মিউজিয়াম অব  ইসলামিক আর্ট
মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট

মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট

আবু তাহের মিয়াজী

ভ্রমণ আমার খুব ভালো লাগে। সুযোগ পেলে দিগি¦দিক ছুটতে থাকি। প্রবাসে শুধু কাজ আর কাজ, এরই মাঝে একটু ঘোরাঘুরি করে দেখার সুযোগ খুঁজতে থাকি। এখানে গরমও খুব বেশি। যদিও কখনো বাইরে যাই, গরমের যন্ত্রণায় গাড়ির ভেতর থেকে বেরুতে ইচ্ছে করে না। এ দিকে অনেক দিনের আশা কাতার মিউজিয়াম ঘুরে দেখার। কয়েকবার গিয়ে প্রবাসী ব্যাচেলর হওয়ার কারণে ফেরতও আসতে হয়েছে। যদিও তালহা, ইকরিমা, তাহসানের বাবা আমি! কিন্তু কাতারে ফ্যামিলি না থাকায় তাদের চোখে আমি ব্যাচেলর। তবুও বুকের চরাচরে উত্তাল ঢেউ তোলা গর্জন থামছে না, মিউজিয়াম যাওয়া চাই-ই! তা না হলে থামতে চাইছে না!

খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম- শুক্র ও শনিবার ছাড়া যেকোনো দিন ব্যাচেলর প্রবেশ করতে পারে। এ খবর পেয়ে কি আর বসে থাকা যায়? না কখনো না। সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম। দিনটি ছিল বুধবার। দুপরের খাবার খেয়ে সামান্য বিশ্রাম নিতে শুয়েছি। কিন্তু ঘুম এলো না, কী করে আসবে! মনের বেলকনিতে আনন্দের জোয়ার বইছে। বিকেলবেলা অফিস থেকে নেমে চেপে বসলাম গাড়িতে। আমি থাকি আলথখোর, মিউজিয়াম হলো দোহা সিটি কোরণিশ। আমি আর সাইদুল ভাই দু’জনে আলথখোর থেকে যাত্রা শুরু করলাম কোম্পানির গাড়ি নিয়ে। সাথে নিয়েছি চিপস আর জুস। গাড়ি চলছে উত্তর থেকে দক্ষিণে সূর্যি মামার উত্তাপ তখন প্রচণ্ড, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য আমায় আমুদেপনা দেখিয়ে ক্লান্ত করে দিচ্ছিল।

চলতে চলতে আমাদের গাড়ি একসময় পৌঁছে গেল দোহা কোরণিশ, মিউজিয়ামটি হলো কোরণিশের সাথে। আর আমাদের গাড়ি আলথখোর থেকে কোরণিশ হয়ে চলছে। কোরণিশে গড়ে উঠেছে গগনচুম্বী বহু বাণিজ্য প্রাসাদ। নির্মাণশৈলীতে আধুনিকতার ছোঁয়া চোখে পড়ার মতো। কোরণিশে অবস্থিত মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট ও পিরামিড আকারের হোটেল শেরাটন যেকোনো পর্যটকের দৃষ্টি কাড়ে। বিকেল ও সন্ধ্যাবেলায় সৈকতজুড়ে সমুদ্র বিধৌত মুন মুগ্ধকরা হাওয়ায় অবগাহনের জন্য বহু মানুষ জড়ো হয় এখানে। ভিজিটরদের জন্য রয়েছে সুপরিসর গাড়ির পার্ক। নৌবিহারের জন্য রয়েছে যন্ত্রচালিত নৌকা ও স্পিডবোট। কোরণিশের সাথে আছে রোমেইলা পার্ক। পরিকল্পিতভাবে রোমেইলা পার্কের মাটিতে লাগানো হয়েছে বিশেষ প্রজাতির সবুজ ঘাস। মেশিন দিয়ে কেটে ঘাসের উপরিভাগকে সমান করা হয়ে থাকে। এ যেন মরুর বুকে সবুজের মেলা।

আচ্ছা যা বলছিলাম, সময়মতো আমরা পৌঁছে গেলাম মিউজিয়ামের গেটে। এখন আমাদের হতবাক হওয়ার পালা, মিউজিয়ামের তিন দিকেই সমুদ্র। মনে হচ্ছে, যেন ওটা পানিতে ভেসে আছে। এর বাইরের, ভেতরের স্থাপত্যশৈলী অসাধারণ। গাড়ি থেকে যেখানে নামলাম, সেখান থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে ওঠার জন্য। তার ডানদিকেও চলে গেছে আরো একটি গার্ডেন, সেই কথায় পরে আসছি। সিঁড়ির দু’পাশে চার সারি খেজুর গাছ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন ওরা একে অন্যকে বলাবলি করছে, ‘এই চুপ, কেউ যেন এদিকে আসছে’। খেজুর গাছ লাগিয়ে যে এত সৌন্দর্য আনা যায়, এর আগে কখোনো দেখিনি। সিঁড়ির দু’পাশের মাঝ দিয়ে চলেছে একটি পানির ধারা। আবার আরেক পাশের দুই সারি খেজুর গাছের মাঝ দিয়েও আরেকটি করে সিঁড়ি উঠে গেছে। উপরে উঠতেই নামফলক, তার পাশেই সুন্দর পানির ফোয়ারা। পাশে কিছুটা খোলা জায়গা আছে, যা সমুদ্রের মধ্যে চলে গেছে, সেখানেও পানির ফোয়ারার ছড়াছড়ি। হয়তো কাতারের আবহাওয়া খুব গরম বলেই এমন ব্যবস্থা, তাছাড়া দেখতেও অনেক চমৎকার। অনেকেই বিকেলটা এখানে কাটান। ভেতরে একটা রেস্টুরেন্ট আছে, নিচের অংশ স্বচ্ছ কাঁচ দিয়ে ঘেরা, যেখান দিয়ে সমুদ্র দেখা যাচ্ছিল। ওপরে ওঠার সিঁড়িটাও যেন সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। মিউজিয়ামের ভেতরে ঘুরে ঘুরে দেখলাম অদেখা অনেক প্রাচীন জিনিসপত্র। একটা জায়গায় এসে চোখ আটকে গেল। সেটি ‘ফেরদৌসীর শাহানামা কাব্যগ্রন্থ’। কেমন যেন একটা শিহরণ অনুভব করলাম। অনেক আগের থেকেই যার নাম শুনে আসছি, সেটি এখন আমার চোখের সামনে। পরপর দু’টো দেখলাম। দু’টোই খোলা। একটাতে এক পাতায় লেখা, আরেক পাতায় ছবি। আরেকটাতে দু’পাশেই ছবি। ভেতরে-বাইরে দু’চোখ ভরে দেখছিলাম এদের স্থাপত্যশৈলী।

তিন তলা মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখতে দেখতে একসময় নেমে এলো শেষ বিকেল। বেরিয়ে পড়লাম মিউজিয়াম থেকে। বলেছিলাম মিউজিয়ামে প্রবেশের ডানদিকে একটি সবুজ গার্ডেন বাঁকা হয়ে চলে গেছে সমুদ্রের ভেতর। আমরাও চলে যাচ্ছি এখন সবুজ ঘাসের গালিচার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে। পড়ন্ত বিকেল গড়িয়ে সূর্যাস্তের সময় সন্ধ্যেবেলা। এবারো আবার অবাক হলাম প্রকৃতির উজ্জ্বলতা দেখে। হঠাৎ করেই যেন দৃশ্যপট পাল্টে গেল। প্রকৃতির উজ্জ্বলতায় ডুবন্ত সূর্য সোনালি আলোয় ঝকঝক করে উঠল। চারদিকে সবুজের সমারোহ। নাম জানা অজানা অনেক গাছগাছালি। ফুলে-ফলে সেজে আছে গার্ডেন, অগণিত প্রকৃতিপ্রেমীদের কোলাহল।

মিউজিয়াম আর গার্ডেনের মাঝখানজুড়ে একটি লেক, এই লেকটির পশ্চিম দিক দিয়ে গার্ডেন। ঘুরে ঘুরে গার্ডেনের রূপ দেখতে দেখতে একসময় আমরা চলে গেলাম সমুদ্রের মাঝখানে পাহাড়ে। অবশ্য পাহাড় বলা যায় কি না জানি না, আবার দ্বীপও বলা চলে। আমরা প্রথমেই মাগরিবের নামাজ পড়ে নিলাম ঘাসের ওপরে জামাতে।
জায়গাটি অপূর্ব। কাশফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে দু’পাহাড়ের দু’কোল। কাশফুলগুলো মনের শুভ্রতা আরো বাড়িয়ে দিলো। আনন্দের জোয়ার আরো বইতে লাগল। সমুদ্রের হাওয়ায় দোলছিল সাদা কাশফুলগুলো। বাংলাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই মাঠে-ঘাটে কাশফুলের দেখা মেলে। কিন্তু কাতারে এই কাশফুলগুলো অন্য দেশ থেকে এনে লাগিয়েছে। আসলে সত্যি কথা বলতেই হয়, আমাদের দেশে যে প্রকৃতির এত উজ্জ্বল, এত রূপ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা তার শুকরিয়া কিভাবে যে আদায় করব তা ভেবে পাই না। যাই হোক, দুই পাহাড়ের মধ্যখানে একটি রেস্টুরেন্ট দেখতে গেলাম। সাথে মসজিদ, বাথরুম, মসজিদ এখানে আছে আমাদের ধারণার বাইরে ছিল। সে জন্য আমরা নামাজ ঘাসের ওপরেই পড়েছিলাম। সাথে রেস্টুরেন্ট দেখেই মনেপড়ল, কফি খেতে হবে। এত সময় ঘোরাঘুরিতে শরীরের ওপর দিয়ে যে ধকল গেছে তা অনুমেয়।

পাহাড়ে নেমে এলো রাত। চারদিকে নিয়ন লাইটে অন্ধকার দূর করে দিচ্ছে। কিন্তু এই রাতেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনে ওই পাড়ের গগনচুম্বী বাণিজ্যিক প্রাসাদগুলো। এই আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে কেমন যেন রহস্যময় করে তুলেছে। আমরা সবাই, মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে শুনছি আরব সাগরের গর্জন। আর দেখছিলাম স্বদেশী প্রবাসী বেশির ভাগ লোক মনের আনন্দে ঘোরাঘুরি করে ছবি তুলছেন। তারই মাঝে আপনজনের কাছ থেকে দূরে থাকা হৃদয়ের ব্যথা, প্রবাসের একাকিত্ব সাগরের ঢেউয়ের সাথে জীবনের ক্লান্তি ভুলে থাকার প্রয়াস খুঁজে পাই। আর অন্তর চোখে খুঁজে পাই তৃষিত আত্মার কারিগরের সীমাহীন মেহেরবাণী।

দোহা, কাতার।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.