দুশ্চিন্তার ভাইরাসে আক্রান্ত বাংলাদেশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক

লজ্জা ও হতাশায় পর্যবেসিত বাংলাদেশের ক্রিকেট! ক্রিকেটাররাও বিস্মিত। নিজেদের পারফরম্যান্স এমন হবে ভাবতেও পারছেন না। বিশেষ করে ঘরের মাটিতেও যে পারফরম্যান্স তাদের এটা বছর তিনেক আগে হলে বিস্মিত হতেন না। কিন্তু বিগত বেশ কিছু সময়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক পরিবর্তন। বিদেশের মাটিতেও যেখানে জয়ের জন্য লড়াই করে। সেখানে দেশের মাটিতে তো জয় ভিন্ন চিন্তাই করেন না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিন ভার্সনেই কী হলো? কেন এমন? এর উত্তর নিজেরাই খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রিকেটাররা। কখনো ক্ষুব্ধ তারা। কখনো লজ্জিত। কখনো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। রেজাল্ট ভালো না হলে সে প্রভাবটা যে ক্রিকেটারদের ওপরও পড়ে না এটা ঠিক না। ভালো রেজাল্ট করলে সর্বত্রই তাদের নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ হয়। বাজে রেজাল্ট, বাজে পারফরম্যান্সে ঘরে, বাইরে, বন্ধু মহল থেকে শুরু করে সব স্থানেই যেন গুমট একটা আবহাওয়া বিরাজ করে। ক্রিকেটাররা তা অনুভব করেন। এটাও তো ঠিক, তাদেরও একটা সমাজ রয়েছে। ক্রিকেট নিয়ে যাদের সাধনা, তারা এর ভালো-মন্দের সাথেও তো জড়িত। বিসিবির কর্তারা হয়তো ক্রিকেটারদের ওপর দোষ চাপিয়ে ক্ষান্ত। কিন্তু দিন শেষে সব দায়ভার সেই ক্রিকেটারদেরই। কাঠগড়ায় তাদেরই দাঁড়াতে হয়!
কিন্তু সব কিছুর জন্য দায়ী কিন্তু তারাই নন। প্ল্যানের ত্রুটি থাকে। উইকেটের ত্রুটি থাকে। বিভিন্ন কিছু মিলে একটা ভালো রেজাল্টের প্রত্যাশা। বাংলাদেশ দলের এবারের পারফরম্যান্স বাজে হওয়ার কারণ দেখাতে গিয়ে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররাও প্ল্যানে সমস্যা দেখেছেন। ভুল পরিকল্পনা বা প্ল্যান হলে তা মাঠে বাস্তবায়ন করা কষ্ট। যেমন তিন জাতি ক্রিকেটে ফাইনাল নিশ্চিত হওয়ার পর লিগ পর্যায়ে যে ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ তাতে টসে জিতে শ্রীলঙ্কাকে ব্যাটিং না দিয়ে নিজেদের ব্যাটিং করা ছিল মস্তবড় ভুল। ফাইনালে উঠবে কি না শ্রীলঙ্কা ওই ম্যাচের ওপর নির্ভরশীল। সে ম্যাচে টেনশন ফ্রি ছেড়ে দেয়ার কোনো অর্থ ছিল। টসে জেতার পর প্রথম শ্রীলঙ্কাকে ব্যাটিং দিলে বরং দুশ্চিন্তায় থেকে তারাই ব্যাটিং করত। কারণ বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের ম্যাচেও বড় ব্যবধানে হেরেছিল যেখানে। ওই এক ভুলের খেসারত দশ উইকেটে হার। ফাইনালেও তার প্রভাব পড়ে এবং পরাজয়। ওই তো শুরু। এরপর টেস্ট সিরিজের প্রথম ম্যাচে ড্র করে ঢাকায় এসে অ্যাটাকিং মুডে থেকে হারতে হয়েছে। টেস্ট ক্রিকেটের নিয়ম আগে সুরক্ষিত ডিফেন্স কনফার্ম, এরপর অ্যাটাক। স্পিন-সহায়ক টার্নিং উইকেট করে অ্যাটাকিং মুডে থাকার খেসারত গুনতে হয়েছে বড় পরাজয়ের মাধ্যমে। স্পোর্টিং উইকেট করলেও চলত। কিন্তু সেখানে শ্রীলঙ্কাকে যদি ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া ভেবে তেমন উইকেট করে হারিয়ে দেয়ার কৌশল করা হয়, হাতুরাসিংহে কি বসে থাকবেন? শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের চলনে বলনে ওই ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে ২২২ রান করার পরই লঙ্কান এক ক্রিকেটার বলেছিলেন, এখানে প্রথম ইনিংসে এ রানই যথেষ্ট। তখন তার কথা হাস্যকর মনে হলেও বাস্তবে ওটাই যে যুক্তিসঙ্গত ছিল তার প্রমাণ তো মিলেছে। টি-২০ ক্রিকেটেও সেই একই অবস্থা। ওয়ানডে-টেস্টে হারের পর টি-২০ নিয়ে আর গ্যাম্বলিং যথার্থ ছিল না। কিন্তু চার ক্রিকেটারকে প্রথম টি-২০তে অভিষেক ঘটিয়ে নিজেদের শক্তি নিজেরাই খর্ব করেছে বাংলাদেশ। যত ভালো ক্রিকেটারই হোক। ঘরোয়া ক্রিকেটে দশ হাজার রান বা ৫০০ উইকেট সংগ্রহ করে এসেও জাতীয় দলে প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে নার্ভাস থাকবেনই। আর নার্ভাস না হওয়ার ঘটনা কদাচিৎ। সেখানে একজন বা দুইজনকে দিয়ে পরীক্ষা করানো যায়। চারজনকে অভিষেক করিয়ে এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিলে শ্রীলঙ্কা কি বসে থাকবে? দ্বিতীয় ম্যাচেও প্রথম ম্যাচের একাদশের ওপর স্থির ছিল না। ওই চার অভিষেকের দুইজনকে সরিয়ে দেয়া হয়। আরো দুইজনকে অভিষেক করানো হয়। যেন পাড়ামহল্লার দল শ্রীলঙ্কা। তাদের সাথে ছেলেখেলা আর কী। এতটা কাঁচা পরিকল্পনা করবে বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড তা কল্পনা করা যায়নি। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অনেক সময় সেরা ক্রিকেটারকেও ফেরার সুযোগ দেয়া হয় না। গ্যাপের জন্য যদি কিছুটা নার্ভাস থাকেন তিনি! সেখানে নতুন দুইজনের সাথে তামিম (তামিম না হয় ঠিক আছে) ও মিথুনকে ফেরানো। ৭৫ রানে হার যথার্থ।
আগের সিরিজ খেলেছে বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকায়। ওয়ানডে-টেস্ট ও টি-২০। সব সিরিজেই হোয়াইটওয়াশ। চরমভাবে নাজেহাল হয়ে দেশে ফিরেছিলেন ক্রিকেটাররা। ফলে হোমে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সে ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার ছিল প্লান। তাও ভেস্তে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে চরম হতাশায়। এরপর নেই হেড কোচ। যিনি এখন দায়িত্ব পালনে তার ক্ষমতা বোঝা হয়ে গেছে। নতুন একজনকে নিয়ে এসে তার হাতে দল তুলে দিলে তিনিই বা কী প্ল্যানে দল সাজাবেন কে জানে! এখন প্রয়োজন পারফরম্যান্স ও জয়। সেখানে আবারো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পড়লে বড় সমস্যা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এখন এমন ঘুরপাকের মধ্যেই হাবুডুবু খাচ্ছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.