুগতিক শ্রমবিভাজন সেখানে নারীদের জন্য নির্দিষ্ট তিন-চারটা কাজ ছিল। তাদের বিয়ে হবে, তারা সন্তান জন্ম দেবে, মা হবে এবং এভাবে তারা শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু এখন এই নারী তার গতানুগতিক শ্রমবিভাজন থেকে বেরিয়ে আসছে। নারী আজ বিভিন্ন রকম কাজের সাথে যুক্ত হচ্ছে। নারী ফেসবুকে, সামাজিক মাধ্যমে আসছে, আমি যেভাবে পুরুষ হিসেবে আমার মতকে প্রকাশ করছি একজন নারীও তার মত প্রকাশ করছে। সুতরাং সেখানে একরকম সমতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

বিবিসি বাংলার ফেসবুক পাতায় নারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে, নারী হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার আপনাকে কোনভাবে স্বাধীনতা দিয়েছে? ব্যাক্তিগতভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার আপনার কাজকে সহজ করেছে? হলে কীভাবে?

তার জবাবে যারা মন্তব্য করেছেন, সামাজিক মাধ্যমের ফলে প্রায় সবাই কোন না কোন ভাবে স্বাধীনতা উপভোগ করছেন।

ফারাহ শারমিন নামে একজন লিখেছেন " অনেককিছুই আছে যা ব্যক্তিজীবনে বলা যায় না, বললেও শোনার মত মানুষ পাওয়া যায় না, আর যাদের উদ্দেশ্যে বলা হয় তারা থামিয়ে দিতে চায়। এই মাধ্যম এই না বলা কথাগুলো বলার সুযোগ করে দিয়েছে!"

কনা আফরিন মন্তব্য করেছেন, "নারীরা এখনও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাধীন নয়। বিবাহিত মেয়েরা তো নয়ই। কি করা যাবে আর কি করা যাবে না তার একটা অলিখিত নিয়ম তাদের উপর বর্তানো আছে, এরপরও কিছু নারী এই নিয়ম ভেঙে বের হতে পারে, পেরেছে।"

সামাজিক মাধ্যমে নারীরাও এখন নিজের ইচ্ছামাফিক যোগাযোগ করতে পারছেন যেকোনো ব্যক্তির সাথে।

নিলাদ্রী নীল লিখেছেন, "এটা আমাকে যা দিয়েছে তা হলো একাকীত্ব থেকে মুক্তি এবং পুরোনো কিছু বন্ধুকে কাছে এনে দিয়েছে।"

হুমায়রা হিমু জানাচ্ছেন, "কিছু ফ্রেন্ড পেয়েছি যারা অনেক ভালো। সবচেয়ে বড় কথা অনেককিছুই শিখতে পেরেছি আমি।"

তবে সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে নারীদের বেশ ঝামেলায় পড়তে হয় বলেও অভিযোগ করছেন অনেকে।

দিলশাদ জাহান লিখেছেন, "বন্ধুর পোস্টে কমেন্ট করলেও দেখা যায়, অনেকে সেটার আপত্তিকর রিপ্লাই দিয়েছে। এমনকি নগ্ন ছবি অ্যাড করে মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছে, অপরাধ তার রিকোয়েস্ট কেন অ্যাকসেপ্ট করিনি। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে সামাজিক মাধ্যমে নারী কতটুকু স্বাধীন?"

অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত রয়েছে, তবে এই মাধ্যম সামাজিকভাবে বিভিন্ন বিধি-নিষেধের মধ্যে থাকা নারীদের বিভিন্ন স্থানের নানা বয়সের পেশার মানুষের সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগের যে ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে সেটি তাদের মাঝে একধরণের স্বাধীনতা বোধ এনে দিতে পেরেছে - তেমনটাই উঠে আসে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী নারীদের কথায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.