নাগাল্যান্ড নির্বাচনে ইসরাইল-ফ্যাক্টর
নাগাল্যান্ড নির্বাচনে ইসরাইল-ফ্যাক্টর

নাগাল্যান্ড নির্বাচনে ইসরাইল-ফ্যাক্টর

আসিফ হাসান

উত্তরপর্ব ভারতের প্রান্তিক রাজ্য নাগাল্যান্ডে আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। ভারতের মতো দেশগুলোতে নির্বাচন মানেই প্রতিশ্রুতির বন্যা। তবে এবার নাগাল্যান্ডে অভাবিত এক প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। তা হলো জেরুসালেম সফর। প্রধান দুই দল বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা জয়ী হলে প্রতি বছর রাজ্যটি থেকে কিছু লোককে যিশুখ্রিষ্টর জন্মভূমি জেরুসালেম ঘুরিয়ে আনা হবে। অবশ্য দুই দলের প্যাকেজে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। কংগ্রেস বলেছে, তারা ভর্তুকি দিয়ে ওই সফরের আয়োজন করবে। আর বিজেপি তাদের টেক্কা দিয়ে বলেছে, বিনাপয়সায় তা করা হবে।

ভারতের যে তিনটি রাজ্য খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ, তার একটি হলো এই নাগাল্যান্ড। এ রাজ্যের ৯০ শতাংশ বেশি লোক খ্রিষ্টান। রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে, জেরুসালেম টোপ তাদের জয়কে সহজ করে দেবে।
এটি নাগাল্যান্ডের এবারের নির্বাচনে একটি নতুন মোড়। এ রাজ্যে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সময় থেকেই একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে। প্রথমে তো ঘোষণা করা হয়েছিল, নির্বাচন বয়কট করা হবে। বিদ্রোহী, উপজাতীয় ও নাগরিক সমাজের গ্রুপগুলোর চাপে রাজনৈতিক দলগুলো ২৯ জানুয়ারি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়, ‘ইন্দো-নাগা রাজনৈতিক সমস্যা’ নামে পরিচিতি দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকা বিদ্রোহের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা নির্বাচনে যাবে না।
নির্বাচন বয়কটকারী দলগুলোর মধ্যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির রাজ্য শাখাও ছিল। কিন্তু দিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা তাদেরকে ওই অবস্থান বদলাতে বাধ্য করে। নাগাল্যান্ডের নির্বাচনী প্রচারণার দায়িত্বে থাকা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেছেন, নির্বাচন হলো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সমাধান আসবে পরে।

বিজেপির সিদ্ধান্তের ফলে অন্য দলগুলোও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামতে বাধ্য হয়। তারা ১৯৯৮ সালের পুনরাবৃত্তি চায় না। ওই সময় একই ধরনের নির্বাচনী বয়কটের ফলে কংগ্রেস ৬০টির মধ্যে ৫৩টিতে জয়ী হয়েছিল। এবার বিজেপিকে কেউ মাঠ ছেড়ে দিতে রাজি হয়নি।

মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন নাগাল্যান্ড হলো ভারতের ১৬তম রাজ্য। আসামের নাগা হিলস জেলা কেটে নিয়ে এর সাথে কেন্দ্রশাসিত তুয়েনসাঙের সাথে জুড়ে দিয়ে রাজ্যটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এর জনসংখ্যা ছিল ১৯ লাখ। রাজ্যটিতে ১৬টি গোত্রের বাস। মিয়ানমারে রয়েছে পাঁচটি নাগা উপজাতি, প্রতিবেশী মনিপুর, অরুনাচল প্রদেশ ও আসামে রয়েছে যথাক্রমে সাত, তিন ও একটি গোত্র। ১৯-এর শতকে মার্কিন ব্যাপ্টিস্ট চার্চ তাদের ধর্মান্তরিত করে। এই চার্চই এবারের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান সমর্থন ছিল।

এই রাজ্যটি আরেকটি কারণে বিশিষ্ট হয়ে আছে। তা হলো এখান থেকেই আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছিল। ইংরেজি ভাষাভাষী মধ্য শ্রেণীর ব্যাপ্টিস্টরা ‘নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল (এনএনসি)’-এর ব্যানারে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারত থেকে স্বাধীন হওয়ার আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ওই দিনই পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছিল, ভারত স্বাধীন হয় এর এক দিন পর।
তাদের নেতৃত্বে ছিলেন আঙ্গামি জাপু ফিজো। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন এ আশায় যে, তাদের জয়ের পর ভারত ও বার্মা সব গোত্রসহ স্বাধীন ও সার্বভৌম নাগা জাতির স্বীকৃতি পাওয়া যাবে।

কিন্তু তাদের ওই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। অবশ্য তারা নতি শিকারও করেনি। বিদ্রোহের আগুন তারা জ্বালিয়ে রাখে। তাদের দমন করার জন্য ১৯৫৫ সালে আর্মড ফোর্সেসস (স্পেশাল পাওয়ার্স) অ্যাক্ট ঘোষণা করে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল। এ কঠোর আইনে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে হত্যা, ধ্বংস চালানোর ক্ষমতা দেয়া হয়। ওই আইন এখনো নাগাল্যান্ড, মনিপুর, আসামের অংশবিশেষে এবং পুরো কাশ্মির উপত্যকায় বলবৎ রয়েছে।
অবশ্য সবসময় যে তারা বিদ্রোহই করে গেছে, তা নয়। অনেক সময় তারা যুদ্ধবিরতি করেছে, শান্তিচুক্তিও করেছে।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শান্তিচুক্তি হয় ১৯৯৭ সালে। কিন্তু তাদের সমস্যার সুরাহা ১৮টি বছর ধরে পাঁচজন প্রধানমন্ত্রীর আমলেও হয়নি।
তারপর গত ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট মুইভা ও ভারত সরকার নয়া দিল্লিতে (সো মারাত্মক অসুস্থ হয়ে ২০১৬ সালের জুনে দিল্লিতে ৮৭ বছর বয়সে মারা যান) ইন্দো-নাগা সমস্যার চূড়ান্ত সমাধানের জন্য ‘ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিতে’ সই করে। এ চুক্তির ৩০ মাস পর নাগাল্যান্ডে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
নাগারা এখনো গ্রেটার নাগাল্যান্ডের স্বপ্ন দেখে। নির্বাচনের ব্যবস্থা করে কিংবা জেরুসালেম ঘুরিয়ে আনার মুলা ঝুলিয়ে তাদের আরো কয়েক দিন শান্ত রাখা যাবে। কিন্তু আগুন ছাইচাপা থাকলেও তা নিভবে না, বলেই মনে হচ্ছে এবং তা ভোগাতেই থাকবে। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.