আসমার বুকফাটা আর্তনাদ 

মো. আব্দুল আউয়াল ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)

ভাড়াটিয়া ঘরের বারান্দার এক কোনে পড়ে আছে শিশু রাব্বির নিথর দেহ। লাশের পাশে মা আসমার বুকফাটা আর্তনাদ-হাহাকার হাতুড়ি মারছে বুকে। উপস্থিত নারী-পুরুষ কেউই চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। শোকের সাগরে ভাসছে গোটা এলাকা। রোববার রাতে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌর সদরের রেলস্টেশন এলাকায় গিয়ে এমনি এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে।
জানা যায়, উপজেলা খাদ্য গুদামের পাশের একটি বস্তির ভাড়াটে বাসায় স্ত্রী সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন ট্রাক হেলপার উসমান। তার বাড়ি বড়হিত ইউনিয়নের পস্তারি গ্রামে। গত ৮ মাস আগে সড়ক দুর্ঘটনায় উসমানের এক মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এর পর থেকে উসমানের অন্তসত্তা স্ত্রী আসমা আক্তার মেয়ে মেঘনা (১০) ও ছেলে রাব্বি (৭) কে নিয়ে সেখানেই থাকতে থাকেন। দুই মাসপর তার কোল জুড়ে আসে আরেক পুত্র সন্তান। স্বামী উসমান মারা যাওয়ার পর এক কঠিন পরিস্থিতে দিন কাটছিলো আসমার। নবজাতক (বর্তমানে ৭মাস বয়সী) নিরবের জন্মের তিন মাসের মাথায় সন্তানদের মুখে আহার জোগাতে পাশের একটি ইটের ভাটায় শ্রমিকের কাজ নেন আসমা। ছেলে রাব্বিকে সোহাগি ইউনিয়নের হাটুলিয়ায় অবস্থিত একটি এতিম খানা মাদ্রাসায় ভর্তি করেদেন। স্বপ্নছিল রাব্বি পবিত্র কোরআনের হাফেজ হবে। এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তার সেই স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে।
গত রোববার দিনভর ইটভাটায় কাজ শেষে বিকেলে এতিমখানা থেকে রাব্বিকে নিয়ে আসেন তার জন্যে একটি নতুন পাঞ্জাবি বানাতে। বেলা ৫ টার দিকে রেলস্টেশন সংলগ্ন রুহুল আমিনের বাড়িতে নিয়েও গিয়েছিলেন। রুহুল আমিনের মেয়ে জেসমিন আক্তার সেলাইয়ের কাজ করেন। মা আসমা যখন জেসমিনের সাথে কথা বলছিলেন পাঞ্জাবির বিষয়ে তখন শিশু রাব্বি পাশেই চার্জরত একটি ইজিবাইকে খেলায় ছলে উঠে পড়ে। ওই সময় ইজিবাইক চার্জের একটি খোলা তাড়ে হাত দেওয়ায় বিদুতের তাড়ে জড়িয়ে পড়ে রাব্বি। পরে কারো চিৎকার শুনে প্রতিবেশিরা তাকে উদ্ধার করলেও বিদ্যুতস্পর্শে আঙ্গার হয়ে যায় রাব্বির দেহ।
খবর পেয়ে রাত ৮ টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শিশু সন্তানের লাশের পাশে আহাজারি করছেন শিশু রাব্বির মা। সদ্য স্বামী হারা আসমার পুত্র শোকে বুক ফাটা কান্নায় স্তব্ধ হয়ে গিয়ে ছিলো গোটা এলাকা। আসমার এক এক বারের চিৎকার যেন উপস্থিত লোকজনের বুকে হাতুড়ি মারছিল। সান্তনা দেওয়ার ভাসা খোঁজে পাচিছলেন না কেউ। নারী-পুরষ সবার চোখে বেয়েই অঝোরে অশ্রু ঝরছিলো। আসমা আহাজারি করে বলতে ছিলেন, ‘রাব্বিরে তুই না আমায় কামাই করে খাওয়াইবে কইছিলে। মাদ্রসায় পইড়া নাম করা হাফিজ হইবে। আমার জানাযা পড়াইবে। অহন আমার জানাজা কে কইবো। আমারে কে শান্তনা দিবো। রাব্বিরে আমার বুকে আয়, নতুন পাঞ্জাবি পড়বে না বাবা। তোরে না কইছিলাম নতুন পাঞ্জাবি বানায়া দিমু। ’ পাশেই হাত পা ছুড়ছে ৭মাস বয়সের শিশু নিরব। এখনো সে কিছু আঁচ করতে পারেনি যে তার সংসারে কি ঘটে গেছে। ছোট ভাই রাব্বিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়–য়া বোন মেঘলাও। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে হতদরিদ্র আসমার পাশে থাকবে কি কেউ। সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার মতো কোন কাজ জোটবে কি আসমার কপালে। কয়েক মাসের ব্যবধানে স্বামী ও সন্তান হারা আসমার আর্তনাদ কেউ থামাতে পারবে কি ? আসমার বুকফাটা চিৎকার কি স্থায়ী ভাবে কারো হৃদয় স্পর্স করবে ?

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.