কতটা বদলে যাচ্ছে সৌদি আরব

আনিসুর রহমান এরশাদ

সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ঘোষিত আর্থসামাজিক সংস্কার কর্মসূচি ‘ভিশন ২০৩০’- এর অংশ হিসেবে বিনোদন খাতে বিপুল অর্থের বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
সৌদি আরবে ৩৫ বছরেরও বেশি সময় পর ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর থেকে চলচ্চিত্র প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বাণিজ্যিক সিনেমা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া ও সিনেমা হলের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৩ জানুয়ারি থেকে অস্থায়ী প্রোগৃহে শিশুদের অ্যানিমেশন ছবিসহ চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু হয়েছে। জেদ্দা শহরে একটি সাংস্কৃতিক হলে প্রজেক্টর ও লালগালিচা বসিয়ে প্রোগৃহ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ‘দ্য ইমোজি’ সিনেমাটি সপরিবারে সিনেমা হলে গিয়ে দেখেছেন অনেকে। আগামী মাসেই সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে। স্থায়ী প্রোগৃহ উদ্বোধন হচ্ছে, ফ্যাশন সপ্তাহও হতে যাচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে ৩০০ সিনেমা হল তৈরি করবে সৌদি সরকার। সিনেমা শিল্পই শুধু নয়; বিনোদন শিল্পের উন্নয়নে ছয় হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে সৌদি আরব। আগে নির্মাতারা কাজের জন্য দেশের বাইরে যেতেন এবং সেগুলো এনে সৌদি আরবে দেখাতেন। এখন বিনোদনসংক্রান্ত সব কিছু দেশটিতেই হবে। তবে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমাগুলো যেন নৈতিক মূল্যবোধের বাইরে না যায় সেদিকেও খেয়াল রাখতে বলা হয়েছে। অবশ্য দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ আল শেখ বলেন, সিনেমা প্রদর্শনের অনুমোদন নৈতিকতাকে দূষিত করবে।
২০১৩ সালে কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ইসলামি রীতিতে পুরো শরীর ঢেকে সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি পেয়েছিল সৌদি নারীরা। আর ২০১৮ সালের জুন থেকে নারীরা গাড়িও চালাতে পারবেন। গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাওয়ার জন্য নারীদের পুরুষ অভিভাবকদের অনুমতি নিতে হবে না, স্বতন্ত্র লাইসেন্স পাবেন এবং ইচ্ছানুযায়ী যেকোনো জায়গায় গাড়ি চালাতে পারবেন।
এখন সৌদি নারীরা স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার সুযোগ পাচ্ছে, ঘরোয়া কনসার্ট-কমেডি শোতে অংশগ্রহণ করছে। রিয়াদের কিং ফাহাদ স্টেডিয়ামে এক অনুষ্ঠানে নারীরা অংশগ্রহণ করেছে। ২০১২ সালে দেশের প্রথম নারী প্রতিযোগী হিসেবে অলিম্পিকে অংশ নেন দু’জন ক্রীড়াবিদ। তাদের মধ্যে সারাহ আত্তার নারীদের ৮০০ মিটার দৌড়ে লন্ডন অলিম্পিকের ট্র্যাকে নেমেছিলেন হিজাব পরে। ২০১৬ সালের অলিম্পিকে চারজন নারী অলিম্পিকে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
সৌদি আরবে নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনায় নানাভাবে ভূমিকা পালন করছেন। ২০০৯ সালে বাদশাহ আবদুল্লাহ কেন্দ্রীয় সরকারে প্রথম নারীমন্ত্রী নিয়োগ করেন। নূরা আল কায়েজ নারীবিষয়ক শিাপ্রতিমন্ত্রী হিসেবে সরকারে যোগ দেন। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাদশাহ আবদুল্লাহ শূরায় প্রথমবারের মতো ৩০ জন নারীকে শপথবাক্য পাঠ করান। ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো দেশটির কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের মুঠোফোন ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে পৌরসভা নির্বাচনে প্রথম প্রার্থী ও ভোটার হওয়ার সুযোগ পায় নারীরা। প্রথমবারের মতো ভোট দেয়ার এবং নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পেয়েও ওই নির্বাচনে ২০ জন নারী নির্বাচিত হন।
দেশটির ব্যবসায় ও বিনিয়োগ মন্ত্রণালয় বলেছে, অভিভাবকের কাছ থেকে পাওয়া অনুমতিপত্র থাকার প্রমাণ ছাড়াই এখন নারীরা ব্যবসায় শুরু করতে পারবেন এবং সরকারের ই-সেবাগুলো ভোগ করতে পারবেন। দেশটির পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় প্রথমবারের মতো নারী তদন্তকারী নিয়োগ করছে।
সৌদি নাগরিকেরা বাহরাইন, আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ সফর করে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এসব টাকা দেশেই ধরে রাখতে চায় দেশটি। পর্যটনশিল্প বিকাশে রিয়াদের কাছে ‘লাস ভেগাসের’ আদলে সাড়ে ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিনোদন শহর নিওম গড়া হচ্ছে; যা হবে ভবিষ্যৎ বিশ্বের স্বপ্নদ্রষ্টাদের শহর। শহরটি সম্পর্কিত প্রমোশনাল ভিডিওতে আছেÑ ‘নো রেসট্রিকশন, নো ডিভিশন, নো এক্সকিউজেস, এন্ডলেস পোটেনশিয়ালস।’ অর্থাৎ কোনো বিধিনিষেধ নয়, কোনো বিভাজন নয়, কোনো অজুহাতও নয়। ভিডিওতে হিজাবহীন নারীদের দেখা যাচ্ছে পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজে অংশ নিতে। লোহিত সাগরে পর্যটকদের জন্য বিলাসবহুল আবাসনের ব্যবস্থা হচ্ছে, নারীরা সেখানে বিকিনি পরতে পারবেন, উন্মুক্ত থাকবে বার। লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় নির্মিতব্য এ শহরটি হবে গোটা বিশ্বের প্রযুক্তি গবেষণার রাজধানী, সামাজিক বিধিনিষেধ ও যানজটমুক্ত। রিয়াদে সিডনির অপেরা হাউজের মতো করে নির্মাণ করা অপেরা হাউজই হবে দেশটির সাংস্কৃতিক জাগরণের কেন্দ্র; যেখানে আয়োজিত হবে কনসার্ট, দেশ-বিদেশ থেকে শিল্পীরা আসবেন, নারীরাও দর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন এসব অনুষ্ঠানে।
দুনিয়া ব্যাপকভাবে বদলে গেছে এবং এর সাথে তাল রেখে সৌদি নারীরাও বদলে গেছেন। সব মিলিয়ে অতীতের সৌদি আরব আর আজকের সৌদি আরবের মধ্যে যেমন অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন আরো অনেক বদলে যাওয়া সৌদি আরব দেখবে বিশ্ববাসী। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.