ভাষা আন্দোলনে নারী

মাকসুদা রহমান

এ দেশের যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে নারীরা থেকেছে সামনের কাতারে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতির সবচেয়ে গৌরবজনক অধ্যায়। সেদিনের সে রক্ষণশীল সমাজেও নারীরা চুপ করে বসে থাকেনি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও নেমে এসেছিল রাজপথে। পুলিশের নির্যাতন, গ্রেফতার, জুলুম সব কিছুই সহ্য করতে হয়েছে ছাত্রীদের। এ আন্দোলনে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কলেজ এবং স্কুলের ছাত্রীরাও অংশ নিয়েছিল। এ নিয়ে লিখেছেন মাকসুদা রহমান
যেকোনো ঘটনায় নারীরা এগিয়ে এসেছেন সামনের কাতারে। শুধু সংসার সামলানো নয়, বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে নারীরা থেকেছেন সামনে; সেটি মুক্তিযুদ্ধ হোক কিংবা ভাষা আন্দোলন।
‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেখানে নারীরাও ছিলেন। ’৫২-এর ২১ ফেব্রæয়ারি ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করলেও এর সূত্রপাত হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনের পরপরই ভাষা আন্দোলন শুরু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে বিভিন্ন ¯েøাগানসংবলিত পোস্টার আঁকতেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি নারীরাই পুলিশের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে ব্যারিকেড ভাঙেন। আহতদের চিকিৎসায় বিশেষ ভ‚মিকা রাখেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রীরা।
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে বাংলা ভাষার দাবিতে গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিস। আবুল কাসেমের স্ত্রী রাহেলা বেগম, বোন রহিমা ও রাহেলার ভাইয়ের বউ রোকেয়া আন্দোলনকারীদের তার বাসায় রান্না করে খাইয়েছেন দীর্ঘ দিন। শুধু তা-ই নয়, ’৫২-এর ২৩ ফেব্রæয়ারি যখন আবুল কাসেম, আবদুল গাফফার প্রমুখ বাসায় ‘সৈনিক’ পত্রিকার কাজ করছিলেন, তখন পুলিশ বাসা রেট দিলে রাহেলা বেগমের বুদ্ধি ও সাহসিকতায় তারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় সভায় ছাত্রী প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ইডেন কলেজের ছাত্রী মাহবুবা খাতুন বলেন, বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা দাবি স্বীকার করিয়ে নেয়ার জন্য প্রয়োজন হলে মেয়েরা রক্ত দেবে। এক ছাত্রীর এ সাহসী কথা আন্দোলনকারীদের উজ্জীবিত করেছিল।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি ভাষার দাবিতে হরতাল আহŸান করা হলে সরকার ২০ ফেব্রæয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ ফেব্রæয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলার ছাত্রসমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয়। ১০ জন, ১০ জন করে বের হয়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা হয়। ২১ ফেব্রæয়ারি পুলিশের ব্যারিকেড ভাঙার মূল কাজ রওশন আরা বাচ্চুসহ কয়েকজন ছাত্রীর দ্বারাই হয়। কারণ, ১০ জন করে বের হওয়া প্রথম দু’টি দলের অনেকেই গ্রেফতার হন। ছাত্ররা ব্যারিকেডের ওপর ও নিচ দিয়ে লাফিয়ে চলে যান। তৃতীয় দলে বেরিয়ে ব্যারিকেড ধরে টানাটানি শুরু করেন ছাত্রীরাই। সেদিন পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেলে রওশন আরা বাচ্চুসহ অনেক ছাত্রীই আহত হন। রশন আরা বাচ্চুর আহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরো বেগবান হয়। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ইডেন কলেজসহ অন্য কলেজ থেকেও ছাত্রীরা মিছিলে যোগ দেন। রওশন আরা বাচ্চু ছাড়াও সেদিন সারা তৈফুর, শামসুন, সুফিয়া ইব্রাহিম, সুরাইয়া ডলি ও সুরাইয়া হাকিম আহত হয়েছিলেন।
ঢাকার বাইরেও ভাষা আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য নারীরা পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের মমতাজ বেগমের কথা সবারই জানা। মমতাজ বেগমের ছাত্রী ইলা বকশী, বেনুধর ও শাবানীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। সালেহা বেগম ময়মনসিংহ মুসলিম গার্লস স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্রী থাকাকালে ভাষাশহীদদের স্মরণে কালো পতাকা উত্তোলন করার অপরাধে স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হন।
এ ছাড়া জেলজুলুমের শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রী। তাদের মধ্যে লায়লা নূর, প্রতিভা মুৎসুদ্ধি, ফরিদা বারী, জহরত আরা, কামরুন নাহার লাইলি, ফরিদা আনোয়ার ও তালেয়া রেহমান উল্লেখযোগ্য।
সেই সময়ের রক্ষণশীল পরিবেশে ছাত্রীরা সব বাধাবিপত্তি দূরে ঠেলে ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন, এটা ছিল বিরাট ব্যাপার। আন্দোলনে অংশ নিতে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন নারীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধেও আমরা দেখি নারীদের সাহসী উপস্থিতি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.