আ মরি বাংলা ভাষা : রঙের ঝলক

রফিকুল আমীন খান

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এখন কেবল ৬৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায়ই নয়, এর ব্যাপ্তি পৃথিবীজুড়ে। জাতিসঙ্ঘের কল্যাণে বাংলা ভাষার মাধুর্য দুনিয়াজোড়া। এটা সম্ভব হয়েছে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাদিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ায়। কিন্তু যে ভাষার জন্য আমাদের, এত প্রাণ, এত রক্ত! অকাতরে প্রাণ দেয়া এ রকম বিরল ঘটনার সাক্ষী কেবল আমরাই। রফিক, সালাম, বরকতের মতো তরুণেরা ছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। তাদের প্রাণের বিনিময়েই বাংলা আজ বিশ্বে ৩০ কোটি মানুষের মুখের ভাষা। তাদের রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা উচ্চমর্যাদায় আসীন।
কিন্তু এত সব অর্জনের পরও আমরা কি পেরেছি ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে? আমরা ব্যবহারিক জীবনে, সরকারি কাগজপত্রে এমনকি পত্রপত্রিকায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুদ্ধ বাংলা লেখায় মনোযোগী হইনি। সভা-সমিতি অনুষ্ঠানের আলোচনা সংলাপে এবং বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে শুদ্ধ বাংলা বলার অভ্যাস আয়ত্ত করিনি। আমরা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ করতে গিয়ে অশুদ্ধ উচ্চারণ করে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করছি। শুধু তা-ই নয়, ভাষার ভুল ধরতে গিয়েও ভুল করে ‘ভূল’ লিখি হামেশা। রাস্তার দুই পাশের সাইনবোর্ড, ব্যানার, দেয়াল লিখন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যবহারকারীদের বাংলা লেখা দেখলেই এই দুরবস্থা চোখে পড়ে। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডেও দেখা যায় ভুল বানান লেখা। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল বানানে লেখাগুলো এখন হাস্যরসের খোরাক জোগাচ্ছে।
এ নিয়ে সচেতনতা এক আধটু যা দেখা যায় এই ভাষার মাসে, তাও কেবল মিডিয়ার বদৌলতে। তবে এতে কাজের কাজ যে কিছু হচ্ছে না, তা নয়। কিছুটা হলেও হচ্ছে। অনেকে উদাসীনভাবেই বাংলা ভাষাকে বিকৃতি করে উচ্চারণ করছে। এ বিষয়ে ঢাকা কলেজের ছাত্র মহসিন বলেন, ‘বাংলা ভাষার প্রতি আমরা একটু উদাসীন হয়ে গেছি। মনে করি একটা হলেই হলো। আমরা যারা ছাত্র শুধু তারাই নয়, অনেক সময় দেখি শিক্ষকেরাও শুদ্ধ উচ্চারণ নিয়ে উদাসীন। এটা দুঃখজনক। সে কারণে আমরা শোধরানোরও জায়গা পাচ্ছি না।’
দিন যত গড়াচ্ছে ভাষার এহেন দুর্দশা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। যদিও আজ থেকে তিন-চার দশক আগেও এ রকমটা ছিল না। তরুণ প্রজন্মের কাছে বিকৃত উচ্চারণে কথা বলা অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। বিকৃত উচ্চারণে কথা বলে মজা পায় তারা। আমাদের এ প্রজন্মের অনেকেই ইংরেজি শব্দ উচ্চারণে যতটা পারদর্শী এবং ইংরেজিতে কথা বলার ব্যাপারে যতটা সচেতন বাংলা শব্দ উচ্চারণে ততটা নয়। বাংলা ভাষার এই উচ্চারণ এখন নাটক-সিনেমায়ও স্থান করে নিয়েছে। এতে ভাষার কী ক্ষতি হলো তা নিয়ে ভাবার সময় নেই যেন কারো। অথচ উচ্চারণের শুদ্ধতা রক্ষিত না হলে ভাষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। তাই শুদ্ধ উচ্চারণ এক দিকে যেমন ঠিকভাবে মনোভাব প্রকাশে সহায়ক, তেমনি শব্দের অর্থবিভ্রান্তি ও বিকৃতি ঘটা থেকেও মুক্ত রাখে। তাই বিশুদ্ধ উচ্চারণের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
হয়তো বাংলা ভাষা দুরবস্থার কথা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। যাটের দশকে একদিন তাকে সাংবাদিক ও লেখক ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সম্পাদক সৈয়দ জিয়াউর রহমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিনতলার একটি কেবিনে দেখতে গিয়েছিলেন। দু’জনের কথাবার্তার একপর্যায়ে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তাকে আসন্ন একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস উদযাপন প্রসঙ্গে জাতীয় জীবনের সবপর্যায়ে মাতৃভাষা প্রচলনের আবশ্যিকতা বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা ভুলে যেয়ো না বাংলা একটি সমৃদ্ধ ভাষা; জীবনের সর্বস্তরে এই ভাষার প্রচলন না হলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করাটা অর্থহীন হয়ে পড়বে।’ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আরো বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষার যদি যথার্থ মর্যাদা রক্ষা করতে হয় তাহলে এই ভাষা লিখতে হবে শুদ্ধ করে, উচ্চারণ করতে হবে শুদ্ধ।’
কিন্তু বাংলা শব্দের উচ্চারণের এত বিকৃতির কারণ কী? অশুদ্ধ উচ্চারণের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। যেমনÑ উচ্চারণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুর্বলতা, প্রচারমাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে অশুদ্ধ উচ্চারণ, আঞ্চলিক উচ্চারণ প্রবণতা। ক্ষেত্রবিশেষে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ভুল উচ্চারণে শ্রোতা এবং অনুসারীরা ভুল উচ্চারণ শিখছে। শিশুদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারটি বেশি প্রযোজ্য। শিশুরা স্বভাবতই অনুকরণপ্রিয়। তারা যেভাবে শেখে এবং শোনে সেভাবেই উচ্চারণ করে থাকে। শিক্ষক ও বয়োজ্যেষ্ঠদের এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। বাবা-মাকে যতটা সম্ভব বাংলা শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণে সন্তানদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষক, অন্যান্য অভিভাবক, নাটক-সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী, সংবাদ পাঠক-পাঠিকাসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ নিশ্চিত করতে।
এ ছাড়া তরুণ প্রজন্মকে বাংলা শব্দের বানান ও উচ্চারণে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে। এই যেমন ইংরেজি অলিম্পিয়াড করা হয়। বাংলা শব্দের বানান ও উচ্চারণ নিশ্চিত করতে এ রকম অলিম্পিয়াড করা যেতে পারে। বাংলা ভাষার উৎকর্ষবিধানে এমন উদ্যোগ অবশ্যই সুফল বয়ে আনবে। দরকার উদ্যোগের।
এ বিষয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রফিকুজ্জামান বলেন, বানান নিয়ে অসচেতনতার একটি বড় কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলার প্রতি অবহেলা। এখানে পরিবারের একটি দায়িত্ব আছে, এরপর আছে স্কুলের দায়িত্ব এবং সবশেষে সমাজের দায়িত্ব রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সবশেষ কথা হচ্ছে, বাংলা বানান ও শুদ্ধ উচ্চারণ নিয়ে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো উপযুক্ত শিক্ষা এবং সরকারি উদ্যোগ। এ দু’টির কোনো বিকল্প নেই। এ দু’টি যত তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করা যায় ততই আমাদের ভাষার জন্য মঙ্গল। শুদ্ধ বানান ও শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলা চাইÑ এটাই হোক ভাষার মাসে আমাদের প্রত্যয়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.