তুরস্কে সুতার বাজার হারানোর আশঙ্কা

লুৎফুন নাহার লুনা

২০১৬ সালে বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে রফতানি হয়েছিল দুই হাজার ১২০ টন সিনথেটিক সুতা। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ৮৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে রফতানি হয়েছিল এক হাজার ১৫০ টন সুতা। ২০১৭ সালের প্রথম ১০ মাসেই দেশটিতে রফতানি হয় তিন হাজার টন। রফতানির এই অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের জন্য। অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে তুর্কি সরকার। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে চীনা সুতাকে বাংলাদেশী সিল দিয়ে তুরস্কে রফতানি করছে দেশটির ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাংলাদেশের ওপর শাস্তির খড়গ নেমে আসতে পারে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিওটিও) নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশে তার অভ্যন্তরীণ বাজারের চেয়ে কম দরে অথবা উৎপাদন খরচের কম মূল্যে পণ্য রফতানি করলে আমদানিকারক দেশ তদন্তসাপেক্ষে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে। এ শুল্ক আরোপের পর অন্য দেশ থেকে হঠাৎ আমদানি বেড়ে গেলে আমদানিকারক দেশ রফতানিকারক দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ করতে পারে। একে বলা হয় ‘সারকামভেনশন’। তুরস্কের অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে এভাবে রফতানির বিষয়টি ইতোমধ্যে পর্যালোচনা করেছে।
রফতানিকারকদের অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে তুরস্কে যে পরিমাণ সিনথেটিক সুতা রফতানি হচ্ছে তার একটা অংশ করছে চীনা রফতানিকারকেরা। তুরস্ক ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করে। এরপর চীনারা বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে সুতা রফতানি শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্ক এরই মধ্যে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ওপর একই শুল্ক আরোপ করেছে। অভিযোগ উঠেছে সর্বশেষ চীনারা বাংলাদেশ ও নেপালকে ব্যবহার করে তুরস্কে রফতানি শুরু করে। এখন তুরস্ক বাংলাদেশ ও নেপালের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপ হলে দেশের আসল রফতানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশের পাঁচ থেকে ছয়টি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে তুরস্কে সিনথেটিক সুতা রফতানি করছে। চীনা পণ্যে বাংলাদেশী সিল দিয়ে রফতানি করায় প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে ও দাম দিন দিন কমছে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালে সিনথেটিক সুতার প্রতি কেজির রফতানিমূল্য তিন দশমিক ৪৭ মার্কিন ডলার থেকে কমে দুই দশমিক ৮৫ ডলারে নেমে এসেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করেছে তুরস্ক। তদন্তের বিষয়ে তুরস্ক বাংলাদেশকে জানানোর পর দেশটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। এখনই যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে তুরস্ক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এ সংক্রান্ত বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের (বিটিসি) এক সভার কার্যপত্রে বলা হয়, তুরস্ক মনে করছে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে রফতানিকৃত সিনথেটিক সুতা এ দুই দেশে উৎপাদিত নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে বাণিজ্য সচিবকে চিঠি দিয়ে জানান। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ তদন্তের বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে তুরস্ক একতরফাভাবে উচ্চহারে শুল্ক আরোপ করতে পারে। এ বিষয়ে তিনি আইনজীবী নিয়োগেরও পরামর্শ দেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, পরিচয় ব্যবহার করার ক্ষেত্রে চীনারা বিভিন্ন দেশকে ব্যবহার শেষে বাংলাদেশে এসেছে। চীন থেকে সুতা এনে সেটা ভুয়া সনদ ব্যবহার করে তুরস্কে যাচ্ছে। এখন যদি তুরস্ক বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপ করে, তাহলে দেশের মিলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিয়মানুযায়ী নির্দেশনা জারির ৩৭ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের সব উৎপাদনকারীকে প্রশ্নমালা পূরণ করে পাঠাতে হবে। এ প্রশ্নমালা পূরণ করতে হবে তুর্কি ভাষায় এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রও দিতে হবে একই ভাষায়।
প্রাপ্ত তথ্যানুযাযী, তুরস্কে বাংলাদেশ বছরে ২১ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে। বিপরীতে আমদানি করে ৬৩ কোটি ডলারের পণ্য। দেশটি বাংলাদেশের পোশাকের ওপর উচ্চহারে শুল্ক আদায় করছে। বাংলাদেশ আমদানি করা কোনো পণ্যের ওপর এখনো পর্যন্ত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করতে পারেনি। তবে বাংলাদেশের পাটপণ্য ভারতে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ভারত ও পাকিস্তানে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মুখে পড়েছে। ভারত এখন বাংলাদেশী মাছ ধরার জালে এ শুল্ক আরোপের তদন্ত করছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.