সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদে যুক্তদের ছাড় দেয়া হবে না : সংসদে প্রধানমন্ত্রী

সংসদ প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশকে নিয়ে আর কেউ ছিনিমিনি খেলুক সেটা আমরা চাই না। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদে যুক্ত কিংবা অপরাধী যেই হোক তাকে শাস্তি পেতেই হবে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না।

আজ বুধবার দশম জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি একথা বলেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এদিন সংসদে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ সমাপনী ভাষণ দেন।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রাষ্ট্রপতির অধিবেশন সমাপ্তির আদেশ পাঠ করার মাধ্যমে স্পিকার শীতকালীন অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের রায় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, আদালত রায় দিয়েছে। এখানে সরকারের তো কোনো হাত নেই। বিচারক রায় দিলেন কেন, সেজন্য অনেক বিএনপি নেতাও হুমকি দেন। তবে কী অপরাধীদের অভয়ারণ্য হবে বাংলাদেশ? এটা তো আমরা হতে দিতে পারি না।

খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে সামনে রেখে বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধনের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী কারাগারে যাবেন- সেটি আগেই তারা টের পেয়েছিল কি না জানি না। রায় হওয়ার আগেই রাতারাতি বিএনপি তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা পরিবর্তন করেছে। এই ধারায় দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নেতা হতে পারতেন না। রাতারাতি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বিএনপি দুর্নীতিকেই মেনে নিল, দুর্নীতিগ্রস্তকে নেতা হিসেবে মেনে নিল। যে দল দুর্নীতিকে নীতি হিসেবে নেয়, দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্তকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়- সেই দল দেশকে কী দিতে পারে?

দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার জনগণ ভোগ করবে। তার সরকার দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না। নিজেদের লোককেও ছাড় দেয়া হয় না। এমনকি মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে, যেকোনো সময় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আদালত থেকেও ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীনভাবে কাজ করছে। আমরা আইন মানি, কখনো নিজেদের দোষকেও ঢাকার চেষ্টা করি না।

তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে যে ধরনের মামলা দিয়েছে, সেই একই ধরণের মামলা তার বিরুদ্ধেও দেয়ার চেষ্টা করেছে। বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের একাউন্ট বন্ধ করে দিয়ে সব কাগজপত্র পরীক্ষা করেছে, এতটুকু ফাঁক পাওয়া যায় কি না। শত চেষ্টা করেও ট্রাস্টের এতটুকু অনিয়ম তারা পায়নি। তবে একাউন্ট বন্ধ করে দেয়ায় বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে প্রতিমাসে ১৬ থেকে ১৭শ’ শিক্ষার্থীকে যে আর্থিক সহযোগিতা দেয়া হয়, সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে ওই সময় অনেক শিক্ষার্থীর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। টাকার অভাবে গ্রেনেড হামলায় ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহতদের সহযোগিতা দেওয়া যায়নি। এতে তাদেরও অসহনীয় কষ্ট করতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়েরকৃত কোনো মামলাই প্রত্যাহার করতে দেইনি। আমি বলেছি, প্রতিটি মামলার তদন্ত হোক। কোথাও এতটুকু ত্রুটি ধরা পড়লে আমি বিচারের মুখোমুখি হবো। কারণ, আমরা রাজনীতি করে নিজের ভাগ্য গড়তে নয়, জনগণের ভাগ্য গড়তে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনযাত্রা উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা সম্পর্কে তিনি বলেন, সংসদ নেতা বলেন, এতিমদের জন্য টাকা এসেছিল ২৭ বছর আগে। কিন্তু সেই এতিম টাকা কোথায়? তখনকার দিনে দুই কোটি টাকার অনেক মূল্য ছিল। ওই সময় দুই কোটি টাকা দিয়ে ধানমন্ডিতে ৭-৮টি ফ্লাট কেনা যেত। সেই টাকার লোভ বিএনপি নেত্রী সামলাতে পারেননি। এতিমের হাতে একটি টাকাও তুলে দেননি, পুরো টাকাই মেরে খেয়েছেন।

তিনি বলেন, আমাদের কিছুই নেই। তবুও আমরা দু’বোন ধানমন্ডির পৈতৃক বাড়িটিও জনগণের জন্য দান করে দিয়েছি। অথচ বিএনপি নেত্রী এতিমের দুই কোটি টাকার লোভ সামলাতে পারলেন না। মামলা করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দুদক। এখানে সরকারের দোষ কোথায়? খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ১০৯ বার সময় নেয়া হয়েছে। ১০ বছর ধরে মামলা চলেছে। তারপর শাস্তি হয়েছে। শুরুতেই এতিমের টাকা দিয়ে দিলে তো এই মামলা চলতো না। কিন্তু লোভ সামলাতে পারেনি বলেই আজ এ অবস্থা।

খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওযার পর তার ছেলে তারেক রহমানকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার সমালোচনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বিএনপি নেত্রী জেলে যাওয়ার পর যাকে দায়িত্ব দেয়া হলো সেও দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ফেরারি আসামি। বিএনপির নেতৃত্বে কী একজনও ছিলো না যে তাকে দায়িত্ব দিতে পারতো? বিএনপির অধিকাংশ নেতার নামেই দুর্নীতির মামলা রয়েছে। কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে, কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত।সখালেদা জিয়া জানেন, যাদের দায়িত্ব দেবেন তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির মামলা রয়েছে। বিএনপির সবাই তো দুর্নীতিগ্রস্ত, সবার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। যদি তাই না হয়ে থাকে তাহলে বিএনপি নেত্রী দলে একজনকেও খুঁজে পেলেন না যাকে দায়িত্ব দিয়ে যাবেন। সবকিছু জেনেই বিএনপি নেত্রী যদি দন্ডপ্রাপ্ত তারেক রহমানের হাতে দায়িত্ব দিয়ে থাকলে কোন কিছু বলার নেই।

তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক দল দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজকে গ্রহণ করে, সেই দল কীভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারে? এরা হত্যা-দুর্নীতি-লুণ্ঠন-অর্থপাচার এসবই করতে পারে, জনগণের কল্যাণ করতে পারে না।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক স্বৈরশাসকদের দু:শাসন তুলে ধরে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন তবে স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতো।

তিনি বলেন, যারা হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল, তারাই বড় গলায় বলে বেড়ায় তারা নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছিল! তিনি প্রতিরাতে কারফিউ দিয়ে দেশ চালাতেন। অর্থাৎ বহুদলীয় গণতন্ত্র নয়, করাফিউ গণতন্ত্র দিয়েছিলেন। এটি জনগণতন্ত্র নয়, কারফিউ গণতন্ত্র।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে একজন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি আছেন, তিনি এখন বড় বড় কথা বলেন। সংসদে একটি গাধার গল্প বলেছিলাম। এতে তিনি নাকি মনোক্ষুণ্ণ হয়েছেন।

তিনি বলেছেন, তাদের মতো শিক্ষিত লোকদের গাধা বলা হয়েছে। আমি তো একটা গল্প বলেছিলাম মাত্র। এখন কেউ যদি নিজেকে গাধা বলে মনে করেন সেখানে আমার তো কিছু করার নেই।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর টাকায় ইত্তেফাক গঠন হয়েছিল। এটা আওয়ামী লীগেরও সম্পদ। অথচ সেই ইত্তেফাকের টাকায় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নিয়ে ওই ব্যক্তিটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। সেই ব্যক্তির মুখে এখন গণতন্ত্রের ছবক শুনতে হয়, গণতন্ত্রের সংজ্ঞা শুনতে হয়- এটাই দুর্ভাগ্যজনক। এই ব্যক্তিটি তার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে অনেকবার এসেছিলেন উপদেষ্টা হতে, তিনি করেননি। এ কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হলো। মামলা মোকাবেলার জন্য জোর করে বিদেশ থেকে ফিরে আসি। তখন তাকে ওই ব্যক্তিটি ফোন করে বলেছিলেন দেশে ফেরার দরকার নেই। তিনি বলেছিলেন, কেন আসবেন না। তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, মামলা মোকাবেলা করবেন।

তিনি বলেন, তখন তিনি বিরোধী দলের নেতা ছিলেন। কিন্তু তাকেই প্রথমেই গ্রেফতার করে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হলো। রাজনীতি থেকে বিদায় করতে অনেক ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচটি বছর ধরে তারা যে নির্যাতন করেছে তা কল্পনাও করা যায় না। তারা ক্ষমতায় থেকে একদিকে অত্যাচার করেছে, অন্যদিকে সীমাহীন দুর্নীতি করেছে।
বর্তমান সংসদকে কার্যকর ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভূমিকা রাখায় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। টানা দুই মেয়াদে তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত দেশ হিসেবে পালন করতে চাই। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। বাংলাদেশকে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলবোই।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.