নারী দিবস ভাবনা

রঙের ঝলক
সাবিরা সুলতানা ও আলমগীর কবীর

আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বে দিবসটি ব্যাপক আয়োজনের সাথে পালিত হয় নারীর অবদানের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে। সভ্যতার প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে নারীর অবদান। কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো পরোক্ষভাবে নারীর মেধা, শ্রম, অভিজ্ঞতা, দায়িত্বশীলতা ও মমতা জড়িয়ে আছে মানব জাতির বিকাশ ও উৎকর্ষসাধনে। প্রাচীনকালেও সংসার পরিচালনা এবং সন্তান প্রতিপালন ছাড়াও নারীর অংশগ্রহণ ছিল কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এমনকি সমরেও। এ যুগে তো তারা তাদের দুই হাত দিয়েই একই সাথে পরিচালনা করছেন পরিবার, কর্মক্ষেত্র, সমাজ এবং রাষ্ট্র। তবে খুব অল্পসংখ্যক নারী পান তাদের কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান। আর সে জন্যই সমাজে নারীর ওপর চলছে এত নির্যাতন। নারীর সম্মান যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা করা গেলেই সার্থক হবে নারী দিবস উদযাপন। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে বিভিন্ন পর্যায়ের খ্যাতনামা কয়েকজন নারী জানাচ্ছেন তাদের অভিমত।

সাদিয়া ইসলাম মৌ
খ্যাতনামা নৃত্যশিল্পী, মডেল ও অভিনেত্রী

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় নারীদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে এই দিবসের যথেষ্ট ভূমিকা আছে বলে মনে হয় আমার কাছে। তার পরেও নারী দিবস পালন নিয়ে আমার ভীষণ আপত্তি। নারীর অধিকার, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা আর কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য একটি বিশেষ দিনের প্রয়োজন কেন হবে? তাহলে তো একটি ‘পুরুষ দিবস’ও থাকা উচিত তাই না? নারীর জন্য আলাদা দিবস আছে, পুরুষের নেই। কারণ, পুরুষের তা প্রয়োজন নেই, নারীর আছে কেন? কারণ, নারী দুর্বল। তাই কি? নারী-পুরুষের অধিকার কেন সমান হবে? একজন পুরুষকে কি লেখাপড়া আর ক্যারিয়ার সাজানোর পাশাপাশি ঘর সাজানো আর বাড়ির সবার খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ভাবতে হয়? একজন নারীকে সন্তান জন্মদানসহ অন্যান্য শারীরিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যতখানি যেতে হয় একজন পুরুষকে তার কিছুই করতে হয় না। যৌন হয়রানি আর এসিড- সন্ত্রাসের মত সামাজিক নিগ্রহের শিকার হতে হয় না।
নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় নৃত্যশিল্পী ও মডেল মৌ বলেন, অনেক পুরুষ নারীর মতায়ন আর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী হওয়া নিয়ে কথা বলেন, তাদের মধ্যে কয়জন বাড়ি গিয়ে তাদের মা, বোন বা স্ত্রীকে ঘরের কাজে সাহায্য করেন? তাদের মধ্যে কয়জন তার গৃহিণী হিসেবে সংসার সামলে যাওয়া স্ত্রীর কাজকে আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করেন? তাদের মধ্যে কয়জন তাদের সহকর্মী বা অধীনে কাজ করা নারীকে সংসার, সন্তান সামলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করেন?
নারীদের নিয়ে পুরুষের ভাবনার পরিবর্তন জরুরি উল্লেখ করে মৌ বলেন, একজন নারীকে যতণ ‘মানুষ’ হিসেবে ভাবতে শিখব না আমরা, সমস্যা থেকেই যাবে। আর এই ভাবনা প্রথমে নারীদের মধ্যে আসতে হবে। একজন নারীকে তার ভেতরের শক্তিটুকু অনুভব করতে শিখতে হবে। নারীকে বুঝতে হবে তার কী করার মতা আছে। পরগাছা হয়ে বাঁচার মানসিকতা ঝেড়ে ফেলতে হবে।

কানিজ আলমাস খান
রূপ বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, পারসোনা

নারী দিবসে নারীর মূল্যায়ন করার প্রসঙ্গে তার বক্তব্যÑ নারীকে সব ক্ষেত্র থেকেই আজ মূল্যায়ন করতে হবে। ঘরে-বাইরে উভয় ক্ষেত্রেই নারী রাখছেন অসামান্য অবদান। নারীর এই ভূমিকা শুধু এ সময়ের নয়, বরং যখন নারী ছিলেন অন্তঃপুরবাসিনী তখন পরিবার আর সমাজ নির্মাণে রেখেছেন অবদান। সুষ্ঠুভাবে সংসার পরিচালনা, সন্তান প্রতিপালন করেছেন। সন্তানদের শিখিয়েছেন মূল্যবোধ, দিয়েছেন সঠিক পথের দিশা। পরোক্ষভাবে সমাজ পরিচালনায় রেখেছেন অবদান, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না। আধুনিক নারীকে বলা যায় স্বয়ংসম্পন্ন। ঘরে-বাইরে অর্থাৎ একই সাথে সংসার ও কর্মক্ষেত্রে রাখছেন তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর। শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সব ক্ষেত্রে রয়েছে তাদের অসামান্য অবদান। নতুন নতুন পেশা বেছে নিচ্ছেন তাদের কর্মক্ষেত্র হিসেবে। উন্নত বিশ্বে তো বটেই, আমাদের সমাজের মেয়েরাও এগিয়ে গেছেন অনেক দূর। রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী, পুলিশ, প্রশাসন, অর্থনীতি, রাজনীতি এমনকি জাহাজ নির্মাণ ও ট্রেন চালনার মতো কাজেও দেখা যাচ্ছে আমাদের নারীদের।
নারীর এই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে তার শ্রম, মেধা, ধৈর্য, দায়িত্বশীলতা ও কঠিন প্রচেষ্টা। নিজের সামনে আসা বাধাগুলোকে প্রতিনিয়ত সরিয়ে তবেই এগিয়ে যাচ্ছেন আমাদের নারীরা। তাই তাদের এই অবদানকে আর অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। তাদের যোগ্য সম্মান দিতেই হবে। অনেকেই বলে থাকেন, আলাদা করে একটি দিনকে নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রয়োজন নেই। সে বিষয়ে বলব, প্রতিটি দিনই নারীর জন্য সমান। কারণ প্রতিটি দিনই নারীকে তার দায়িত্ব পালন করতে হয়। সংসারের ক্ষেত্রে বলা যায়, প্রতিটি দিনই কর্মদিবস। কিন্তু বছরের একটি দিন যদি বিশ্বের নারীদের সম্মানে উদযাপিত হয়, তাহলে সেটিও অর্থহীন হয়। কারণ এই একটি দিন এসে নারীর কাজ, তার কর্মপন্থা নিয়ে নতুন করে পরিকল্পনা, পর্যালোচনা, পরিসংখ্যান অর্থাৎ তাদের কাজের মূল্যায়ন করা হয়। এই আয়োজন নারীকে আরো শিখতে উৎসাহী করে। নারীকে আরো সচেতন করে। উৎসাহ জোগায় নতুন করে পথচলায়।

গুলশান নাসরীন চৌধুরী
প্রধান নির্বাহী, রেডিয়েন্ট ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন
আজকের দিনে মেয়েদের অগ্রযাত্রা ছড়িয়ে পড়েছে সবক্ষেত্রে। সমাজ, সরকার ও পরিবারসহ সব পরিমণ্ডল থেকে এখন মেয়েদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। আমাদের দেশে এ সময়ের মেয়েদের প্রধান অর্জন হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়া। বেশির ভাগ মেয়ে তাদের নিজস্ব অবস্থান থেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছে। সমাজের অনেক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে যোগ করেছে নতুন পরিভাষা। এক সময় মেয়েদের চাকরি করাকে পরিবার বা সমাজ কোনো ক্ষেত্রেই খুব একটা অনুমোদন দিতো না। নেহায়েত প্রয়োজন না হলে মেয়েরাও অর্থ উপাজনের চেষ্টা খুব একটা করত না। সংসারে মেয়েদের অর্থ দেয়াকে অসম্মানজনক মনে করা হতো। এখন এইসব মানসিকতা আর নেই। মেয়েরাই সমাজের ও পরিবারের মনোভাব বদলে দিয়েছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে নারী শিক্ষা বিস্তারের ফলে।
মেয়েরা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। আর তাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে গড়ে নিচ্ছে নিজেদের ক্যারিয়ার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর ব্যাংক বা বীমা প্রতিষ্ঠান শুধু নয়; মেয়েদের কর্মক্ষেত্র এখন ব্যাপক। সম্প্রতি বছরগুলোতে মেয়েরা ফ্যাশন ডিজাইনিং, ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং, ইকেবানা, বিভিন্ন হ্যান্ডিক্র্যাফট তৈরি, এমনকি মেয়েদের সহজাত রান্নাবান্না থেকেও স্বাবলম্বী হয়েছে। আর স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে তাদের জীবনে ও মানসিকতায় আসছে পরিবর্তন।
কিন্তু কাজে লাগাতে পারে না। কিন্তু মেয়েদেরই নির্ধারণ করতে হবে তাদের কর্মক্ষেত্র। ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ নেয়ার পর সেই শিক্ষা কাজে লাগাতে হবে।
তবে এতটা অর্জনের পরও নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এখনো প্রতিনিয়ত নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে নানাভাবে। প্রতিটি পথচলার সাথে যেন জড়িয়ে আছে আতঙ্ক। এই অবস্থান পরিবর্তন করার ক্ষেত্রেও নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। নারী তার ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা ও আত্মমর্যাদাবোধ দিয়ে নিজের নিরাপত্তা অনেকটাই সুরক্ষিত করতে পারে। তবে সেই সাথে অন্যদেরও সব নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষাটা থাকতে হবে।

সাদিকা পারভিন পপি
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী
নারী পরিচয় আমার গর্ব। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে বিশ্বের সব নারীর মঙ্গল কামনা করছি। আমি মনে করি, নারী ও পুরুষ আলাদা সত্তা নয়, সবাই মানুষ। তারপরও একজন নারীর জীবনে প্রতিবন্ধকতার সীমা নেই। সামাজিক অনেক েেত্র তারা নিজের অধিকার থেকে এখনো বঞ্চিত। এ অবস্থা থেকে নারীকে নিজ চেষ্টায় সব বাধা অতিক্রম করে সাফল্য অর্জন করতে হবে। সে েেত্র প্রতিটি দিনই সংগ্রামের। তাই নারী দিবস উদযাপনের পাশাপাশি নারীর এগিয়ে যাওয়ার সংগ্রাম যেন অব্যাহত থাকে, এ কামনা করি। পপি বলেন, কিছু বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। যেমন, আমরা কী করছি? আমরা কী চাই? আমরা কি সম-অধিকার চাই? নাকি মানুষ হিসেবে পূর্ণমর্যাদা চাই? আমরা কি সেজেগুজে শোপিস হয়েই খুশি থাকতে চাই, নাকি সৃষ্টিশীলতা আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সম্মান অর্জন করতে চাই? আমরা কি লোকে কী বলবে, সমাজ মানবে না ভেবে অপমান সহ্য করেও বন্দী হয়ে থাকতে চাই, নাকি সমাজ বদলের জন্য হাতে হাত ধরে দৃপ্তপায়ে সামনে এগিয়ে যেতে চাই? বলতে কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এটি সত্য যে নারীর অনেক সমস্যা নারীরাই সৃষ্টি করে। নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক েেত্রই একজন নারী প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। এক নারীর নামে কুৎসা রটান আরেক নারী। একজন নারীর সাফল্যকে অভিনন্দন না জানিয়ে তাতে কালি মাখানোর চেষ্টা করেন আরেক নারী। যে নারী নিজে বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন, তিনিই কঠিন রণশীলতা দেখাচ্ছেন তার পুত্রবধূর সাথে। শিতি আর অধিকার সচেতন কোনো নারী অত্যাচার করছেন তার নারী গৃহকর্মীকে। কেবলই ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে এগিয়ে যেতে বাধা দিচ্ছেন তার সম্ভাবনাময়ী নারী সহকর্মীকে। এই জায়গাগুলোতে আমাদের অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে।

বিদ্যা সিনহা মিম
জনপ্রিয় মডেল, অভিনেত্রী
সমাজে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় যুগের পর যুগ ধরে নারীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দিনটি আসলে নারীদের অধিকার এবং সম্মান সম্পর্কে আমাদের মনে করিয়ে দেয়। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য। আসলে বছরের প্রত্যেকটি দিনই নারীর জন্যে। তিনি বলেন, আমাদের সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক হলেও মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাও বিদ্যমান। তাই সরাসারি যদি কেউ বলেন নারীরা আমাদের সমাজে অবহেলিত, এই কথার সম্পূর্ণ বিরোধী আমি। নারীরা যদি সমাজে অবহেলিত হতো, তবে আমি আজ অভিনেত্রী বিদ্যা সিনহা মিম হতে পারতাম না। আমাদের দেশের দু’টি রাজনৈতিক দলের প্রধান হচ্ছেন নারী। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে নারীরা প্রতিষ্ঠিত। নারীর অবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজন সঠিক শিা। সেই শিা শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। একজন মুক্তমনা, শিতি, রুচিশীল, সংগ্রামী, আদর্শ মা-ই পারেন তার কন্যাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। পুরুষকেও এ জন্য সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তাই লেখাপড়ার শুরু থেকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে নারীকে। মায়াবতী হওয়ার পাশাপাশি কঠোর হতে জানতে হবে। ত্যাগের পাশাপাশি ‘না’ বলতে জানতে হবে। সুন্দর হওয়ার পাশাপাশি শক্তিশালীও হতে হবে। সম্মান আর অধিকার কেউ হাতে তুলে দেবে না। নিজেকেই আদায় করে নিতে হবে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.