হাঁপানির রকমফের
হাঁপানির রকমফের

হাঁপানির রকমফের

অধ্যাপক ডা: মো: আতিকুর রহমান

দুই হাজার বছর আগেও হাঁপানি রোগ সম্পর্কে মানুষ কিছুটা হলেও পরিচিত ছিল। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস যেকোনো ধরনের শ্বাসকষ্টকে হাঁপানি নাম দিয়েছেন। গ্রিক ভাষায় অ্যাজমা শব্দের অর্থ হলো- কাপ ধরা অথবা হাঁ করে শ্বাস টানা। শুরুতে যেকোনো ধরনের শ্বাসকষ্টকে হাঁপানি বলা হতো। আর হাঁপানি এমন একটি রোগ, যা প্রাণনাশক না হলেও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। যেসব কারণ হাঁপানি সৃষ্টির জন্য দায়ী, তাদের ওপর ভিত্তি করে হাঁপানির শ্রেণি-বিভাগ করা সম্ভব। এর ফলে রোগীর চিকিৎসায় সুবিধা হয়।

এলার্জি বা বাইরের কারণজনিত : সাধারণত ধুলোবালি, বিভিন্ন ফুলের গন্ধ ও পরাগরেণু, নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্য ও ছত্রাক যা এলার্জি সৃষ্টিকারী জিনিসের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়ে থাকে এবং জন্ম থেকেই এদের হাঁপানি হওয়ার প্রবণতা থাকে। অনেক সময় এসব রোগীর এলার্জির জন্য উপসর্গও দেখা দেয়। যেমন- বারবার হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চর্মরোগ প্রভৃৃতি। এলার্জির জন্য সচরাচর ব্যবহৃত ওষুধে এদের উপকার হয়। জীবনের প্রথম অবস্থায় এরূপ হাঁপানি হয়।

স্প্যাজমোটিক বা ভেতরের কারণ : এ ধরনের রোগীদের এলার্জির কোনো ইতিহাস থাকে না। ফুসফুসে বা শ্বাসনালীর আগের কোনো রোগের জন্য হাঁপানির সৃষ্টি হয়। যেমন- অতীত সংক্রমণ বা পুরনো ব্রঙ্কাইটিস ইত্যাদি। জীবনের শেষ দিকে অর্থাৎ অধিক বয়সে এ হাঁপানি হয়। এই দুই প্রকার রোগেই রোগীর শ্বাসনালীর পথ স্বাভাবিক অবস্থা থেকে সরু হয়ে যায়। ফলে ফুসফুসে বাতাস প্রবেশের পথে বাধার সৃষ্টি হয় এবং এর ফলেই শ্বাস-প্রশ্বাসে টান পড়ে ও শ্বাস নিতে রোগীর অনেক কষ্ট হয়। ফলে এ সময় দেখা যায় রোগীর শ্বাসকষ্ট, গলায় সাঁই সাঁই আওয়াজ, বুকে চাপবোধ ও কাশি উঠতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর জীবনে বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায়। যেমন- মৃত্যুভয়, শ্বাসকষ্ট, দম আটকে আসা, দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে শুতে অনিচ্ছা, রাতে বিশেষ করে শেষ রাতে রোগ বৃদ্ধি। হাঁপানির সাথে ব্রঙ্কাইটিস থাকলে তো কথাই নেই। কাশতে কাশতে অতিরিক্ত শ্লেস্মা গলায় নিঃসৃত হয় বলে শ্বাসনালী আরো সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়, এর ফলে হাঁপানির টান বহু গুণ বেড়ে যায়। আরো দেখা যায়, ফুলের পরাগরেণু, আবহাওয়ার তারতম্য, দূষিত বাতাস প্রভৃতি কারণে হাঁপানির কষ্ট বাড়ে। ধূমপান, কাঁচা রঙের গন্ধ, ধুলোবালি প্রভৃতিও হাঁপানির জন্য দায়ী।

হাঁপানির প্রকারভেদে চিকিৎসা করালে কষ্টের কিছুটা উপশম হয় খুব দ্রুত। এলার্জিজনিত হাঁপানির বেলায় যেসব জিনিসে রোগীর শ্বাসকষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে তা পরিহার করতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। এ ছাড়াও আরেক ধরনের হাঁপানি আছে- যাকে বলা হয় ব্যায়ামজনিত হাঁপানি। যারা ঠাণ্ডা স্যাঁতসেঁতে ঘরে শারীরিক ব্যায়াম করেন তাদের এ হাঁপানি হয়ে থাকে।
শ্বাসকষ্ট হলেই হাঁপানি নয় : শ্বাসকষ্ট হাঁপানি রোগীর একটি বড় লক্ষণ। কিন্তু শুধু শ্বাসকষ্ট হলেই তাকে হাঁপানি বলে শনাক্ত করে চিকিৎসা দিতে হবে তা ঠিক নয়। কিছু কিছু শ্বাসের রোগ হাঁপানির মতো মনে হলেও তা মোটেও হাঁপানি নয়।

পুরনো ব্রঙ্কাইটিস : সাধারণত বয়স্করাই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। ধূমপায়ীদের মধ্যেই পুরনো ব্রঙ্কাইটিস দেখা যায় বেশি। দিনের পর দিন তামাকের ধোয়া শ্বাসনালীতে ঢুকে পড়ে। এতে শ্বাসনালীর স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হয়। কারণ, এই ধোয়া শ্বাসনালীতে প্রদাহের সৃষ্টি করে। অসম্ভব কাশি ও প্রচুর কফ এ রোগের প্রধান লক্ষণ। সাধারণত ভোরে এ রোগের উপসর্গগুলো সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এমফিসেমা হলো ফুসফুসে বায়ুথলির রোগ। এ রোগে বায়ুথলির স্বাভাবিক প্রসারণ ও সঙ্কোচন বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বায়ুথলির ভেতরের কার্বন-ডাই অক্সাইড ও অক্সিজেনের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। খুব সামান্য পরিশ্রম করলেই রোগী অধিক হাঁপাতে শুরু করে। দেখা গেছে, এ ধরনের ফুসফুসের রোগ চিকিৎসা করলেও স্বাভাবিক হতে চায় না বা স্বাভাবিক হয় না।

হৃৎপিণ্ডঘটিত হাঁপানি : হৃৎপিণ্ডঘটিত হাঁপানি ঠিক শ্বাসযন্ত্রের হাঁপানির অনুরূপ। বয়স্ক লোকদের হৃৎপিণ্ডের ক্ষমতার অভাব দেখা দিলে এ ধরনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। সাধারণত হাঁপানির শ্বাসকষ্ট শ্বাস ছাড়ার সময়ই হয়ে থাকে বেশি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে নিঃশ্বাস ও প্রশ্বাসেও শ্বাসকষ্ট হয়। প্রায়ই এটা দেখা দেয় গভীর রাতে, নিদ্রাকালে। শ্বাসকষ্ট এত তীব্র হয় যে, রোগীর মনে হয় দম বন্ধ হয়ে আসছে। এ জন্য নিদ্রিত রোগী জেগে উঠে বসে পড়ে। শ্বাসকষ্ট কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং রোগী অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

হিস্টিরিয়া : সাধারণত তরুণীরাই এ রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। মাঝে মধ্যে তাদের অসম্ভব শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আর মনে হয় যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু তাদের পরীক্ষা করলে দেখা যায়, শুধু শ্বাসটা একটু দীর্ঘ হয় আর নিঃশ্বাস এবং প্রশ্বাসে কোনো কষ্টই নেই। চাওয়া ও পাওয়ার মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টায় এ ধরনের রোগীর অবচেতন মন বিভিন্ন রোগের উপসর্গ নকল করে। মনোবিদদের সাহায্যের দরকার হতে পারে হিস্টিরিয়া নিরীক্ষার জন্য।

লেখক :অধ্যাপক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, রাফা মেডিক্যাল সার্ভিস, ৫৩, মহাখালী টিবি গেইট, ঢাকা। ফোন : ০১৯১১৩৫৫৭৫৬

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.