তোমাকে নুনের মতো ভালোবাসি : চারাগল্প

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

নিদেনপক্ষে কম করে হলেও প্রায় জনা পঞ্চাশেক মানুষের শুভেচ্ছাবার্তা ইতোমধ্যে পেয়ে যায় সমীর। ফেসবুকের অবস্থা আরো নাদুসনুদুস। লাইক কমেন্টস ও ইনবক্সে রীতিমতো উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। মাত্র এক কবিতায় বাজিমাত। রাতারাতি পেয়ে যায় উদীয়মান কবির তকমা। ঘোরলাগা স্বপ্নে সমীরের বাঁধনহারা উল্লাসের মাত্রাটাও বেশি। কবিতাটাও দারুণ। বসন্তকে আহ্বান জানিয়ে লেখা। প্রেম-ভালোবাসার অপূর্ব ফিচারিং করা। সমীর খুশিতে গদ গদ হয়ে সাগ্রহে কবিতাটা সবাইকে দেখিয়ে যাচ্ছে। এই একটিমাত্র কবিতা সমীরের দিনলিপি হুট করে পাল্টে দিয়েছে। কথাবার্তা ও আচার-আচরণেও নিয়ে এসেছে মার্জিত ভাব। কবি (!) বলে কথা। পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান সমীর। আদর-আহ্লাদ ও গালভরা প্রশ্রয়ের সবটুকুই পেয়েছে। টেনেটুনে পেরিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ। কিন্তু সোনার হরিণ চাকরিটা মেলেনি। বিয়েটাও সদূরপরাহত। চালচুলোহীন ছেলের বিয়ে! পেটে ভাত নেই অনেকটা লেবু কচলানোর মতো। সঙ্গত কারণে সমীরের বাউণ্ডুলেপনা বেড়ে যায়। মাঝে মধ্যে এক-আধটু ছড়া বা কবিতা লেখার চেষ্টা ছিল। বিশেষত সুন্দরী নীলিমার সাথে সখ্য হওয়ার পর। নীলিমার দেয়া নীল ডায়েরিতে এগুলো যতœসহকারে লিপিবদ্ধ করে রাখত সমীর। ডায়েরির ওপর কালো মোটা হরফে লেখা ‘সমীরীয় পদ্য’। ওই দিকে বেলা বসে থাকে না। তৃষিত নয়নে সমীরের পথপানে চেয়ে থাকতে থাকতে তত দিনে নীলিমারও বিয়ে হয়ে যায়। অথচ আজ কবিতা প্রকাশ হওয়ার আনন্দে ওরই সবচেয়ে বেশি খুশি হওয়ার কথা। নীলিমা ওই দূর আকাশের নীল নীলিমায় হারিয়ে যায়। ধরে রাখার প্রচণ্ড আকুলতা থাকলেও সমীরের শক্তি পর্যাপ্ত ছিল না। পকেটে ফুটো পয়সা নেই, তার আবার বউ পোষা! অথচ মনে পড়ে সেদিনটির কথা। ফাগুনের প্রথম বিকেলে নীলিমাকে প্রপোজ করেছিল বিশেষ ঢঙে। নীলিমাও এসেছিল বাসন্তী সাজে। শাড়ি পরে। হাঁটুগেড়ে এক প্যাকেট মিহি নুন বাড়িয়ে সমীর বলেছিল, ‘তোমাকে নুনের মতো ভালোবাসি। ঠিক রাজকন্যার গল্পের মতো।’
নীলিমা প্রথমে কিছুটা চমকে গিয়েছিল। তারপর সে কী হাসি! হাসতে হাসতে পড়ে যাওয়ার অবস্থা।
সমীর এখন রীতিমতো হাওয়ায় ভাসছে। ফেসবুক ওপেন করে একটু পরপর আপডেট দিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ চক্ষুস্থির হয়ে যায় অপরাজিতা নামে এক মেয়ের কমেন্টস পড়ে। সে লিখেছে, ‘...এ দেশে কবি আর কাকের সংখ্যা তাহলে সত্যি সত্যি বেড়েই গেল! মহাশয়, আপনিসহ সংখ্যাটা যেন কত?’
নিঃসন্দেহে প্রচ্ছন্ন খোঁচা। এই ক’দিনে সে বুঝে গেছে তাকে কী করতে হবে। আপাতত প্রত্যেকটা কমেন্টস আর মেসেজের জবাব সুন্দর করে দিতে থাকে। সমীর অপরাজিতাকেও সুন্দর একটা জবাব লিখে দেয়, ‘আপনার মন্তব্যটা তীর্যক, তবুও ধন্যবাদ। আপাতত কাক আর কবির সংখ্যাটা আপনিই গণনা করুন। তবে এটাও স্মরণ রাখবেন, নামের সাথে অপরাজিতা জুড়ে দিলেই অপরাজিতা হয়ে যায় না। তাহলে কাক কবেই ময়ূর হয়ে পুচ্ছ দুলাতো!’
ব্যস, যুদ্ধের ডামাডোল বেজে ওঠে। জমে ওঠে খেলা। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি। যুদ্ধের পর নেমে আসে শান্তি। গড়ে ওঠে অপরাজিতার সাথে সমীরের সুসম্পর্ক। অপরাজিতা নিজেকে ফেসবুকের প্রোফাইলে গোপন করে রেখেছে লাল গোলাপের আড়ালে। মাঝে মধ্যে সমীর ভাবে অপরাজিতার আচরণ অনেকটা নীলিমার মতো। হয়তো মেয়ে বলেই এতটা মিল। সমীর ঠিক বুঝতে পারে না। যদিও নীলিমা তার কাছে এক হারানো অতীত। এ দিকে একটি স্বনামধন্য এনজিওতে চাকরি করছে অপরাজিতা। পাশাপাশি সমীরকে পেছন থেকে উৎসাহও দিয়ে আসছে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য। এক দিন সমীরের সামনে হুট করে খুলে যায় বিস্তৃত সম্ভাবনার দ্বার।
পাল্টে যায় সমীরের জীবনচিত্র। অপরাজিতার পরামর্শ ও সাহচর্যে সে জীবনকে সম্পূর্ণ নতুন করে বুঝতে শিখেছে। নিজের এলাকায় জনাকয়েক বেকার শিক্ষিত তরুণ ও তরুণীর সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে, ‘শিশু কানন একাডেমি’। প্রাথমিকভাবে নিজের শক্তির জায়গাটা বিবেচনা করে শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক পেশাটাকেই সে বেছে নিয়েছে। সাড়াও মিলেছে অভূতপূর্ব। শিক্ষকতার পাশাপাশি নিজেকে গড়ে তুলেছে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। ব্যাংক থেকে স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে নিজ বাড়ির পাশে পতিত এক বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছে সমন্বিত মৎস্য ও পোলট্রি খামার। সুযোগ পেলে আর্তমানবতার পক্ষে বিভিন্ন সামাজিক সেবামূলক কাজেও অংশগ্রহণ করে যাচ্ছে। সমীর এসব কাজ করতে পারার জন্য নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছে। একসময়ের বাউণ্ডুলে সমীরের এখন কোনো অবসর নেই। নেই অভাব-অনটনও। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে সেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও সমীর কবিতা লেখা ভোলেনি। সংগ্রামমুখর জীবনের নানা বাঁক ও ঘটনাপ্রবাহের জটিলতার বাস্তবচিত্র শিল্পিত শৈলীতে ফুটিয়ে তুলেছে কবিতার প্রতিটি চরণে।
বছর ঘুরে আজ আরেকটি পয়লা ফাগুন। সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের একটি দিন। শহরের বাঙলা রেস্তোরাঁয় অপরাজিতার অপেক্ষায় সমীর। তার পছন্দনীয় নীল শাড়ি পরে অপরাজিতার আসার কথা। হঠাৎ কেউ একজন পেছন থেকে এসে গভীর আবেগে মৃদু চিমটি কাটে। পেছনে ঘাড় ফিরিয়ে বিস্ময়ে চমকে ওঠে সমীর! খুব চেনা একটি মুখ হাঁটুগেড়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নুনের প্যাকেট!
‘‘সমীর তোমাকে নুনের মতো ভালোবাসি!’
‘একি (!) নীলিমা তুমি?
‘হ্যাঁ, আমি। অপরাজিতাই তোমার হারিয়ে যাওয়া নীলিমা!!
বাকরুদ্ধ হয় সমীর। হাজারো প্রশ্ন ভিড় করে। নীলিমা সমীরের হাত ধরে পাশাপাশি বসে। সবিস্তারে সব কৌতূহল মেটায়। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পক্ষে বর পক্ষের যৌতুক মেটাতে না পারায় নীলিমার বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হয়নি। নীলিমাও আর বিয়ে করেনি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো নীলিমার সব কথাই শুনে যায় সমীর। ক্লান্ত নীলিমা একসময়ে টিপ্পনী কাটে।
‘ওম্মা, আমি বলব? তুমি কিছু বলবে না?
‘নাহ, বলব না। শুধু নুনের মতো ভালোবাসি! এক সঙ্গে হেসে ওঠে দুজনে। বাঁধভাঙা হাসিতে লুটোপুটি খায়।
সদর দক্ষিণ, কুমিল্লা

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.