ঢাকায় মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে মশারির ভেতরে ঢুকলেই কেবল নিরাপদ। তাই এমন আনন্দ!
ঢাকায় মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে মশারির ভেতরে ঢুকলেই কেবল নিরাপদ। তাই এমন আনন্দ!

মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ রাজধানীবাসী

মাহমুদুল হাসান

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার জলাশয়গুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এগুলো মশার প্রজনন ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ময়লা-আবর্জনা ভরা ডোবা ও খালগুলোয় পলিথিন এবং প্লাস্টিকের বোতল জমে থাকায় ও পানি ঠিকমতো নামতে না পারায় দূষিত পানিতে মশার জন্ম হচ্ছে। মিরপুর কালসী এলাকার বাসিন্দা ইমতিয়াজ হক বলেন, মশার দাপটে কোনো দিন ভুলে জানালা খোলা থাকলে সেদিন আর কোথাও দুই মিনিট বসা যায় না। মশার ভয়ে সারা দিনই দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে হচ্ছে।
বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার উপদ্রব। বছরে এ খাতে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি খরচ হলেও মশা কমছে না। আর বর্তমানের ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই সিটি করপোরেশনেরও কোনো খেয়াল নেই। এ কারণে ক্ষুব্ধ নগরবাসী।
বিভিন্ন এলাকার মানুষ অভিযোগ করেছেন, তাদের এলাকায় প্রতিদিন মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয় না। দিনেই মশার যন্ত্রণায় তারা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। রাত হলে এ যন্ত্রণা আরো বাড়ে। কয়েল, মশারি, ওষুধ স্প্রে কোনো কিছুতেই মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।
রামপুরার বাসিন্দা হুমায়ুন বলেন, এই এলাকায় সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটায় না। স্বাভাবিক সময় মশার কয়েল বা স্প্রে করলে মশা নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু মশার প্রজনন মওসুমে কয়েল জ্বালিয়ে বা স্প্রে করেও মশার উপদ্রব থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। প্রায় এক মাস আমরা মশার উপদ্রবের মধ্যে আছি। কিন্তু সিটি করপোরেশনের কোনো কার্যক্রম লক্ষ করছি না। খাল ও ডোবা-নালাগুলো পরিষ্কার করে দিলে মশার উপদ্রব থেকে কিছুটা হলেও নিস্তার পেতাম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কচুরিপানা পরিষ্কার ও মশার ওষুধ কেনার জন্য প্রতি বছরে দুই সিটি করপোরেশনকে ৫০-৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু দুই সংস্থা নামকাওয়াস্তে কিছু কাজ করে বাকি টাকা কৌশলে লুটপাট করছে। সঠিকভাবে ডোবা, জলাধার পরিষ্কার করা হচ্ছে না। মানহীন মশার ওষুধ কেনার কারণে ওই ওষুধে কাজ হচ্ছে না। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মশকনিধন কর্মীরা মানহীন ওই ওষুধও নিয়ম মেনে ছিটায় না। বাইরে এসব ওষুধ বিক্রি করে দেয়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা মশক নিবারণী দফতর মিলিয়ে রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে প্রায় এক হাজার মশক শ্রমিক। নিয়ম অনুযায়ী এসব শ্রমিক সকালে লার্ভা নিধনে ড্রেনে বা পানি জমে এমন জায়গায় ওষুধ ছিটাবে এবং বিকালে উড়ন্ত মশা মারতে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটাবে। প্রত্যেক এলাকায় প্রতিদিন সকাল-বিকেল এ কার্যক্রম করার কথা থাকলেও কালেভদ্রে চোখে পড়ে মশকনিধন কর্মীদের চেহারা।
অভিজাত বনানী এলাকার বাসিন্দা সাইফুল হক জানান, সিটি করপোরেশনের মশক নিধন শ্রমিকদের সকাল-বিকেল দুইবার মশক ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও তারা সেটা করেন না। বেশির ভাগ মানুষের অভিযোগ, মাসে সর্বোচ্চ দুইবার দেখা মিলে মশকনিধন শ্রমিকদের।
উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের ৩০ নম্বর সড়কের বাসিন্দা পলাশ বলেন, এই এলাকায় মশা নিধন শ্রমিকদের দেখাই মিলে না। দিনে দুইবার ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও মাসেও একবার দেখা মেলে না। প্রায় এক মাস হতে চলল মশার উপদ্রব বেড়েছে। এলাকাবাসী স্থানীয় কাউন্সিলরকে বিষয়টি জানালেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না।
তবে মন্ত্রিপাড়াসহ কিছু ভিআইপি এলাকা এবং কিছু ভিআইপি লোকের বাসার আশপাশের পরিচ্ছন্নতা ও মশকনিধন-কার্যক্রম সঠিক নিয়মে পরিচালিত হয়। আর অন্যান্য এলাকায় মশকনিধন শ্রমিকদের দেখাই মেলে না। পুরান ঢাকার হাজারীবাগ, লালবাগ, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর এবং বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া থেকে স্থানীয় কাউন্সিলরদের কাছে অভিযোগ গেলেও সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না দুই সিটি করপোরেশন। জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাহুল ইসলাম বলেন, এমন আবহাওয়ায় মশার উপদ্রব কিছুটা বেড়ে যায়। আমরা পুরো টিম নিয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে কাজ শুরু করছি। এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো: বিলাল বলেন, মশক নিধনের রুটিন-কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এখন মশার প্রজনন মওসুম হওয়ায় উপদ্রব কিছুটা বেড়েছে। আমাদের কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে। আশা করি অল্প সময়ের ব্যবধানে মশা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য পাঁচ থেকে ছয়জন করে কর্মী নিযুক্ত আছেন। তারা দিনে দুইবার ওষুধ ছিটানোর কাজ করেন। তবে সিটি করপোরেশন এমন দাবি করলেও নগরবাসী এই দাবি মানতে নারাজ। গত বছর মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্তের সংখ্যাই তার প্রমাণ। এডিস অ্যালবোপিকটাস ও এডিস এজেপটি প্রজাতির মশার কামড় থেকে চিকুনগুনিয়া রোগের উৎপত্তি। গত বছরে রাজধানীর অনেকেই এ রোগে কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয়েছে।
মশা না কমা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্নভাবে ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ধ্বংস করতে হবে। মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সাথে জড়িত লোকজনের দক্ষতা বাড়াতে হবে। মশার ওষুধগুলো কাজ করছে কি না, কোন ধরনের ওষুধ দেয়া প্রয়োজন, সে সব বিষয়ে গবেষণা জরুরি।
মহাখালীর জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, চিকুনগুনিয়া ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মাথাব্যথা, সর্দি, বমি বমি ভাব, হাত ও পায়ের গিঁটে এবং আঙুলের গিঁটে ব্যথা হতে পারে। এ ভাইরাস মশা থেকে মানুষের শরীরে আসে। আবার আক্রান্ত মানুষকে কামড় দিলে মশাও আক্রান্ত হয় এবং বাহক হিসেবে আবার মানবদেহে প্রবেশ করে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.