ফোরজি ভালোবাসা

তারেকুর রহমান

শীত শেষে বসন্তের আগমন ঘটেছে। প্রকৃতিতে নতুন আমেজের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতির এত পরিবর্তনেও প্রেমিক পুরুষ বদরুলের কোনো পরিবর্তন হলো না। রুটিন করে দুপুরে ঘুমানো বদরুলের অভ্যাস। দুপুরে ভাত খেয়ে একটু না ঘুমালে হজমে সমস্যা হতে পারে এরকম নানা যৌক্তিক কারণেই দুপুরে ঘুমায় বদরুল।
এখন জানালা খুলে দিয়ে আয়েশের ভঙ্গিতে ঘুমাচ্ছে বদরুল। বাইরে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। কখন যে ঘুমের অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল টেরই পেল না।
বদরুল ঘুমালে নাক ডাকা শুরু হয়। অনেকের মতে বদরুলের নাকের ডাক অনেকটা পাওয়ার ট্রিলারের আওয়াজের মতো। ও যখন ঘুমায় তার আশপাশে মশামাছিও আসে না। অবশ্য বদরুল ঘুমালে দুনিয়ার কোনো খবর থাকে না। বিশ্বযুদ্ধ লাগলেও তাকে ঘুম থেকে উঠানো মুশকিল।
ইদানীং বদরুলের রুটিনে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিলো। চার দিকে কিছু গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বদরুল নাকি প্রেমে পড়েছে। বদরুল প্রেমে পড়েছে এ নিয়ে লোকমুখে নানা গল্প ঘুরে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা বদরুল কি প্রেম করতে পারে না? পারে, অবশ্যই পারে। কিন্তু বদরুলের মতো এত অলস প্রকৃতির একটা ছেলে কিভাবে প্রেমে পড়েছে তার হিসাব মিলছে না। দুপুরে এখন আর বদরুলের ঘুম আসে না। সারা দিন ফোনে চ্যাট চলে। অথবা কানে ফোন লাগিয়ে কথা বলতেই থাকে। কথা বলার সময় বদরুল মুখে নানা আওয়াজ করে। হাঁ হাঁ করে উচ্চৈঃস্বরে হাসে। আবার খ্যাঁক খ্যাঁক করে শব্দ করে। অবশ্য এ শব্দ দিয়ে সে কি বোঝায় কেউ বোঝে না।
বদরুলের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি উঠল। এটা নিশ্চই ছ্যাঁকার চিহ্ন। এই সময়গুলোয় বদরুলের দেখা তেমন মেলে না। কিছু দিন যাওয়ার পর আবার পুরো সেভ করে মুখ কিন করা থাকে। বোঝা যাচ্ছে, ভালোবাসার পারদ কখনো উঠে, কখনো নামে।
এ দেশে প্রেমিক-প্রেমিকাদের দিবসের কোনো শেষ নেই। আজ এ দিবস তো কাল ও দিবস। দিনে দিনে দিবসের সংখ্যা বাড়তেই আছে। এ সময়গুলোয় অসহায় প্রেমিকগুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সারা পকেট তন্ন তন্ন করে খুঁজে যে কয় টাকা পাবে সেগুলো নিয়ে প্রেমিকার খায়েশ পূরণ করতে হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে দিবসের সংখ্যা একটু বেশিই। আজ রোজ দিবস, কাল চকলেট দিবস, পরশু ভালোবাসা দিবস, এর পরদিন হাগ দিবসÑ এরকম আসতেই থাকে।
বদরুলের প্রেমিকা আবার দিলো দরদি। সে বদরুলের বেশি টাকা খরচ পছন্দ করে না। এ দিবসগুলোয় হালকা কিছু গিফট, আর কোনো রেস্টুরেন্টে হালকা কিছু খাওয়াতে হবে আর হালকা করে ঘুরাতে নিয়ে গেলেই হলো। এসব প্রস্তাব শুনে বদরুলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লেও সে হতাশ না। কারণ ছোটবেলা থেকে সে হতাশ হলে বাবার পকেটের ওপর তীক্ষè নজর রাখত। ওখান থেকে কিছু টাকা মেরে তার হতাশা দূর করত। অবশ্য বদরুল এটাকে কোনো অপরাধ মনে করে না। সে মনে করে এটা তার অধিকার। যা হোক, দিবস ঘনিয়ে আসতে লাগল। বদরুল বাবার পকেটের ওপর গেরিলা হামলা চালাল। তবে সবসময় যে সফল হতো এমন না। মাঝে মাঝে মাছ ধরতে গেলে জাল মারলে প্রতিটাতেই বড় মাছ উঠে না। কিছু কিছু সময় ছোট মাছও উঠে। ঠিক তেমনি মাঝে মাঝে খুচরা খাচরা যে টাকা পেত তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। ইদানীং বদরুলের বাবা টের পেয়ে পকেটে তিন স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। পকেটে টাকা রেখে সেই জামা আলমিরাতে রাখেন। আর আলমিরার তালা মেরে চাবিটা নিজের কোমরেই বেঁধে রাখেন। বদরুল চিন্তা করল এইবার ওখানেই অপারেশন চালাতে হবে। বদরুলের বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে। চাবির গোছাটা কোমরে দেখা যাচ্ছে। বদরুল টিপটিপ করে কাছে গিয়ে চাবিটা খুলতে লাগল। অমনি তার বাবা হাতটা ধরে ফেলে। বদরুল থতমত খেয়ে বলল, বাবা আসলে তোমার গায়ে মশা বসে আছে আমি মারতে এলাম।
হুঙ্কার দিয়ে বদরুলের বাবা বললেন, আমাকে এসব শেখানোর দরকার নাই। আমি সব বুঝি।
হালকা প্রহার করে বদরুলকে ছেড়ে দেয়া হলো। কোনো কূল না পেয়ে বদরুল প্রেমিকার কাছে হাজির। প্রেমিকা বেশ রাগ করে আছে। তাকে কোনো ভালোবাসার বাণীই আকৃষ্ট করছে না। রাগে গদগদ করছে সে। এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল, মনে হয় তোমার সাথে আমার সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না।
Ñআমাকে আর একবার সুযোগ দাও।
Ñনা, আর দেয়া যাবে না।
Ñপ্লিজ এত নিষ্ঠুর হয়ো না।
বদরুলের প্রেমিকা কিছুণ কী যেন চিন্তা করলেন। এরপর বলল, আচ্ছা আর একবার সুযোগ দেবো।
Ñওরে আমার লক্ষ্মীরে... অনেক ধন্যবাদ।
Ñশোন আমাকে একটা ফোরজি মোবাইল কিনে দিতে হবে।
Ñএটা আবার কী?
Ñএখন দেশে ফোরজি চালু হলো। অল্প সংখ্যক মোবাইলে ফোরজি সাপোর্ট করে। আমার ফোরজি সাপোর্ট করে এমন মোবাইল চাই। আর মোবাইল কিনে দিলে প্রেম ফোরজি স্পিডে চলবে। আর না হয় আমার নেটওয়ার্ক বিজি হয়ে যাবে। মনে থাকে যেন।
এ কথা বলেই কালবিলম্ব না করে প্রেমিকার প্রস্থান ঘটল। বদরুল দাঁড়িয়ে আছে। তার ভালোবাসাকে কি সে ফোরজি গতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে, নাকি ভালোবাসা অন্য নেটওয়ার্কে কানেক্টেড হয়ে যাবে?

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.