এমন রাগ নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ
এমন রাগ নিয়ন্ত্রণ করা উচিৎ

রাগ নিয়ন্ত্রণে বরফ থেরাপি

বিবিসি

আপনি কি খুব বেশি রেগে যান? রেগে গেলে ভাঙচুর করেন? কিম্বা হাতের কাছে যা পান ছুঁড়ে মারেন, গলা ফাটিয়ে চেঁচামেচি বা হুমকি দেন?

এমন রাগ নাকি নিয়ন্ত্রণ করাই উচিৎ। কিন্তু কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?

ঢাকার ধানমন্ডিতে একটি কর্মশালায় শুক্রবার জড়ো হয়েছিলেন এমন কিছু মানুষ যারা রাগ নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে জানতে এসেছেন।

তাদের একজন বলছেন, "এটা বলতে একটু লজ্জা লাগছে। আমি খুবই চিল্লাচিল্লি করি। আশপাশে ভাঙার মতো কিছু পেলে ভাঙাভাঙি করি। কথা বলা বন্ধ করে দেই। আমাকে দেখলে বোঝা যাবে ন এমন রাগতে পারি।"

রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম, অতিরিক্ত গাড়ির হর্ন, বাসের কন্ডাকটরের আচরণ, রেস্টুরেন্টের ওয়েটারের দেরিতে খাবার দেয়া, এমন অনেক কিছুতেই ইদানিং খুব রেগে যান এমন একজন আব্দুল্লাহ রেজওয়ান।

তিনি বলছেন, "ইদানিং হুট করে খুব রেগে যাই। মাঝে মধ্যে রেগে যাওয়ার পরে এবং রাগারাগি করার পরে বুঝতে পারি যে আমার তা উচিৎ হয়নি। আমার প্রিয়জনেরা ইদানিং বলতে শুরু করেছেন যে আমি অযথাই রেগে যাচ্ছি।"

মনোবিজ্ঞানীরা যদিও বলছেন রাগ একটি স্বাভাবিক আবেগ। কিন্তু এই রাগ ক্ষতির কারণ হয়েও দেখা দিতে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে ব্যক্তিজীবন, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে। এমনকি স্বাস্থ্যের ওপরও রাগের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

কর্মশালাটির আয়োজক আর্ক নামের একটি মনোচিকিৎসা কেন্দ্রের মনোবিজ্ঞানী মধুরিমা সাহা হিয়া বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের সহনশীলতা কমছে, আর রাগের বহিঃপ্রকাশ আগের থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

তিনি বলছেন, "প্রতিদিন কিন্তু রাস্তায় বের হলেই অন্তত দুই থেকে তিনটা ঝগড়া দেখি। যেমন ধরুন, রিকশাওয়ালার সাথে যাত্রীর, এক বাসের সাথে আরে বাসের চালকের, ফেরিওয়ালার সাথে ক্রেতার। প্রতিদিনই কিন্তু আমরা ঝগড়া দেখছি। আমাদের অবজারভেশন বলে আমাদের ধৈর্য কমছে আর রাগ বাড়ছে।"

কিন্তু কোন পর্যায়ে গেলে সেই রাগ নিয়ন্ত্রণ করার কথা ওঠে?

মধুরিমা সাহা বলছেন, "যখন সেটা স্বাভাবিকের পর্যায়ে থাকবে না তখনই তা নিয়ন্ত্রণের দরকার। যেমন কেউ যদি আক্রমণাত্মকভাবে সেটি প্রকাশ করে, মানুষজনকে আঘাত দিয়ে, অন্যকে হুমকি দিয়ে বা জিনিসপত্র ভাঙচুর করে যদি কেউ রাগ প্রকাশ করে - তাহলে।"

হুট করে এমন রেগে গিয়ে খুন খারাবি পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে এমন ঘটনাও শোনা যায়।

রাগ এমন পর্যায়ে চলে যাওয়ার আগেই সেটি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার বলছিলেন এই মনোবিজ্ঞানী। কিন্তু রাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

চারটি সহজ টিপস দিলেন মধুরিমা সাহা।

তিনি বলছেন, তাৎক্ষণিক কিছু কাজ আমরা করতে পারি, যেমন যে জায়গাটিতে রেগে যাওয়ার মতো কিছু ঘটেছে সেখান থেকে সরে যাওয়া। যার ওপরে রাগ হয়েছে, তার কাছ থেকে সরে যাওয়া। তার সাথে তখনই নয়, বরং খানিক পরে কথা বলা। হাতের কাছে যদি বরফ থাকে তাহলে তা হাত দিয়ে ধরে থাকা। বরফ মেজাজ শীতল করতেও সহায়তা করে।

"যদি সম্ভব হয় যে কাপড়ে আছেন তাতেই গোসল করে ফেলুন। নিশ্বাসের একটি ব্যায়াম করে দেখতে পারেন। সেটি করার পদ্ধতি হল, রাগ থেকে মনটাকে সরিয়ে নিশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেয়া। বুক ভরে গভীর নিশ্বাস নেয়া, সেটাকে কিছুক্ষণ ধরে থাকা, কিছুক্ষণ পর বাতাস ছেড়ে দেয়া। সেটি রাগ কমাতে সাহায্য করে।"

"হয়ত এর সবগুলোই আপনার কাজে নাও আসতে পারে। কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে তো আর সমস্যা নেই" -বলছেন মধুরিমা সাহা।

 

রেগে গেলে দেহের কী কী ক্ষতি হয়?

রাগ কোনোভাবেই আমাদের উপকারে লাগে না, বরং শরীর এবং মনের এত মাত্রায় ক্ষতি করে যে অনেক সময়ই সেই ক্ষতি সমলানো সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই তো রাগ থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা।

আর এমনটা কীভাবে সম্ভব? এই উত্তরেরই খোঁজ চালানো হবে এই লেখায়। প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে ভাবতেই পারেন হঠাৎ করে কেন রাগ নিয়ে এত আলোচনা করা হচ্ছে? আসলে একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে রাগের মতো শক্তিশালী ইমোশানকে যদি ঠিক মতো সামলানো না যায়, তাহলে মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। আসলে রাগের সময় আমাদের মস্তিষ্কের অন্দরে কর্টিজল এবং অ্যাড্রিনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। ফলে মন খারাপ হতে শুরু করে। সেই সঙ্গে হার্ট রেট এবং রক্তচাপও মারাত্মক বেড়ে যায়। ফলে যেকোনো সময় মারাত্মক কোনো ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে একাধিক মারণ রোগের খপ্পরে পরার সম্ভাবনাও যায় বেড়ে। যেমন ধরুন-

১. মানসিক অবসাদ : মানুষ তখনই খুব রেগে যায় যখন মন খুব খারাপ হয়। ফলে একদিকে মন খারাপ, তার উপর স্ট্রেস হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যাওয়া। এই দুয়ে মিলে মনকে এত মাত্রায় ঝাঁঝরা করে দেয় যে মানসিক অবসাদ বা ডিপ্রেশনের মতো রোগ মাথায় চেপে বসে।

গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে যে যে রোগের প্রকোপ মারাত্মক বৃদ্ধি পয়েছে, তাদের বেশিরভাগেরই পিছনে হাত রয়েছে মানসিক অবসাদের। এবার বুঝেছেন তো রাগের সঙ্গে শরীরের ভালো-মন্দের কতটা যোগ রয়েছে।

২. মাথা যন্ত্রণা : রাগের সময় শরীরে এমন নেতিবাচক পরিবর্তন হতে শুরু করে যে দেহের অন্দরে প্রদাহের মাত্রা বাড়তে থাকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মাথা যন্ত্রণার মতো সমস্যা দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে হেডেক এত ক্রণিক আকার ধারণ করে যে কষ্ট কমতেই চায় না।

৩. উচ্চ রক্তচাপ : রাগের পাড়া যখন চড়তে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই রক্তচাপও বাড়তে থাকে। আর হঠাৎ করে এমনভাবে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া বয়স্ক মানুষদের পক্ষে একেবারেই ভা নয়। কারণ এমন ক্ষেত্রে হঠাৎ করে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

অনিয়ন্ত্রিত জীবন এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে এমনিতেই যুব সমাজের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়, তার উপর যদি তারা কথায় কথায় রাগ দেখাতে শুরু করেন, তাহলে কিন্তু বেজায় বিপদ!

৪. হজম ক্ষমতা কমে যায় : একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে রাগের মাত্রা বাড়তে থাকলে শরীরে হরমোনাল চেঞ্জ হতে থাকে। সেই সঙ্গে পাচক রসের ক্ষরণও কমে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস-অম্বল এবং বদ-হজমের মতো সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে।

অনেক সময় রাগের কারণে ক্রণিক অ্যাবডমিনাল পেইন হওয়ার মতো সমস্যাও হয়ে থাকে। তাই সাবধান!

৫. ইনসমনিয়া: যেমনটা আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে রাগের সময় মস্তিষ্কের অন্দরে স্ট্রেস হরমেনের ক্ষরণ মারাত্মক বেড়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঘুম উড়ে যায়। আর ঘুম ঠিক মতো না হাওয়া মানে শরীরে একাধিক রোগের আক্রমণ বেড়ে যাওয়া। তাই তো দীর্ঘকাল যদি সুস্থ থাকতে চান, তাহলে রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিখুন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.