রোহিঙ্গা সমস্যা ও প্রত্যাবাসন নিয়ে কথিত চুক্তি
রোহিঙ্গা সমস্যা ও প্রত্যাবাসন নিয়ে কথিত চুক্তি

রোহিঙ্গা সমস্যা ও প্রত্যাবাসন নিয়ে কথিত চুক্তি

আসাদ পারভেজ

২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট দিবাগত রাত ১টায় মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলে রোহিঙ্গা মুসলিম মানব সন্তানদের ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে যে বর্বর নিপীড়ন-নির্যাতন, জ্বালাও-পোড়াও, গণহারে ধর্ষণ ও নির্বিচারে শুরু হয়েছে, তাকে জাতিসঙ্ঘসহ সমগ্র বিশ্ব গণহত্যা বলে শনাক্ত করেছে। কী পরিমাণ নির্যাতন তারা করে যাচ্ছে, তার প্রমাণ শরণার্থীর ঢলÑ গত ২৪ আগস্টের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮Ñ এই স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে এসেছে ১০ লাখ ৬৮ হাজার ২৩৬ জন রোহিঙ্গা যারা প্রধানত মুসলমান, যা নিবন্ধিত হয়েছে বাংলাদেশে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় আরো লাখ তিনেক রোহিঙ্গা। সর্বসাকুল্যে বর্তমানে (২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮) বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে ১৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৩৬ জন রোহিঙ্গা অতি কষ্টে জীবনযাপন করছে।

এই বিপুল সংখ্যক নির্যাতিত শরণার্থী রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর একটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয় এই সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ও মিয়ানমারের পক্ষে স্টেট কাউন্সিল দফতরের মন্ত্রী কিয়াও তিন্ত সোয়ে সই করেন। চুক্তি অনুযায়ী আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু এবং তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে ১০ জন ও মিয়ানমারের পক্ষে দেশটির সমমর্যাদার কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১০ জন প্রতিনিধি থাকার কথা বলা হয়।

তাৎক্ষণিকভাবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা বলা হলেও দলিলটির শিরোনামে দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা (অ্যারেঞ্জমেন্ট) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, যাকে চুক্তিও নয়, স্মারকও নয়, ‘ব্যবস্থাপত্র’ বলাই সঠিক। আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক রাজনীতির কূটনৈতিক পরিভাষায় এ ধরনের ব্যবস্থাপত্রের হদিস পাওয়া যায়নি। তাই এ ধরনের ব্যবস্থাপত্রের কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই। অবশ্য নতুন এক ধারণার উদ্ভাবনের জন্য মিয়ানমারের কূটকৌশলী ও বাংলাদেশের সহজ-সরল কূটনীতিকদের ধন্যবাদ জানাই।

এটাকে ‘সমঝোতা স্মারক’ না বলার কারণ রয়েছে। দু’পক্ষের স্বাক্ষরে সম্পাদিত না হয়ে পৃথকভাবে দুটি দেশ মাত্র নিজ সিদ্ধান্ত জ্ঞাপন করেছে দুটি পত্রে। এতে রোহিঙ্গাদের নাম উল্লেখ না করে ‘রাখাইন রাজ্যের অধিবাসী’ যারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের ফিরিয়ে নেয়ার সমঝোতার কথা বলা হয়েছে। এতে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের ব্যাপারে সম্মতির কথা উল্লেখ করা হয়।

ব্যবস্থাপত্রটি স্বাক্ষরের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী বলেন, আমরা ১৯৯২ সালের চুক্তিই অনুসরণ করব। অকপটে স্বীকারোক্তির জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাই। এমন মন্তব্যের পর পাঠক সমাজে প্রশ্ন জাগে, ১৯৯২ আর ২০১৭ সাল কি এক? তা ছাড়া নিরাপত্তাসহ সব বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বক্তব্যসহ মুসলিম বিশ্ব ও জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন শর্তযুক্ত কর্মপন্থা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রহস্যজনক কোনো কারণে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ন্যায্য দাবিদাওয়া নিয়ে মিয়ানমারের সাথে শক্ত অবস্থানে যেতে পারেনি এবং আগামীতেও পারবে কি না সন্দেহ।

নিরাপত্তা পরিষদ অন্তত তিনবার রোহিঙ্গা নির্যাতন প্রসঙ্গে আলোকপাত করলেও চীন ও রাশিয়ার ভেটোর কারণে কোনো প্রস্তাব পাস হয়নি। চীন ও রাশিয়া সব সময় মিয়ানমারের পক্ষে। বিশ্বরাজনীতির ঘোলাটে সময়ে হয়তো মূলত অনির্বাচিত সরকার হওয়ার কারণে বর্তমানের বাংলাদেশ সরকার চীন ও রাশিয়ার চক্ষুশূল হতে চায় না। এ জন্যই হয়তো বারবার বাংলাদেশ-মিয়ানমারের যেকোনো শর্ত মেনে নিচ্ছে যাতে করে অন্তত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যায়। এতে নতুন প্রশ্ন দেখা দেয় : অতীতের বিশেষ করে ১৯৯২ সালের ব্যবস্থাপত্রটি কতটা গ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ এবং সবল কিংবা দুর্বল ছিল? সাংবাদিক কামাল আহমেদ এই বিষয়ে উপহাস করে প্রথম আলোতে লিখেছেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বড় মনের পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ যখন প্রশংসিত হচ্ছে তখন একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রতি উদার না হলে কি চলে?’

১৭৮৪ সাল থেকে রোহিঙ্গারা নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে এলেও আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫৮ সাল থেকে আসতে থাকে। তাদের শরণার্থী হওয়ার কারণে ১৯৭৮, ১৯৮২ বিশেষত ১৯৯২ সাল মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নাটকীয় চুক্তি সম্পাদন করেছিল। আজকের বাংলাদেশ সরকার তাই ৯২ সালের চুক্তিকে অনুকরণীয় আদর্শ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, ১৯৯২ সালের স্বাক্ষরিত এ রকম চুক্তির পরে মিয়ানমার টালবাহানা করে ১৯৯৪ সালের জুন মাসের পর আর একজনও ফেরত নেয়নি। অর্থাৎ যে চুক্তিকে আমরা অনুসরণ করতে চাই, সেই ৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ীই মিয়ানমার সে সময় বিশাল একটি অংশকে ফেরত নেয়নি।

বাংলাদেশে যখন রোহিঙ্গাদের ঢল নামে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসঙ্ঘের ৭২তম অধিবেশনে দাঁড়িয়ে রোহিঙ্গাদের পক্ষে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছেন। আমরা সেই দিন ভেবেছিলাম, এবার বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বসহ জাতিসঙ্ঘকে সাথে নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের বিষয়টি মিয়ানমার থেকে আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে আদায় করে নেবে। কিন্তু বাংলাদেশ ৯২ সালের চুক্তিকে মেনে নিয়ে ২০১৭ সালে আবারো রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার বিষয় উপেক্ষিত করল।

১৯৯২ কিংবা ২০১৭ সাল যাহোক না কেন, মিয়ানমারের একই কথা, একই ব্যবস্থাপত্র। ১৯৯২ ও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাবিষয়ে উভয় দেশের ব্যবস্থাপত্রের শর্তগুলো দেখলেই আমরা বুঝতে পারব, আমাদের পররাষ্ট্র নীতি কতটা দুর্বল। শর্তগুলো হলোÑ
০১. ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উল্লেখ করা যাবে না; ০২. নাম পরিচয় যাচাই-বাছাই করার পর নাগরিকত্ব নির্ধারিত হবে; ০৩. জাতিসঙ্ঘ বা কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি তারা মানবে না; ০৪. প্রত্যাবাসনে কোনো সময় সীমা তারা মানতে রাজি নয়; ০৫. প্রত্যাবাসনের পর রোহিঙ্গাদের নিজ বসতভিটায় প্রত্যাবর্তনের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারবে না; ০৬. যে জীবন-মরণ সমস্যার কারণে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসে, সেই জীবনের কোনো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে মিয়ানমার সরকার রাজি নয়।
১৯৭৮ সালের সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে দুই লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ছয় মাসের মধ্যে ফেরত গিয়েছিল। পরে ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে নাটকীয় সমঝোতার মাধ্যমে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত গেছে। অবশ্য ১৯৯৪ সালের পর তেমন কোনো রোহিঙ্গা ফেরত যায়নি।

তারপরও আমরা ২৩ নভেম্বর ২০১৭ সালের সমঝোতা স্মারক ‘অ্যারেঞ্জমেন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পারসনস ফ্রম রাখাইন স্টেট’ (রাখাইন রাজ্যের বাস্তুচ্যুত মানুষদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাপত্র)-এর ব্যাপারে আশাবাদী।
বিশ্ববাসী জানে, মিয়ানমার কথা দিয়ে কথা রাখতে জানে না। তা ছাড়া মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সমস্ত কার্যবিবরণীতেও সই করেনি এবং যেদিন সমঝোতা স্মারক সই হয়, সেদিনও এক হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হওয়ার যে কারণ, তা কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না।

চুক্তি সইয়ের পরে গত ৮৩ দিনে (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত) বাংলাদেশে এসেছে আরো ১০ হাজার ৫৮১ জন রোহিঙ্গা। ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢুকেছে ২১৩ জন। তবু আমরা এখনো আশাবাদী যে, রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো যাবে। আশা করা ছাড়া আমাদের সম্ভবত এখন কিছুই করার নেই।
সমঝোতা স্মারকে বলা আছে, ‘স্বেচ্ছায়’ যারা ফিরতে চাইবে, মিয়ানমার শুধু এদেরই ফেরত নেবে। প্রশ্ন জাগে, বাংলাদেশে ১৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৩৬ জন রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, তারা কি ‘স্বেচ্ছায়’ মিয়ানমারে ফেরত যেতে চাইবে?

১৯৯২ সালের সমঝোতার অধীনে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে মাত্র দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা ফেরত যায়। তার মধ্যে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে বন্দীশিবিরে রাখা হয়েছে। এবারের চুক্তিতে ফেরত নেয়া রোহিঙ্গাদের প্রথমে ‘অস্থায়ী পুনর্বাসন ক্যাম্পে’ রাখার কথা বলা হয়েছে। এরপর তাদের ফেলে আসা ঘরবাড়ি বা অন্য কোথাও পুনর্বাসন করা হবে। মিয়ানমারের আইন অনুযায়ী, পুড়িয়ে দেয়া ঘরবাড়ি সরকারি সম্পদ। এই বন্দীশিবির বা অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা আর নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারার কোনো নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে, তারা তাদের সম্পত্তির অধিকার ফিরে পাবে কি না তাও স্পষ্ট নয়।
মিয়ানমার বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের নামকাওয়াস্তে ফেরত নিয়ে ট্রানজিট ক্যাম্পে রাখতে চায়। তথাকথিত নিরাপত্তার নামে এখন পর্যন্ত আরাকানে এ রকম নিরাপত্তা ক্যাম্পে এক লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা ধুঁকে ধুঁকে মরছে। বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী ক্যাম্পে রাখা হবে। অথচ কতদিন সেখানে থাকতে হবে, তার কোনো সময়সীমা নেই।

ক্যাম্পে তাদের যাচাই-বাছাই হবে। সেই ‘যাচাই-বাছাই’য়ে তারা যে উতরে যেতে পারবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ব্যর্থ হলে তাদের ওপর যে বর্বরতা চলবে না, তার কোনো গ্যারান্টি কেউ দেয়নি। আন্তর্জাতিক মিডিয়ার তথ্যানুযায়ী, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি ও জমিসহ কোনো স্থাপনার চিহ্ন আজ আর আরাকানে নেই। তাহলে কোন ভরসায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আরাকানে যেতে চাইবে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে সর্বমোট ১৩ লাখ ৬৮ হাজার ২৩৬ জন রোহিঙ্গা আজ অবধি আছে। তাদের আগমন ১৯৭৮ থেকে শুরু করে ২০১৮ সনের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। স্রষ্টার প্রতিটি প্রাণীরই নিজ গৃহের প্রতি নাড়ির টান থাকে। সন্ধ্যা হলে পাখি তার ছোট্ট ঘরে ফেরার তাগিদে আকাশপানে উড়াল দেয়। তেমনি মানব সন্তানদের মধ্যেও বিরাজ করে নিজ গৃহে ঘুমানোর বাসনা।

জাতিসঙ্ঘের ঘোষিত, পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জাতিগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যে মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে এবং স্বল্প সময়ে অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। একটি জাতি তার ভাইদের কষ্টে নীরব থাকার মানে হলো, এই জাতির রাষ্ট্রব্যবস্থা হয় ভঙ্গুর না হয় স্বার্থান্বেষী। কিন্তু না, এমন হওয়ার সুযোগ নেই। ইসলামের অমিয় বাণী হলো- ওই মুসলিম শ্রেষ্ঠ, যার হাতে তার অপর ভাই নিরাপদ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে, সেখানে জাতিসঙ্ঘে প্রধানমন্ত্রীর উত্থাপিত কোনো প্রস্তাব কিংবা এর আংশিক চেতনারও প্রতিফলন ঘটেনি। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা এই দু’টি বিষয়ে আলোকপাত করা জরুরি ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। তা ছাড়া তুরস্ক, সৌদি আরব তথা ওআইসিসহ জাতিসঙ্ঘকে এই সমঝোতা স্মারকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন ছিল। যদি করা যেত তাহলে সমস্যাটির চূড়ান্ত সমাধানের একটি উপায় পাওয়া যেত। তা না হওয়াতে দুর্বল এই সমঝোতা স্মারকের শর্তানুযায়ী কিছু রোহিঙ্গা ফেরত গেলেও নির্যাতনের মুখে তারা আবার ফেরত আসতে বাধ্য হবে।

শরণার্থী ফেরত পাঠানোর কাজটি সফল না হলে, আরাকান রাজ্যকে রোহিঙ্গামুক্ত রাখার জন্য মিয়ানমার সরকারের যে পূর্বপরিকল্পনা ছিল এবং সেটাই কার্যত সফল হবে। আর যদি মিয়ানমার সফল হয়, তাহলে একটি প্রতিষ্ঠিত জাতিকে ধ্বংসের জন্য রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যে দীর্ঘশ্বাস পৃথিবীর বাতাসে মিশে যাবে, কখনো এর দায় এড়ানোর সুযোগ পাবে না আধুনিক বিশ্ব। এমন লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য আমাদের অবশ্যই ২৩ নভেম্বর ২০১৭ সমঝোতা স্মারক বাদ দিয়ে নতুন করে চুক্তি সম্পাদন করতে হবে। সে চুক্তির সাথে তুরস্ক, চীন-রাশিয়াসহ জাতিসঙ্ঘ জড়িত থাকবে। যে চুক্তি মোতাবেক, আরাকানের পৈতৃক ভূমি রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে বুকে টেনে নেবে এবং বার্মিজ সরকার ক্ষমা চাইবে।

পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে, রোহিঙ্গারা বর্তমানের অপরিপক্ব সমঝোতা স্মারকের কারণে মিয়ানমারে ফিরতে চাইবে না। এমতাবস্থায় বাংলাদেশকে লাখ লাখ নির্যাতিত ও অসহায় মানুষকে আরো দীর্ঘ সময় লালন-পালন করতে হবে। সরকার এই রোহিঙ্গার এক বিশাল অংশকে নোয়াখালীর ভাসান চরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করছে, তা এক দুর্বল সিদ্ধান্ত। কেননা আরাকানের নিকটবর্তী অঞ্চল কক্সবাজার-টেকনাফ থেকে সরিয়ে দেশের গভীরে নিয়ে গেলে এ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি কিছুটা কমে যাবে। এমনিতে আলোচ্য সমঝোতা স্মারকের কারণে দাতাদের আগ্রহ অনেকটা কমে গেছে।

লেখক : গবেষক ও গ্রন্থকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.