বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রাসঙ্গিক দৃষ্টি

আলী রেজা

বাংলা একটি ভাষা, বাংলা একটি দেশ, বাঙালি একটি জাতি। একটি ভাষা একটি জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের সাথে এমনভাবে মিশে আছে, যেন তা একটি অবিচ্ছিন্ন বন্ধন সৃষ্টি করেছে। এ বন্ধন যেন রক্তের বন্ধন। বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করেছে বাঙালি। বাঙালির ভাষাপ্রীতি যেমন ছিল, তেমনি ভাষার প্রতি অবজ্ঞাও ছিল। একটি শ্রেণী যে বাংলা ভাষার মূল্য দিতে চায়নি তার প্রমাণ আমরা পাই, মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিমের ক্ষোভ প্রকাশক উক্তিতে :
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশে ন যায়।
তখন থেকেই একটি অভিজাত শ্রেণী বাংলা ভাষাকে অবজ্ঞা করে আসছে। বর্তমানে অফিসিয়ালি বাংলা ভাষার মর্যাদা বেড়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসঙ্গে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় জননেত্রী শেখ হাসিনাও জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন। এতে অফিসিয়ালি বাংলা ভাষার মর্যাদা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের মূলেও রয়েছে বাঙালির মাতৃভাষা আন্দোলন। বর্তমান বিশ্বে প্রায় চল্লিশ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলছে। তবুও বাংলাদেশেই অবজ্ঞার শিকার বাংলা ভাষা। ফেব্রুয়ারি এলেই আমাদের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক এবং সচেতন মহল জেগে ওঠেন। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে কথা বলেন। আমরা বিশুদ্ধ বাঙালি হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। বাংলা বর্ণমালায় সজ্জিত পোষাক পরি। আমাদের সন্তানদের বাঙালি বানানোর ইচ্ছায় মেতে উঠি। কিন্তু ফেব্রুয়ারি চলে গেলেই আমরা বাঙালিয়ানার সেই খোলস ছুঁড়ে ফেলি। ফেব্রুয়ারি চলে গেলেই আমরা আমাদের সন্তানদের বিদেশী ভাষার গুরত্বের কথা বলি। বিদেশী ভাষা শেখাতে ব্যস্ত হয়ে উঠি। বিদেশী পোষাকে সজ্জিত করি। দু’লাইন ইংরেজি শেখানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করি ইংরেজি শেখাতে। বিশ্বায়নের এই যুগে ভাষা ও সংস্কৃতির আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করি। স্বীকার করি আমাদের নতুন প্রজন্মকে বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠতে হবে। তাই বলে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে নয়। দীর্ঘ দিন ধরে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের যে দাবি রয়েছে এবং যে দাবি ফেব্রুয়ারি আসলে আরো জোরদার হয়, সে দাবিটির বাস্তবায়নের জন্য সারা বছর সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়ে না। সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার তো হয়-ই না, বরং অনেক ক্ষেত্রে আমরা ইংরেজির পাশাপাশি তার বাংলা ভার্সনটাও লিখতে দেখি না। বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশী প্রতিষ্ঠান কিংবা বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের নামফলকে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাসম্বলিত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। তবে আদালতের এ নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে তদারকিও চোখে পড়ে না সারা বছর। কেবল একুশ এলেই আমরা অতিশয় ভাষাভক্ত ও ভাষাপ্রেমিক হয়ে উঠি। কিন্তু একুশের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করে আমরা সারা জীবনের জন্য বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হতে চাই না। এটা আমাদের জাতিসত্তার প্রতি অমর্যাদার শামিল।
বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি অবমাননা প্রদর্শনের আরো একটি বিষয় লক্ষণীয়, সেটি হলো- সারা দেশের বিলবোর্ডগুলোতে অসংখ্য বানান ভুলের ছড়াছড়ি। আমি নিজে দেখেছি একটি বিলবোর্ডে গাড়োবাজার লিখতে গিয়ে গাঢ়বাজার লেখা হয়েছে। আবার ভূঞাপুর লিখতে গিয়ে ভুয়াপুর কিংবা বুয়াপুর লেখা হয়েছে। শুধু বিলবোর্ড নয়, গণপরিবহনেও বিভিন্ন স্থানের নাম লিখতে গিয়ে ভুল বানান ব্যবহার করা হয়। সড়ক ও জনপথ বিভাগের মাইলস্টোনেও দেখেছি অনেক জায়গার নাম লেখা হয়েছে ভুল বানানে। এটিও বাংলা ভাষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা। অথবা সচেতনতার অভাব। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিলবোর্ড তদারকির জন্য আছে স্থানীয় সরকার, আছে স্থানীয় প্রশাসন। স্থান-নামের শুদ্ধ বানান রীতি প্রণয়ন করেছে বাংলা একাডেমি। আছে সঠিক বানান নির্দেশক বাংলাদেশ সরকারের গেজেট। তবুও ভুল বানান ব্যবহার হচ্ছে দেদারসে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি চোখে পড়ে না কখনো। এটাও বাংলা ভাষার প্রতি কর্তৃপক্ষীয় অবজ্ঞা। বাংলা ভাষায় কথা বলতে গিয়েও আমরা ভাষা বিকৃত করে ফেলি। অবহেলাজনিত এ বিকৃতি শিক্ষিত ও অশিক্ষিত উভয় শ্রেণীর মধ্যেই লক্ষ করা যায়। সন্তান ভালো ইংরেজি বলতে পারলে আমরা খুশি হই, ভালো বাংলা বলতে পারলে সেটা আমলেই নেই না। তাই অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো- ভাষা আন্দোলনের পৌনে শতাব্দী পূর্ণ হয়নি এখনো। অথচ ব্যবহারিক জীবনে বাংলা ভাষা অতিশয় অবহেলিত হয়ে পড়েছে। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য সর্বস্তরে বাংলা ভাষার শুদ্ধ ব্যবহার খুবই জরুরি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.