প্রাণের মেলার শেষলগ্নে রঙের ফিচার

আলমগীর কবির

বছরজুড়ে অনেক মেলা হয়, থাকে মানুষের সমাগমও। কিন্তু সবার কাছে প্রাণের মেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায় কেবল একুশে বইমেলা। দীর্ঘ ১১ মাস অপেক্ষার পর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই মেলার আয়োজন হয়। দেশের সৃজনশীল প্রকাশনা ও বইয়ের প্রতি পাঠকের মনোযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে একুশে বইমেলার গুরুত্ব অনেক। এই একটি মেলার মাধ্যমে দেশের মানুষ মহান ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতাযুদ্ধ সর্বোপরি দেশের সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অর্ঘ্য তুলে দেয়। আর তাই এটি শুধু একটি বইমেলা নয়, মানুষে মানুষে মহামিলনের একটি বড় আয়োজন। এই মেলাকে কেন্দ্র করে বৃহৎ পরিকল্পনাও সাজান অনেকে। সৃজনশীল পরিবারে বই কেনার ধুম পড়ে যায়।
২৮ দিনের এই মেলা শেষ হবে আগামীকাল বুধবার। মেলার সময়টাতে ছুটির দিন গুলোতে মানুষের উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। বিক্রেতারা জানিয়েছেন বিক্রি ভালো। বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ তথ্য কেন্দ্র বলছে, মেলার প্রথম ২১ দিনে তিন হাজার ৩৫৯টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে।
মেলায় আগতরা সবাই বই কেনেন তা নয়, অনেকে আছেন রাশি রাশি বই দেখে আনন্দ পান। নইলে ধুলোয় অ্যালার্জি জেনেও কেন যানজট এড়িয়ে উত্তরা থেকে মেলায় এলেন মিজানুর রহমান? অন্যপ্রকাশের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, মেলায় এত এত বই, দেখেও ভালো লাগে। কিন্তু মনে সাধ হলেও সাধ্যে কুলাবে না।
এই হচ্ছে বাস্তবতা। সব কিছু সাধ্যে কুলাবে না। কিন্তু এতে কিছু এসে যায় না। সব বই কিনতে হবে এমনও নয়। মেলার প্রায় সব প্রতিষ্ঠান বইয়ের তালিকা ছাপায়, সেটা দেখে নির্বাচিত বইগুলো কিনলে আক্ষেপ অনেকাংশে কমে। এবার বইমেলায় ঢোকার জন্য ১৭টি প্রবেশপথ রয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার মূল প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকেই বাংলা একাডেমির প্যাভিলিয়ন। তারা জানিয়েছেন, এবারো তাদের সবচেয়ে বিক্রীত বইয়ের তালিকায় ছিল ‘অভিধান’। একটু এগিয়ে গেলে হাতের ডান পাশে মিলবে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। তাদের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের মধ্যে ছিলÑ হাসান আজিজুল হকের ‘রাই কুড়িয়ে বেল’, রিজিয়া রহমানের কয়েকটি সংকলন ‘ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক উপন্যাস’।
মেলার ঠিক মাঝখানে অন্য প্রকাশের প্যাভিলিয়ন। ছিমছাম সুন্দর। চার পাশ থেকে কেনার সুযোগ। স্টলের মাথায় জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের ছবি সংবলিত সাজসজ্জার দিকে একটি মেয়ে তাকিয়ে আছে অনেকক্ষণ। যেন নীরবে মেয়েটি হুমায়ূন আহমেদকে স্মরণ করলেন। এরপর কয়েক কদম এগিয়ে গেলেন স্টলে সাজিয়ে রাখা বইগুলোর কাছে। হুমায়ূন আহমেদের লেখা বেশ কিছু বই কিনলেন।
বইগুলো কিনে মেয়েটি চলে গেলেন নীরবে। ঠিক এমনিভাবেই নন্দিত এই লেখক তার পাঠক তথা ভক্তদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম বলেন, এখনো হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ওনার পরে সুমন্ত আসলামের বই ভালো চলছে।
অন্য প্রকাশের পর চোখ পড়ল তাম্রলিপিতে। এই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী তরিকুল ইসলাম রনি বলেন, অন্য সব বছর মেলা উদ্বোধনের পর তেমন দর্শনার্থী দেখা না গেলেও এবার কিন্তু তা হয়নি। আমরা এবার দেখেছি, বইমেলা উদ্বোধনের পরপরই মেলায় পাঠকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বইমেলার আবেদন আমাদের কাছে অন্যরকম। এবারের বইমেলার সাজসজ্জা নিয়েও আমি বেশ সন্তুষ্ট। মেলার আয়তন বেড়েছে। পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গাও আছে। এ বছর আমাদের তাম্রলিপি থেকে প্রায় ১২০টি নতুন বই প্রকাশ হয়েছে।
শিশুপ্রহর
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মেলায় সংযোগ হয়েছে শিশুপ্রহর। প্রতি শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত শুধু শিশুদের জন্য মেলা প্রাঙ্গণ উন্মুক্ত রাখা হয়। এর ফলে মেলার বড় আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় শিশুদের নিয়ে পারিবারিক ভ্রমণ। গত শুক্রবার অনেকেই এসেছেন তাদের সন্তানদের নিয়ে। জানতে ইচ্ছে করে, কী ধরনের বই পছন্দ করে এই শিশুরা। মোহাম্মদপুর থেকে এসেছে দুই বোনÑ মাইশা ও হৃদিকা। ওরা কিনছে ‘রঙিন আলোর ছবি’ নামে একটি ছড়ার বই। সায়েম দেখছিল সাকিব আল হাসানের ‘হালুম’ বইটি। ওর বোন মাফিন জানান, বইয়ের খুব নেশা সায়েমের। সায়েমের বয়স জানতে চাইলে তিনি বলেন, এইট প্লাস। ‘কোন ধরনের বই পছন্দ?’ ‘ভূতের বই কিনব’।
মেলায় নতুন সংযোজন
ওয়াচ টাওয়ারে বসে আছেন নিরাপত্তাবাহিনীর একজন সদস্য। তার দু’চোখে সতর্ক দৃষ্টি। সারাক্ষণ বাইনোকুলার দিয়ে এদিক-ওদিক দেখছেন। একুশে বইমেলায় এবার এটি নতুন সংযোজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কড়া সতর্কতার অংশ হিসেবে এবার বইমেলায় একাধিক ওয়াচ টাওয়ার বসানো হয়েছে। পাশাপাশি মেলাজুড়ে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। মেলা চলাকালে এই ক্যামেরার ম্যাধমে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য দায়িত্ব পালন করছে একটি বিশেষজ্ঞ দল। এবার প্রতিদিন মেলা শেষ হওয়ার আধা ঘণ্টা আগে সাইরেন বাজানো হচ্ছে।
গুলতেকিনের বই
এবারের বইমেলায় কবিতার বই দিয়ে সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ করেছেন পরলোকগত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন। মেলায় তার লেখা প্রথম কবিতার বই ‘আজো, কেউ হাঁটে অবিরাম’ প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি। ‘গুলতেকিন আহমেদ’ হিসেবে পরিচিতি থাকলেও বইতে তার নাম লেখা হয়েছে গুলতেকিন খান। তাম্রলিপির প্রকাশক তারিকুল ইসলাম রনি বলেন, ‘বইমেলার প্রথম দিন থেকে আমাদের স্টলে গুলতেকিন খানের বইটি পাওয়া যাচ্ছে। বইটিতে ৩৫টি কবিতা রয়েছে। ধ্রুব এষের আঁকা প্রচ্ছদে বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ১৩৫ টাকা।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.