বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা

ইরফান চৌধুরী

বাংলা বিশ্বে অন্যতম বিজ্ঞানসম্মত ভাষা। এ ভাষা ঋদ্ধ ভাষা। পৃথিবীতে উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলা ভাষার বিশাল শব্দ ভাণ্ডার আছে। বাংলা শব্দের অর্থের সাথে শব্দের শাসনও আছে, আছে এক শব্দের সাথে অন্য শব্দের গাঁথুনি, অন্বয় ও মেলবন্ধন। বাংলা ভাষা শুধু উন্নত নয়; বিজ্ঞানসম্মতও। যেমন: ‘বৌ’ একটি শব্দ। বৌ যেমন মাথায় ঢাকা দিয়ে থাকে, তেমনই বৌ শব্দ ঢাকা আছে ‘ে ৗ’ কার দিয়ে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অসাধারণভাবে বাংলা ভাষায় কথা বলে। তাদের কথার মধ্যে ব্যাকরণগত তেমন কোনো ভুল নেই বললেই চলে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ‘এথনেলগ’ নামক প্রতিষ্ঠানের মতে পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজার ৯০৯টি ভাষা আছে। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি ভাষা এ শতাব্দীর মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার পথে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির মতে, প্রতি ১৪ দিনে একটি ভাষার মৃত্যু হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীতে জীবন্ত ভাষা তিন হাজারেরও বেশি। বাংলাদেশে ৯৮ শতাংশ মানুষ মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলায় কথা বলে। বাংলাদেশ ও অন্য অঞ্চল মিলে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা প্রায় ২৪ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৪ ভাগ (২০১২ সনের হিসাব)। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে রফিক, জব্বার, বরকত, সালাহউদ্দিনের শাহাদৎ বরণের ইতিহাস আমরা জানি। মাতৃভাষা থেকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পরিণতি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। ভাষা সচেতনতা কোনো জাতির সার্বভৌম স্বাধীনতা রক্ষার পূর্বশর্তগুলোর অন্যতম শর্ত। নির্ভুলভাবে বানান, শব্দ, বাক্য লেখা ও বলা ভাষাপ্রেম এবং দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন।
বাংলাভাষা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষা। বাংলার সংস্কৃতিও পরিপূর্ণ। সংস্কৃতি হলো একটি জনসমষ্টির সামগ্রিক জীবন পদ্ধতি। বাংলা সমগ্র বিশ্বে ও উপমহাদেশের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র ভাষা ও সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের মানুষ প্রধানত ভাত খায়। ভাতে রস থাকে; তাই বাংলাদেশের মানুষের অন্তর, কথা ও ভালোবাসায় প্রাণ থাকে। থাকে কথা ও কাজের মিল। কথা দিয়ে কথা রাখে। যারা প্রধানত রুটি খেয়ে থাকে, তাদের কথায় প্রাণ ও ভালোবাসা থাকে অপেক্ষাকৃত কম। কারণ হিসেবে বলা যায়- রুটি হয় শুকনো, রুটিতে রস কম থাকে। তাই মানুষের বৈশিষ্ট্যও রুটির মতো কিছুটা শুকনো।
ইংরেজদের সাথে বাঙালিদের ভাষার একটি শব্দের তুলনা করা যায়। যেমন: ‘মা’ ও ‘মাদার’। বাংলায় বলা হয় মা। মায়ের এবং সন্তানের মধ্যে ভালোবাসা অতুলনীয় কিন্তু ইংরেজদের ‘মাদার’ ও ‘চিলড্রেন’ এর সম্পর্কে ভালোবাসা বাঙালিদের মতো এতো গভীরতা লক্ষ করা যায় না। এটি একটি ভাষার অন্তর্নিহিত গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এক সময় ব্রিটিশদের সা¤্রাজ্য থেকে সূর্য অস্ত যেতো না। তাদের পৃথিবী এখন ছোট হয়ে গেছে। তারাও উপমহাদেশে বাংলা ভাষা নিয়ে রাজনীতি করেছে। তারা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন বাঙালি মুসলমান তেজদ্বীপ্ত ও স্বাধীনতাকামী। বাঙালিরা আন্দোলনে যুধিষ্ঠির। তাই তারা উপমহাদেশে কুরআনের তরজমা বাংলায় না করিয়ে উর্দুতে তরজমা করিয়েছিলেন। বাঙালি ছাত্রদের কুরআনের অনুবাদ করতে হতো উর্দুতে। তারপরে উর্দু ভাষার ব্যাখ্যা থেকে বাংলায় ব্যাখ্যা করতে হতো। আরবি ভাষার সরাসরি বাংলা অনুবাদ ব্রিটিশ আমলে তেমনটি ছিল না। এটি ছিল ইংরেজদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক কৌশল।
বাংলা ভাষাভাষী হিন্দু-মুসলমানেরা বলি, ও! মাই গড। নিজেদের সত্তা থেকে কেন ইংরেজদের এথিক্স অনুসরণ করি? এটি আমাদের মনের অজান্তেই অনুসরণ করি। আমরা যদি সচেতন হই, তাহলে মুসলমানদের বলা উচিত ও! মাই আল্লাহ্, এবং হিন্দুদের বলা উচিত ও! মাই ভগবান।
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে থাকেন বাংলাভাষা খুব কঠিন। এর বানান আরো কঠিন। মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা বাংলার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের সাথে আমি একমত নই। পৃথিবীর উন্নত ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। এর নিয়ম যারা পড়েন, অনুসরণ করেন ও রপ্ত করেন তাদের বলা ও লেখায় সঠিকতা ও প্রাণবন্তরূপ খুঁজে পাওয়া যায়।
ভাষার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধনে মানুষের দু’টি বড় বিষয় দৃশ্যমান। তা হলো সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতা। পৃথিবীর সব বিষয়ের সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতা বাংলাভাষায় সর্বোত্তম এবং সর্বাত্মকভাবে প্রকাশের সুযোগ আছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর হাজার হাজার বই প্রকাশিত হচ্ছে। এদেশের কবি ও লেখকেরা লিখে চলেছেন অবিরাম । শুধু বাংলা একাডেমিতে প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় গড়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এ বছর প্রতিদিন যে সংখ্যক মোড়ক উন্মোচিত হচেছ, তাতে অনুমান করা যায় যে, প্রায় পাঁচ হাজার বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হতে পারে এবারের একুশে বই মেলায়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত অমর একুশের মাসব্যাপী গ্রন্থমেলার উদ্বোধনকালে বাংলাভাষা ও কৃষ্টি, শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে মর্যাদা দেয়ার জন্য আহ্বান জানান। ২০১৭ সালেও ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, বাংলা ভাষার বিশুদ্ধ ব্যবহার বাড়াতে হবে।
ভাষার ভিত্তিতে কেউ যদি মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করেন, তা অমূলক ও ভিত্তিহীন। কারণ, সম্প্রতি ব্রিটেনের এক বিজ্ঞানী বলেছেন, সব মানুষের ‘জিন’ এক ও অভিন্ন আদিমাতার কাছ থেকে আগত। সে মায়ের নাম ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মতে ‘ঈভ্’ এবং মুসলমানদের মতে বিবি হাওয়া। অতএব আমরা বলতে পারি মানুষের ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে তত্ত্বে ও মানবতার দৃষ্টিভঙ্গিতে সব মানুষই সমান।
পশ্চিমবঙ্গের লেখক ও মানবাধিকার কর্মী ড. পার্থ ব্যানার্জি অকপটে স্বীকার করে বলেনÑ ‘বাংলাদেশ যতদিন বিশ্বে সরব থাকবে ততদিন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বহাল থাকবে। কলকাতা অথবা পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষা রক্ষার আন্তরিকতা তেমন একট নেই’। তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃত সত্য হচ্ছে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটি হারিয়ে গেলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব আর থাকবে না। পশ্চিমবঙ্গে আমরা যারা রয়েছি, তারা ক্রমান্বয়ে করপোরেট কালচারে ধাবিত হচ্ছি। শেকড়ের সাথে সম্পর্কের ছিন্ন হচ্ছে দ্রুত গতিতে।’ ১৮ই মে, ২০১৭ তারিখে নিউ ইয়র্কয়ে জড়ো হওয়া বেশ ক’জন বাংলাদেশী কবি, সাহিত্যিক, লেখক, প্রকাশক এবং সাংবাদিকের সাথে প্রবাসের লেখক-লেখিকাদের প্রাণবন্ত আড্ডায় তিনি এসব কথা বলেন। তারা নিউ ইয়র্কে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বই মেলা উপলক্ষে জ্যাকশন হাইটসের পালকি পার্টি সেন্টারে এক আড্ডায় জমায়েত হয়েছিলেন (সূত্র: নয়া দিগন্ত ২০ মে,২০১৭)। অনেক দেশ থেকে মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, কলকাতা শহর থেকে মাতৃভাষা হারিয়ে যাবে না, এ কথা নিশ্চয়তা দিয়ে কে বলবেন ?
সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান হওয়ায় বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সচিব এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অফিসার ও কর্মচারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠই মুসলমান। শুধু তাই নয়, এদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও উচ্চতর পদে এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। এটিও এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বদান্যতা; যা উপমহাদেশের কোথাও এমন নজির নেই।
বাংলা একাডেমির প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বানান এবং এ বিষয়ে লিখিত বিভিন্ন লেখককর্তৃক বাংলা বানানসংক্রান্ত বই পড়ে নিয়মগুলো রপ্ত করা গেলে বিশুদ্ধভাবে বাংলা বলা ও লেখা যায়।
অনেক বিদেশী বলে থাকেন, বাংলা ভাগ করা ভুল হয়ে গেছে। এটি তাদের কাছে ভুল হতে পারে। বাংলাদেশীদের কাছে ভুল হয়নি। কথায় বলে কার কপালে কে খায় জুুদা হলে বোঝা যায়। বর্তমান বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষী হিসেবে বাংলাদেশীদের পরিচয়ে তাদের পরিচয়। বাংলাদেশ এবং বাংলা ভাষা গোটা বিশ্বে পরিচিত। এ পরিচয় বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রভাষার জন্য।
গোটা বিশ্বে প্রধান ভাষা ১৩টি। তন্মধ্যে বাংলাভাষা পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ। বাংলাভাষার শব্দ সংখ্যা বর্তমানে অন্তর্ভুক্তি শব্দসহ আনুমানিক ৬০ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে আরবি চার হাজার, ফার্সি চার হাজার পাঁচশত উর্দু একশটিরও বেশি। বাংলাভাষা পৃথিবীতে অন্যতম সমৃদ্ধ ও শ্রেষ্ঠ ভাষা। এ ভাষার আত্তীকরণ শক্তি অনেক বেশি; অভিযোজন ক্ষমতাও অনেক শক্তিশালী। এ ভাষা প্রবহমান নদীর মতো। যেমন সুসংবদ্ধ তেমন সহজ, সরল, সাবলীল, সুমিষ্ট, সুমধুর ও প্রাণবন্ত।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.